উন্নয়নের অভিযাত্রায় বাংলাদেশের কৃষি


প্রকাশিত : অক্টোবর ২৫, ২০১৮ ||

মো. আবদুর রহমান
সুদীর্ঘকাল থেকেই কৃষি আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৪.২৩ শতাংশ। দেশের জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই গ্রামে বসবাস করেন, যার অধিকাংশই কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। তাই কৃষির টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান তথা সামষ্টিক অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার এ বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কর্তৃক গৃহীত সময়োপযোগী পরিকল্পনাসমূহ সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (গউএ) সাফল্যের সঙ্গে অর্জন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (ঝউএ) সহ ভিশন-২০২১ ও ২০৪১ অর্জনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর নিরলস প্রচেষ্টায় সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের কৃষি খাতে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। দেশ ইতোমধ্যে দানাদার খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। আজ বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম ও আলু উৎপাদনে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রায় ১৬ কোটি মানুষের এদেশে সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে বিস্ময়কর ও অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে কৃষিতে।
বর্তমানে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭১ সালে দেশের মোট দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমান ছিল ১১০ লাখ মেট্রিক টন, যা বিগত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৪১৩.২৫ লাখ মেট্রিক টন। বিগত ২০০৮-০৯ সালে আলুর উৎপাদন ছিল ৫২.৬৮ লাখ মেট্রিক টন, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৩.১৭ লাখ মেট্রিক টনে। নিবিড় সবজি চাষের মাধ্যমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৫৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদন করে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সবজির পাশাপাশি দেশে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ভাসমান বেডে চাষাবাদ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শাক-সবজি ও মসলা উৎপাদন করা হচ্ছে। ভাসমান বেড়ে চাষাবাদ পদ্ধতিটিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ) ২০১৫ সালে কৃষিতে বাংলাদেশের বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এভাবে কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের সাফল্য প্রচার করছে বিশ্বের জন্য উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে।
কৃষি গবেষণার উৎকর্ষ সাধনের ক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও বাংলাদেশ অত্যন্ত সফল। লবণাক্ততা, খরা ও জলমগ্নতা সহনশীল এবং জিংকসমৃদ্ধ ধানসহ এ পর্যন্ত ধানের ১০৮টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এতে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিগত ২০০৮-০৯ অর্থবছর হতে এ পর্যন্ত বিআরআরআই কর্তৃক ধানের ৩৫টি বিএআরআই কর্তৃক বিভিন্ন ফসলের ১৭০টি, বিজেআরআই কর্তক পাটের ৯টি, বিএসআরআই কর্তৃক ইক্ষুর ৮টি ও সুগার বিটের ৪টি, সিডিবি কর্তৃক তুলার ৭টি এবং বিআইএন এ কর্তৃক বিভিন্ন ফসলের ৫৫টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। অধিকন্তু, জিএমও (এবহবঃরপধষষু গড়ফরভরবফ ঙৎমধহরংস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিটি বেগুনের ৪টি জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং বিটি তুলার জাত উদ্ভাবনের কাজ চলমান রয়েছে।
সারাদেশে নারিকেল, তাল ও খেজুর চাষ বৃদ্ধির কার্যক্রম চলমান। এরই মধ্যে ৭লাখ খাটো জাতের নারিকেলের চারা, ৩০ লাখ তালের চারা এবং ১০ হাজার খেজুরের চারা বিতরণ ও রোপন করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরণের অপ্রচলিত ও বিদেশি ফল চাষে উৎসাহ প্রদান অব্যাহত রয়েছে। উৎপাদনমুখী কৃষিবান্ধব সরকার নানাবিধ সহযোগিতা প্রদানের লক্ষ্যে মোট ২ কোটি ৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৭ জন কৃষককে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান করেছে। পাশাপাশি কৃষকদের মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দিয়ে ১ কোটি ১ লাখ ১৯ হাজার ৫৪৮ টি ব্যাংক হিসাব খোলা সম্ভব হয়েছে, যেখানে বর্তমান স্থিতি ২৮২ কোটি টাকা। বর্তমান সরকার ২০০৮-০৯ অর্থ বছর হতে প্রণোদনা/কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করেছে। একর্মসূচির মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৮২৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ৭৪ লাখ ৫৪ হাজার ৩১৩ জন কৃষক উপকৃত হয়েছেন। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া এবং বিভিন্ন ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন বাবদ ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাসের লক্ষ্যে সরকার রাসায়নিক সারের মূল্য ৪ দফা কমিয়ে বর্তমানে প্রতি কেজি টিএসপি ৮০ টাকা থেকে কমিয়ে ২২টাকা, ডিএপি ৯০ টাকা থেকে ২৫ টাকা এবং এমওপি ৭০ টাকা থেকে ১৫ টাকায় নির্ধারণ করেছে, যা বাংলাদেশের কৃষির জন্য এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে হাওর ও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার কৃষকদের জন্য ৭০% এবং অন্যান্য এলাকার জন্য ৫০% হারে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। ফলে চাষাবাদের ক্ষেত্রে প্রায় ৯৫% জমি যান্ত্রিক চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
বর্তমানে দেশে ফসল আবাদের নিবিড়তা বৃদ্ধি পেয়ে ২১৬% -এ উন্নীত হয়েছে, যা ২০০৮-০৯ র্থবছরে ছিল ১৭৯%। দুই দশক আগেও যেখানে দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল আবাদ হতো, সেখানে বর্তমানে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। কোথাও কোথাও কিছু কিছু পরিকল্পিতভাবে একই জমিতে বছরে ৩-৪টি ফসল পর্যন্ত হচ্ছে। তাছাড়া মিশ্র ফসল, সাথি ফসল, রিলে ফসল, ঘেরের আইলে ফসল, বহুস্তরী ফসল, যৌক্তিক ফসল বিন্যাস, মৌচাষ, ছাদ কৃষি, বসতবাড়ির কৃষি, নার্সারি ব্যবস্থাপনা, ফল বাগান, কৃষি ভিত্তিক কুটির শিল্প, বহুমুখী সমন্বিত কৃষি, সার্জান কৃষি, কৃষিতে আইসিটি ও ডিজিটাল সেবা, সময়োপযোগী কৃষি ও লাগসই প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার-এসব কারণে কৃষিক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে অভূতপূর্ব অভাবনীয় ও ঈর্ষণীয় সাফল্য।
কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করে ফসল উৎপাদনের আঞ্চলিক উপযোগিতা বিবেচনায় ক্রপিং জোন (ঈৎড়ঢ়ঢ়রহম তড়হব) নির্ধারণের মাধ্যমে কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধিসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ ফল ও সবজি উৎপাদনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কৃষিখাতে বায়োটেকনোলজি, পার্চিং, ফেরোমন ফাঁদ, আইপিএম, আইএফএমসি, আইসিএম, উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ব্যবহার করে যথাসম্ভব বালাইনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে কৃষির অগ্রযাত্রা বিশ্বব্যাপী অন্যান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাই সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসহ সবার সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নের এধারাবাহিকতাকে টেকসই রূপ দিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, তেরখাদা, খুলনা