মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রবীণদের স্মরণ পরম- শ্রদ্ধায়


প্রকাশিত : অক্টোবর ১, ২০১৮ ||

ডা. সুশান্ত ঘোষ
আজ ১ অক্টোবর ২০১৮ জাতিসংঘ ঘোষিত ২৮তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এ বছর দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ঈবষবনৎধঃরহম ঙষফবৎ ঐঁসধহ জরমযঃং ঈযধসঢ়রড়হং অর্থাৎ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রবীণদের স্মরণ পরম-শ্রদ্ধার। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদ ও চুক্তির সুবাদে বিশ্ববাসীর জন্য মানবাধিকার বিষয়টি আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রক্ষাকবজ যার ছায়াতলে নাগরিকরা বর্তমানে অনেক নিরাপদে আছে। ১৯৪৮ সালে ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সার্বজনীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণাপত্র দেয়। এই ঘোষণাপত্রে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও মর্যাদার অধিকার প্রতিষ্ঠার উল্লেখ থাকে। মানবাধিকারের এই সকল সনদ যাঁরা তৈরী করেছেন তাঁরা আজ প্রবীণ বা অতি প্রবীণ। কিন্তু সেই সকল শ্রদ্ধেয় প্রবীণদের জন্য এর সুফল ভোগের ব্যবস্থা কতটুকু করতে পেরেছি? ৭০ বছর পর তাঁদের মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা সহ সকল প্রবীণদের শ্রদ্ধায় স্মরণ করার বিশেষ আবেদন এ বছরে।
বাংলাদেশে ৬০ বছর এবং তদুর্ধ বছর বয়সীরা হচ্ছেন প্রবীণ। বাংলাদেশে বর্তমানে ১.৪০ কোটি প্রবীণ বাস করছেন। নি¤œ জন্মাহার, নি¤œ মৃত্যুহার ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে উন্নত পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সেবার জন্য প্রবীণদের সংখ্যা দ্রুতহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা হবে ২ কোটি ও ২০৫০ সালে হবে ৪.৫ কোটি। মানবাধিকার সনদ ও চুক্তিসহ সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রদর্শক আজকের প্রবীণরা। বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবি, সংস্কৃতি, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম কর্মীসহ সমাজের নেতৃত্বে প্রবীণদের উপস্থিতি এবং তাঁদের অবদান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় সকলেই আজ প্রবীণ। শ্রদ্ধেয় প্রবীণরা নিজেদের অবসর উপেক্ষা করে দেশ ও জাতির উন্নয়নে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন।
প্রাকৃতিক কারণে প্রবীণ বয়সে অঙ্গের কার্য্য-ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং কিছু কিছু অসুখের ঝুকি বেড়ে যায়। সেই ঝুকিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়। এই সুযোগ সুবিধা পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক নাগরিকের আছে। প্রবীণদের এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীতে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। তাদের প্রচেষ্টায় ১৯৮২ সালে ভিয়েনায় (ঠওচঅঅ) ক্রমবর্ধমান বয়স্ক সমাজের অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বয়স্কদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় এবং সকল মানুষের মাঝে বয়স্কদের মর্যাদাপূর্ণ অবদান ও সমস্যাগুলো অবহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ১লা অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস উদযাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই মোতাবেক ১৯৯১ সালের ১লা অক্টোবর প্রথম বিশ্ব প্রবীণ দিবস পালন করা হয়। ২০০২ সালে (গওচঅঅ) মাদ্রীদ-এ প্রবীণদের বিষয়ে জাতিসংঘ পুনরায় আলোচনা করে। বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির ফলে-বৈশ্বিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সেগুলোকে মোকাবেলা করার কৌশল আবিষ্কার করে সমাজ গঠনে সকল বয়সের মানুষদের সমান অংশীদারীত্ব দেওয়ার ঘোষনা দেওয়া হয়। এই আলোচনায় প্রবীণদের কর্ম ব্যবস্থার সুযোগ করে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
২০১৫ সালে প্রবীণদের সমস্যার পূন:মূল্যায়ন করা হয় এবং উল্লেখ করা হয় সমাজ গঠনে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কাউকে পিছনে না ফেলে সকলকে নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতে উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই জাতিসংঘের আহ্বান।
এম,ডি,জি সাফল্যে আমরা এস,ডি,জির মসৃণ সড়ক ধরে এগুচ্ছি। এক্ষেত্রে প্রবীণদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই প্রবীণদের সুরক্ষায় আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। তাদের সমস্যা মোকাবেলায় পরিবার ও সংগঠনের সচেতনতা ও সক্রিয়তা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষা, পাঠ্য সুচিতে, গণমাধ্যমের নানা কার্যক্রমে ও সাংস্কৃতিক তৎপরতায় বার্ধক্য ও প্রবীণদের অবস্থা, চ্যালেঞ্জ, চাহিদা, অধিকার ও আমাদের করণীয় বিষয়বস্তু উপস্থাপন করতে হবে যেমন স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে, সামাজিক সুরক্ষা দানে, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার উপায় বার করতে হবে।
প্রবীণদের প্রত্যাশা:
১। বার্ধক্য ও প্রবীণকল্যাণ বিষয়ক স্বতন্ত্র একটি মন্ত্রণালয় স্থাপন করুন;
২। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুন;
৩। প্রণয়নাধীন প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আইন পাশ করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করুন;
৪। পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন-২০১৩ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করুন;
৫। নাগরিকদের অংশীদারীত্বের মাধ্যমে দেশে বার্ধক্যবীমা (ঙষফ অমব ওহংঁৎধহপব), সার্বজনীন নাগরিক পেনশন ব্যবস্থা (টহরাবৎংধষ চবহংরড়হ ঝুংঃবস) ইত্যাদির প্রচলন করার উদ্যোগ গ্রহণ করুন;
৬। নারী, প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, বিচ্ছিন্ন ও অবহেলিত প্রবীণদের কল্যাণে বিশেষ কর্মসূচি চালু করুন;
৭। প্রবীণদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা সেবা এবং বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করার উদ্যোগ নিন;
৮। প্রবীণদের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী আয়বর্ধক এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিন;
৯। সকল যানবাহন, হাসপাতাল-ক্লিনিক, ব্যাংকসহ সেবা প্রতিষ্ঠানে প্রবীণদের জন্য স্বতন্ত্র ও রেয়াতের ব্যবস্থা চালু করুন;
১০। বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধিসহ দেশের সকল প্রবীণকে এই ভাতা কর্মসূচির অন্তর্ভূক্ত করুন;
১১। রেডিও-টেলিভিশনসহ সকল গণমাধ্যমে প্রবীণদের অবস্থা তুলে ধরে জনগণকে সচেতন ও সক্রিয় করুন;
আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বর্তমান প্রবীণবান্ধব সরকার উপর্যুক্ত নিবেদনগুলো আমলে নিয়ে আন্তরিক ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এতে করে দেশের প্রবীণরা ভাল থাকবেন আর নবীণ প্রজন্মও স্বস্তি পাবে তাদের জন্যে আগামীর তৃপ্তিকর আয়োজনে। আজকের এই দিনে প্রবীণদের আহবান হচ্ছে-কেবল আবেগ-অনুকম্পা অথবা দয়া-দাক্ষিণ্যে নয়, অধিকার আর প্রাপ্য সন্মানের ভিত্তিতে জাতি-ধর্ম-গোষ্ঠী নির্বিশেষে অনিন্দ্য সুন্দর এই বাংলাদেশে আমরা সবাই মিলেমিশে শান্তিতে আর স্বস্তিতে বসবাস করি এবং বার্ধক্য মোকাবেলায় সরকারী উদ্যোগে অংশীদার হয়ে নাগরিকদের এগিয়ে আসা উচিত।