কলেজ ছাত্র গৌতম হত্যা মামলার ৪ আসামির মৃত্যুদ-: তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ভৎসনা


প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৮ ||

বদিউজ্জামান: চাঞ্চল্যকর কলেজ ছাত্র গৌতম হত্যা মামলার চার আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তবে, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এ মামলায় অপর ছয় আসামিকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি যথাযথভাবে তদন্ত না করায় তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ভৎসনা করেছেন আদালত।
বুধবার সাতক্ষীরার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ সাদিকুল ইসলাম তালুকদার জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন।
সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভাড়–খালী গ্রামের রুপচান গাজীর ছেলে নাজমুল গাজী (২৫), একই গ্রামের করিম হোসেনের ছেলে শাহাদাৎ হোসেন (৩০), দেবহাটা উপজেলার বহেরা গ্রামের আব্দুল আলিমের ছেলে আলী আহম্মেদ শাওন (১৯) ও সদর উপজেলার মহাদেবনগর গ্রামের রেজাউল হোসেনের ছেলে সাজু হোসেন (২০)। তবে, জামিনে মুক্তি পাবার পর দ-িত আসামি আলী আহম্মেদ শাওন ও সাজু হোসেন পলাতক রয়েছে।
এ মামলায় খালাস প্রাপ্তরা হলেন, সদর উপজেলার মহাদেবনগর গ্রামের মোশারফ মিস্ত্রির ছেলে মহাসীন আলী, একই গ্রামের রেজাউল ইসলামের স্ত্রী ফজিলা খাতুন, মহাদেবনগর গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে কবিরুল ইসলাম, ভাড়–খালী গ্রামের শামসুদ্দিন সরদারের ছেলে নুর মোহাম্মদ মুক্ত, একই গ্রামের আবুল খায়েরের ছেলে ওমর ফারুক ও খুলনার দৌলতপুরের পশ্চিম পালপাড়া গ্রামের রিয়াজ আলীর ছেলে জামসেদ আলী।
মামলার বিবরণে জানা যায়, দশ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবিতে ২০১৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাতে সদর উপজেলার ঘোনা ইউনিয়নের মহাদেবনগর গ্রামের ইউপি সদস্য গনেশ সরকারের ছেলে সীমান্ত ডিগ্রী কলেজের সম্মান ১ম বর্ষের ছাত্র গৌতম সরকারকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে যায় আসামিরা। এ সময় মুক্তিপণের ১০ লাখ টাকা না পেয়ে তার গালে গুলের তামাক ঢুকিয়ে মুখে টেপ এঁটে শ্বাসরোধ করে নৃশংসভাবে হত্যা করে হাতে পায়ে ইট ঝুলিয়ে বস্তার মধ্যে রেখে গৌতমের লাশ ফেলে দেওয়া হয় স্থানীয় মোকলেছুর রহমানের পুকুরে। পরে গ্রেফতার হওয়া আসামি শাহাদাত হোসেনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ১৭ ডিসেম্বর তার গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা গনেশ সরকার ৬ আসামির নাম উল্লেখ করে ১৬ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা সদর থানায় মামলা করেন।
পরবর্তীতে মামলাটি তদন্তের জন্য ডিবি পুলিশে হস্তান্তর করা হয়। একপর্যায়ে আসামী শাহাদাৎ হোসেন ও আসামী নাজমুল গাজী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হাবিবুল্যাহ মাহমুদের নিকট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) এসএম আশরাফুল আলম দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল আদালতে ১০ জনের নামে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার নথি ও ১৬ জন স্বাক্ষীর জবানবন্দি পর্যালোচনা শেষে বিচারক বুধবার এ মামলায় উক্ত চার আসামীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার আদেশ প্রদান করেন এবং অপর ৬ আসামীর নামে কোন অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় তাদের খালাস প্রদান করেন।
মামলায় আসামীপক্ষের আইনজীবী ছিলেন, এড. আবুবক্কার সিদ্দীক, এড. এএসএম আশরাফুল আলম, এড. মিজানুর রহমান পিন্টু ও এড. আক্তারুজ্জামান। অপরদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন পিপি এড. ওসমান গনি ও অতিরিক্ত পিপি তপন কুমার দাস।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: রায় ঘোষণার সময় আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, হত্যা মামলার তদন্ত সম্পর্কে তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা শাখার এসআই (নিরস্ত্র) এসএম আশরাফুল আলমের কোন ধারনাই নেই। তিনি আরও বলেন, দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া আসামিদের সাক্ষ্য গ্রহনের ক্ষেত্রে আইও কে আরও সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিল। তাঁর (আইও) বিরুদ্ধে তাঁর উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো দরকার ছিল, কিন্তু যেহেতু তাঁর বয়স কম বিধায় রায়ে তাঁকে কেবলমাত্র ভৎসনা করা হল।
আদালত সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সম্পর্কে রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, ১৯ বছরের একজন সহজ-সরল মেধাবী ছাত্রকে ৪জন আসামি মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে পুকুরে ডুবিয়ে দিয়ে লাশ গুমের যে চেষ্টা করেছিল তা কল্পনাই করা যায় না। তাদের (আসামিদের) প্রতি কোন প্রকার সহানুভুতি বা অনুকম্পা দেখানো উচিৎ নয়। তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেয়া উচিৎ।
রায় শোনার পর বাদী গনেষ চন্দ্র সরকার পত্রদূতকে জানান, এ রায়ে তিনি সন্তুষ্ট, তবে খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের কারণে তিনি এবং তার সাক্ষীরা অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত।
রায় ঘোষণার পর আসামি পক্ষের একজন আইনজীবী বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপীল করবো, আশাকরি সেখানে আমরা ন্যায় বিচার পাব।
রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী পিপি এড. ওসমান গনি বলেন, এ রায় সমাজে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এ রায়ের ফলে একদিকে যেমন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হল, অপরদিকে অপরাধীরা অপরাধ করতে নিরুৎসাহিত হবে