শিশুদেরকে সঠিক ইন্টারনেট ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে আমাদের শিশুরা নিরাপদ ও শংকামুক্ত সুন্দর জীবনের সন্ধান পাবে


প্রকাশিত : অক্টোবর ২৩, ২০১৮ ||

সুভাষ চন্দ্র সরকার
জীবনের একটা নাম সংগ্রাম আর এই সংগ্রাম মোকাবেলা করাই জীবনের সার্থকতা। মানুষ ক্রমবির্তনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে,আর এই সভ্যতার একমাত্র বাহন হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের প্রসারতা যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে আমরা ততই সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার দিকে ধাবিত হচ্ছি তাই বিজ্ঞান আমাদের জীবনের জন্য আর্শিŸাদ কিন্তু বিজ্ঞানকে যদি আমরা সুচারুভাবে ব্যবহার করতে না পারি তাহলে এটা হয়ে ওঠে আমাদের জন্য অভিশাপ।
বর্তমান ইন্টারনেটের ব্যাপক ব্যবহারে আমাদের শিশুদের জ্ঞানের চক্ষু প্রসারিত হচ্ছে বটে কিন্তু সেইসাথে ভেজাল তথ্য ও ভ্রান্ত ধারণার প্রচারও চলছে। ইন্টারনেট বা সামাজিক গণমাধ্যমে সোসাল মিডিয়ার দ্বারা প্রাথমিকভাবে আমরা নানান সমস্যায় জড়িয়ে পড়ছি। সেজন্য আমাদেরকে ইন্টারনেট ব্যবহারের ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে । যাতে করে আমরা ভালটুকু কাজে লাগাবো আর ভেজাল সব বর্জন করবো, কাজেই এরকম এক অবারিত জ্ঞানের ভান্ডার আহরণ থেকে শিশুদের বিরত রাখা তাদের বিকাশের পথে বড় ধরনের অন্তরায়।
সত্যিকার অর্থে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঝুকিপূর্ণ ইন্টারনেট ব্যবহার শিশুদের জন্য নির্যাতন ও হয়রানির একমাত্র কারণ। বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও ল্যাপটপের মাধ্যমে কোমলমতি শিশুরা ইন্টারনেট সেবা পাচ্ছে কিন্তু ইন্টারনেটের ব্যবহার সম্পর্কে ভাল মন্দ বিষয়ে তাদের কতটুকু শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে ।
এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে অজানা বিস্ময়, না দেখা নতুন পৃথিবীর অবিশ্বাস্য জগৎ। সীমাহীন কৌতুহল নিয়ে শিশুরা নতুন নতুন কিছু জানার আগ্রহে তারা ইন্টারনেট ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছে। অবাধ তথ্যের সম্ভারে বিচরণের সুযোগ থাকছে, তথ্য আদান প্রদানের মাধ্যমে পরষ্পর পরষ্পরের সাথে পরিচিত হচ্ছে ও বন্ধুত্ব স্থাপন করছে, নিজের চিন্তা চেতনার দ্বার প্রসারিত হচ্ছে, ভিডিও টিউটোরিয়ালের মাধ্যমে বাস্তব জ্ঞান অর্জনে সক্ষম হচ্ছে তাছাড়া বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও বৈচিত্রতা সম্পর্কে জানতে পারছে যা শিশুদের চিন্তা চেতনা তথা মননশীললতা বিকাশের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা হিসাবে কাজ করছে সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষের জন্য ইন্টারনেট এখন উন্মুক্ত। ইন্টারনেট হলো বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত অসংখ্য নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা। যোগাযোগ ও তথ্য আদান প্রদানের এটি অন্যতম একটি মাধ্যম।
এ ব্যাপারে আমরা কমিউনিটি ওয়ার্চ গ্রুপ তথা চাইল্ড রাইটস ডিফেন্ডার ফোরাম নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। বিভিন্নভাবে আমরা কমিউনিটি স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি, স্কুল শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, অবিভাবক, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অংশীদারগণকে সাথে নিয়ে আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছি। ইন্টানেটের অপব্যবহারের মাধ্যমে শিশুরা যাতে যৌন নির্যাতনের শিকার না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা অগ্রগতি সংস্থার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে এলাকার বড়দের ও যুবকদের সমন্বয়ে চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। শিশুদের জন্য শঙ্কামুক্ত নিরাপদ জীবন বিনির্মাণ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য, যেখানে শিশুরা ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে শুরু করে যেকোন ধরণের নির্যাতন থেকে নিরাপদ থাকবে। আমরা অগ্রগতি সংস্থার বাস্তবায়নে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সহযোগিতায় ইন্টানেটের মাধ্যমে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কার্যক্রমের সাথে একমত পোষণ করছি। সাথে সাথে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও সকল ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন অপরিহার্য ও সময়ের দাবি।
পরিশেষে ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিশুদের যৌন হয়রানী সংক্রান্ত অপরাধিদের বিচার দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য সরকারকে আরও ইতিবাচক হতে হবে, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আগাম সতর্কতাই পারে শিশু ও যৌন নির্যাতন অনেকাংশে কমিয়ে আনতে, সাথে সাথে প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় করা। তাছাড়া ইন্টানেটের মাধ্যমে যৌন শোষণ ও যৌন নির্যাতন থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখার জন্য আমাদের সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু ভাল ফলাফলের জন্য নয় বরং ভাল মানুষ হওয়ার কারখানা হতে হবে, তদ্রুপ পরিবারে সন্তানের প্রতি অন্ধ ভালবাসার চেয়ে সতর্ক ভালবাসা অনেক মূল্যবান। যৌন নির্যাতনের মত ঘটনাকে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করা দরকার, এ ব্যাপারে শিক্ষক ও অবিভাবকদেরকে বড় ধরণের ভূমিকা নিতে হবে ।
আসুন সকলে একতাবদ্ধ হয়ে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরী তথা শিশুর আলোকিত ভবিষ্যত গড়ে তোলার লক্ষে ইন্টারনেটের অপব্যবহার রোধে শিশুদেরকে সুরক্ষিত রাখি ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত স্বপ্নকে আরও বেগবান করি ।
সর্বপরি সন্তানের প্রতি অভিভাবক, ছাত্র-ছাত্রীর প্রতি শিক্ষকের বন্ধুর মত আচরন এবং সতর্ক চোখ রাখতে হবে। সঠিক পথে চলতে তাদেরকে সহযোগিতা করতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যাতে করে অন্ধকারের কোন শক্তি শিশু তরুন যুবদের জীবন বিকাশে হুমকি স্বরূপ না হয়, তা না হলে আমাদের সম্ভাবনাময় যুব তরুণরা একদিন অন্ধকারের পথে হারিয়ে যেতে পারে। আমাদের সন্তানদের সুন্দর সম্ভাবনাময় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ঝুকিপূর্ণ জীবন দুই ক্রসরোডের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতএব এখনই সময় সকলে মিলে সমন্বিতভাবে আমাদের শিশুদেরকে সঠিক ইন্টারনেট ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে আমাদের সন্তানেরা নিরাপদ ও শংকামুক্ত সুন্দর জীবনের সন্ধান পাবে। এগিয়ে যাবে শিশুরা, এগিয়ে যাবে আমাদের সোনার বাংলাদেশ, পৌছে যাবো আমরা আমাদের কাংখিত লক্ষ্যে। সবশেষে কবি সুকান্তের ভাষায় বলতে চাই-এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’। লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও সভাপতি, শিশু অধিকার সুরক্ষা ফোরাম