দখল দুষণে প্রাণহীন প্রাণসায়র


প্রকাশিত : অক্টোবর ১০, ২০১৮ ||

আব্দুস সামাদ: কামার পাড়ার কাছে বাঁশের সাঁকো। ওটাতে ঝুঁকি নিয়েই চলছে ওপারের সুলতানপুরের সঙ্গে যোগাযোগ। পাড়া থেকে খালের বুকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে নর্দমার মুখ। পাশে রোদে শুকানোর জন্য ঘুটে মেলে রাখা। দূষণে কালো হয়ে যাওয়া নোংরা পানিতে তবু জলকেলীতে মত্ত রাজহাঁসের দল। সব দূষণ শুষে নিয়ে বুঝি খালটাতে প্রাণ ফিরিয়ে আনবে ওরাই। কিন্তু এ পানিতেও যে তারাও হুমকির মুখে সেটা কি করে বুঝবে অবুঝ হাঁসের দল?
খালের দুপাড়ে দীর্ঘ দিনের পুরাতন বসতি। দখল আর দুষণ নিয়েই যাদের বসবাস। এক বছরের শিশুকে কোলে নিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো রেশমা খাতুন। কথা হলো রেশমা খাতুনের সাথে। তিনি জোর গলায় বলতে লাগলেন, বিয়ে করেছেন ১৪ বছর। স্বামী সন্তান নিয়ে এই খাল পাড়েই থাকেন। তাদের কাছে খালের গন্ধকে গন্ধই মনে হয় না। রোগ ছড়াতে পারে এমন আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দিয়ে বললেন, আমরা সবাই তো এখানে বসবাস করি। তেমন কোন রোগ হয় না। সামান্য যা হয় তাও হোমিও ডাক্তারের ওষুধে ঠিক হয়ে যায়।
কথা বলতে বলতে চোখ পড়লো কোলে থাকা বাচ্চার পিঠের দিকে। অসংখ্য লালচে দাগ আর গুটি গুটি পিঠ ভরে আছে। মা রেশমা খাতুনের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে সোজা উত্তর, ও কিছু না। মশার কামড় না হয় চুলকানি, সেরে যাবে। তখনই মনে হলো সেই রাজা হাঁসগুলোর কথা। যেখানে মানুষই জানেনা খাল দুষণের ভয়াবহতা। সেখানে হাঁসতো তাদরেই পালিত।
সুলতানপুর বড় বাড়ার ব্রিজের ওপর রীতিমতো জমে উঠেছে কাঁচাবাজার। খালের বুকে ময়লার ভাগাড়টা যেনো দাঁত ভেংচাচ্ছে। একটু দূরেই বরফকল, শৌচাগার। বাণিজ্যিক দোকান, বসত ঘর আর মাছের বাজারও আছে খালের বুক জুড়ে। গড়ের কান্দায় পাড় থেকে খালের বুকে এগিয়ে দখলের দম্ভ ঘোষণা করছে প্রভাবশালীর পাকা দেওয়াল। পাকা পুলের কাছে খালের ওপর ঝুঁকে যেনো জেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের দ্বিতল দালান। বিপরীতে তবু খেয়াজালে জীবনের গান। এদিকটায় কচুরিপানার ছাড়া ছাড়া দল ভাসছে বটে, কিন্তু পানির বর্ণ দূষণে কালোই হয়ে আছে।
অনেক আগেই মজে গেছে প্রাণসায়র। জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরীর উদ্যোগে ১৮৬৫ সালে কাটা এই খাল তাই এখন প্রাণহীন। বছরের পর বছর ধরে শহরের বর্জ্য মিশতে থাকায় ঐতিহাসিক এই খাল পরিণত হয়েছে খোলা স্যুয়ারেজ লাইনে। তাই একসময় যে খালের পানি মানুষ পান করতো, সে পানির কাছে আসতে এখন রুমাল চাপা দিতে হয় নাকে।
শহরের মাঝ বরাবর অবস্থানের কারণে শহরবাসীকে নিত্যদিন এই খাল পাড়ি দিতেই হয়। শুনতে হয় প্রাণসায়রের প্রাণ হারানোর আর্তনাদ। কিন্তু সে আর্তনাদও চাপা পড়ে যায় প্রভাবশালীদের খাল দখলের করনে। শহরের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠার বদলে এই খাল তাই এখন বিষের কাঁটা হয়ে ব্যথা ছড়ায় সাতক্ষীরাবাসির বুকে। জমিদার প্রাণনাথের খোঁড়া এই খালের সংযোগ দক্ষিণের মরিচ্চাপ নদী থেকে উত্তরের নৌখারী খালের সঙ্গে। প্রাণসায়ের আর সায়রের খাল নামেও পরিচিতি আছে এর।
খননের পর এই খালই হয়ে উঠেছিলো সাতক্ষীরা শহরের যোগাযোগের অন্যতম রুট। মাল আর যাত্রীবাহী বড় বড় নৌযান চলাচলে এক সময় ব্যস্ত থাকতো প্রাণসায়র। খননকালে এর দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় ১৩ কিলোমিটার। প্রস্থ ছিলো প্রায় ২শ’ ফুট। কিন্তু সেই প্রশস্থতা কমে এখন অনেক স্থানেই ২০ ফুটের নিচে নেমে গেছে। লঞ্চ-নৌকা তো দূরের কথা, ভেলা ভাসানোর মতো ¯্রােতও নেই প্রাণহীন প্রাণসায়রে।
অথচ একসময় ইছামতির হাড়দাহ দিয়ে কলকাতা খাল হয়ে বড় বড় স্টিমারই ঢুকত প্রাণসায়র খালে। এই খাল খননের ফলে সাতক্ষীরার ব্যবসা-বাণিজ্য আর শিক্ষার প্রসার ঘটতে থাকে দ্রুত। এ শহর তাই পরিণত হয সমৃদ্ধিশালী নগরে। কিন্তু ১৯৬৫ সালের দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে বেশ ক’টি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হলে প্রাণসায়রের মৃত্যুযাত্রা শুরু হয়।
স্লুইস গেট গড়া হয় ইছামতির হাড়দাহ খাল, কলকাতার খাল, বেতনা নদীর সংযোগ খাল, বালিথা, খেজুরডাঙি নারায়ণজোল ইত্যাদি স্থানে। এরই ধারাবাহিকতায় খোলপেটুয়া নদীর ব্যাংদহা খালের মুখে স্লইসগেট নির্মাণের চেষ্টা শুরু হলে প্রাণসায়রের মরে যাওয়া নিশ্চিত হয়। নদীর স্রোত খালের মধ্যে ঢুকতে না পেরে পলি জমে ভরাট হতে থাকে প্রাণসায়র।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ. ন. ম. গাউছার রেজা বলেন, এতে পরিবেশের প্রধানত দুই ধরনের সমস্যা হচ্ছে। একটা হচ্ছে পানি নিস্কাষণ জনিত সমস্যা অপরটি জৈব বৈচিত্র্য জনিত সমস্যা। প্রথমত, শহরের প্রাণ কেন্দ্র দিয়ে খালের মাধ্যমে যে পানি নিস্কাষন হচ্ছিল তা ব্যাহ হচ্ছে। পানি নিস্কাষন না হওয়ায় পানি জমে দুষণ ঘটাছে। দুরগন্ধ ছড়িয়ে নানা রকম রোগ জীবানুর বিস্তার ঘটাচ্ছে। দ্বিতিয়ত খালের পানি দুষিত হওয়া এই খালে মাছসহ নানা প্রকার জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণির উভয়ের যে সহঅবস্থান হওয়ার কথা ছিল তা হচ্ছে না। এত পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে। এছাড়াও আমাদের অর্থনীতিতে যে ভূমিকা রাখাত সেটিও ব্যাহত হচ্ছে। সৌর্ন্দয্য হানি ঘটাচ্ছে।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরার পৌর মেয়র তাসকিন আহমেদ বলেন, খালের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে একটি বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় আগামী ফেব্রুয়ারিতে টেন্ডারের মাধ্যমে খাল খনন ও সৌন্দর্য্য বর্ধনের কাজ শুরু হবে। তাছাড়া আগামি সপ্তাহে একটি টেন্ডার বিজ্ঞপ্তির প্রকাশ করা হচ্ছে। সেই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পাকাপুল থেকে গার্লস স্কুলের ব্রিজ পর্যন্ত সৌর্ন্দয্য বর্ধনের কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান।##