চাই শহর-গ্রাম প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ


প্রকাশিত : অক্টোবর ১, ২০১৮ ||

শেখ আবুল কালাম আজাদ

আজ ১ অক্টোবর, ২৮তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। প্রথম জাতিসংঘ ১৯৯০ সালে দিবসটি পালন করে। জাতিসংঘের আহ্বানে ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিবছর বাংলাদেশসহ বিশে^র সব দেশে যথাযোগ্য মর্যাদা এবং গুরুত্বের সঙ্গে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছর প্রবীণ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য- জবপড়মহরুব ঃযব যড়হড়ৎ ড়ভ ঃযব বষফবৎষু রহ বংঃধনষরংযরহম যঁসধহ ৎরমযঃং অর্থাৎ, ‘মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রবীণদের স্মরণ শ্রদ্ধায়’। জন্মের পর থেকে প্রতিদিনই আমাদের বয়স বাড়ছে। শৈশব, কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে একসময় আমরা পৌঁছে যাই প্রবীণ বয়সে। প্রবীণ বয়সটা আসলে কেমন। আমরা যারা তরুণ রয়েছি, আমাদের ধারণাই নেই সেই বয়সটিতে আমিইবা কেমন থাকব। প্রবীণ জীবন আসলে সুখের নয়। বাংলাদেশে যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি, তাদেরই আমরা প্রবীণ ব্যক্তি বা জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করব। কেমন আছেন আমাদের দেশের বেশিরভাগ জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা? আমি বলব ভালো নেই। আমাদের দেশ উন্নয়নশীল দেশ। এখনও এ দেশের অনেক মানুষই তিনবেলা পেট ভরে খেতে পায় না। জীবন-জীবিকার লড়াইটা করতে হয বেশিরভাগ মানুষকেই। জন্মের পর থেকেই একটু একটু করে ভালোভাবে বাঁচার জন্য শুরু হয় জীবনের দৌড়। কিন্তু এ দৌড়ের শেষ কোথায়, কোথায় এর পরিসমাপ্তি। মৃত্যুর আগে সেই দৌড়টা যে আরও বেশি করে দিতে হবে। পারবেন তো, আমরা প্রস্তুত তো। একটা সময় চাইলেও কি আমরা পারব যৌবনের মতো দৌড়াতে। না, পারব না। বার্ধক্য এসে ভর করবে আমাদের শরীরে। মানুষের মন কখনও বুড়ো হয় না কিন্তু সব শক্তি খেয়ে নিয়ে শরীর একটু একটু করে বুড়ো হয়ে যায়। চিরচেনা নিজের সেই শরীরকে আরেকটু সুস্থ-সবলভাবে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন পড়ে খাবারের, প্রয়োজন পড়ে চিকিৎসার, প্রয়োজন পড়ে অর্থের। বাড়ছে মানুষের গড় আয়ু। বাড়ছে এদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। এ মুহূর্তে বাংলাদেশ বলছে যদি আকস্মিক মৃত্যু না ঘটে আপনি চাইলেও আর ৭৩ বছরের আগে মরছেন না। কারণ গড় আয়ুটা যে বেড়ে গেছে। আবার রাষ্ট্রই বলছে আপনার বয়স ৬০ বছর হলেই আপনি প্রবীণ। আপনার কোন কর্মসংস্থান নেই। অন্যদিকে সমাজব্যবস্থায় যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে তৈরি হচ্ছে একক পরিবার। এই একক পরিবারের ফলে পরিবারে বাড়ছে প্রবীণের নিরাপত্তাহীনতা। প্রবীণরা পালাবে কোথায়? রাষ্ট্র, পরিবার, সমাজ কেউই প্রবীণদের দায়িত্ব নিচ্ছে না। বাংলাদেশে প্রবীণের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এ মুহূর্তে জনসংখ্যার ৮ শতাংশ প্রবীণ, আর তা প্রায় দেড় কোটি। হিসাব বলছে, প্রবীণ বৃদ্ধির এই হার যদি অব্যাহত থাকে, তবে ২০২৫ সাল নাগাদ এ দেশে প্রবীণের সংখ্যা হবে প্রায় ৩ কোটি এবং ২০৫০ সালে প্রতি পাঁচজনে একজন প্রবীণ থাকবে। হিসাবটা জানা দরকার, কারণ এই ২০১৮ সালে এসেও প্রবীণদের নিরাপত্তায় এখনও পর্যন্ত আমরা কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারিনি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি এবং সরকার যথেষ্ট প্রবীণবান্ধব । ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ প্রবর্তিত পেনশন-ব্যবস্থার ৭২ বছর পরে প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনার দূরদর্শী উদ্যোগে ১৯৯৭ সালে চালু করা হয়েছে বিশ^নন্দিত বয়স্কভাতা কর্মসূচি; অবসর গ্রহণের বয়স ৫৯/৬০ বছর করা হয়েছে: অনুমোদিত হয়েছে বহু প্রতীক্ষিত ‘প্রবীণবিষয়ক জাতীয় নীতিমালা-২০১৩’ এবং ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ
আইন-২০১৩’।
২০১৫ সালে রাষ্ট্রপতি এ দেশের প্রবীণদের সিনিয়র সিটিজেন ঘোষণা করে কিছু সুযোগ সুবিধার কথা বলেছেন। কিস্তু কথাগুলো যেন কথাই থেকে যায়। বাস্তবে আমরা প্রবীণদের জন্য তেমন কোন সুযোগ সুবিধা দেখতে পাই না, বরং দিন দিন বাড়ছে প্রবীণদের প্রতি মানবাধিকার লঙ্ঘন। প্রবীণরা নির্যাতিত হচ্ছে ঘরে, সমাজে তথা রাষ্ট্রে। আমাদের ঘর, সমাজ ও রাষ্ট্র অনেকটাই প্রবীণবান্ধব নয়। গবেষণা বলছে, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রবীণরা তিন ধরনের নির্যাতনের শিকার, শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক। পুরুষের চেয়ে মহিলারা এই নির্যাতনের শিকার বেশি হন। শহুরে প্রবীণরা তবুও পরিবারে কোন রকম টিকে থাকলেও গ্রামীণ প্রবীণদের চিত্রটা আরও ভয়াবহ। যে ব্যক্তি সারাজীবন কৃষিকাজ করতেন বা কঠোর পরিশ্রমের কাজ করে আয়রোজগার করতেন, তিনি প্রবীণ বয়সে আর ভারী কাজ করতে পারছেন না; অন্যদিকে ছেলেমেয়েরাও আয়রোজগারের আশায় শহরমুখী। তারাও তাদের বাবা-মাকে ঠিকমত দেখভাল করতে পারে না। তাই গ্রামীণ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ছিটকে যাচ্ছে সমাজ থেকে। বেঁচে থাকার জন্য তারাও শহরমুখী হচ্ছে, বেছে নিচ্ছে ভিক্ষাবৃত্তি। বাড়ছে ছিন্নমূল প্রবীণের সংখ্যা, পথ প্রবীণের সংখ্যা। শহরের চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন হলেও প্রবীণরা নিজ বাড়িতেই অনেক সময় দুর্ভোগের শিকার হন। নিজের ইচ্ছার কথাগুলো তারা ছেলেমেয়েদের বলতে পারছেন না। ছেলেমেয়েরা তাদের সম্পত্তি লিখে নিচ্ছে এবং তারপর তাদের আর খোঁজখবর রাখছে না। তারা ভুগছেন অর্থনৈতিক নিরপত্তাহীনতায়। অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে তারা বঞ্চিত। ছেলে ও ছেলের বউয়ের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় অনেক প্রবীণই মনে মনে আলাদা থাকতে চান; কিন্তু কে নেবে তাদের দায়িত্ব। আবার অনেক প্রবীনই পেনশনের টাকা বা তার নিজ জমানো টাকা দিয়ে নিজের মতো বাস করতে চান। সে ক্ষেত্রে তারা খুঁজে বেড়ান বাসযোগ্য একটি জায়গা। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এখনও প্রবীণদের জন্য বাসযোগ্য ‘প্রবীণ নিবাস’ তৈরী হয়নি। এটি হওয়া জরুরী। প্রবীণরা চাইলেও আলাদা করে বসবাস করতে পারছেন না। প্রবীণদের জন্য নেই কোন আলাদা অধিকারের ব্যবস্থা। সরকারি হাসপাতালগুলোয় এখন পর্যন্ত নেই কোনো জেরিয়েট্রিক মেডিসিন স্পেশালিস্ট, নেই জেরিয়েট্রিক মেডিসিন বিভাগ, স্বল্পোমূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা। তাই প্রবীণদের কথা চিন্তা করে স্থানীয় গন্যমাণ্য ও সমাজসেবী ব্যক্তি বর্গের সমন্বয়ে “আরা” সাতক্ষীরা উত্তর কাটিয়া দাস পাড়া প্রাইমারী স্কুলের পশ্চিম পাশে অবস্থিত একটি প্রবীণ আবাসন কেন্দ্র (বৃদ্ধাশ্রম) গড়ে তুলেছে যা বর্তমানে চলমান।
সম্মানিত প্রবীণদের অধিকারের দিকটি ভেবে এবং সবার বার্ধক্যের কথা মাথায় রেখে জাতিসংঘের ডাকে সাড়া দিয়ে আজকের এই দিনে আসুন নবীন-প্রবীণ সবাই মিলে বাংলাদেশের প্রতিটি শহর-গ্রাম গঠন-পুনর্গঠন করি স্বস্তি, স্বাচ্ছন্দ্য এবং তৃপ্তির সঙ্গে প্রবীণদের বসবাসের ব্যবস্থা যদি আমরা নিশ্চিত করতে পারি, তবে শহর- গ্রাম জীবনে একদিন আমাদের বার্ধক্যও হবে সফল, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। আসুন শপথ নিই, শহর-গ্রাম থেকে প্রবীণদের বিচ্ছিন্ন করব না। তাঁদের নিয়ে সবাই মিলে আমরা এই দেশকে করব সব বয়সীর জন্য সমান সুরক্ষিত এবং উভোগ্য এক অনিন্দ্য সুন্দর বাংলাদেশ। লেখক: নির্বাহী পরিচালক, আরা, সাতক্ষীরা।