সাতক্ষীরার স্কুল ছাত্রী চাঁদনী আত্মহত্যা ক্ষয়ক্ষতির জন্য প্রেমিক হুরাইরা দায়ী নয় মর্মে মৃত্যুর আগে লিখিয়ে নেন মা ছখিনা


প্রকাশিত : নভেম্বর ১৫, ২০১৮ ||

 

 

পত্রদূত রিপোর্ট: ‘আমি গড়েরকান্দায় যে কথা বলেছিলাম সেটা আমার ভুল। আমার ক্ষয়ক্ষতির জন্য আবু হুরাইরা দায়ি না। আমার কোন ফেমিলি কেউ দায়ি না।’ আত্মহত্যার আগে সাতক্ষীরা শহরের গড়েরকান্দার আব্দুর রহমান মুন্সির বাড়িতে যেয়ে স্ত্রীর দাবিতে অবস্থান করার সময় প্রেমিক আবু হুরাইরার উপস্থিতিতে তার বাবা ও মা-সহ কয়েকজনের হাতে নির্যাতিত শহরের গফুর সাহেবের বাগানবাড়ি এলাকার ১০ম শ্রেণির ছাত্রী আসফিয়া খাতুন চাঁদনীর কাছ থেকে এভাবেই জবানবন্দি লিখিয়ে নেওয়া হয়।

 

সরেজমিনে সোমবার দুপুরে সাতক্ষীরা শহরের গড়েরকান্দা রহমতপুর জামে মসজিদের পাশে গেলে বাড়িতে বসেই কথা হয় আব্দুর রহমান মুন্সি ও তার স্ত্রী সখিনা খাতুনের সাথে। তিন বছর আগে হাফিজিয়াখানা থেকে বাড়িতে আসার পর গফুর সাহেবের বাগানবাড়ি এলাকার আসফিয়া খাতুন চাঁদনীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মেয়েটি প্রায়ই তাদের বাড়ি সংলগ্ন দোকানের সামনে এসে হুরাইরার সঙ্গে কথা বলতো। বিয়ের প্রস্তাবও দেয় সে। ছেলের বয়স কম ও বেকার বলে রাজী হননি তারা। কয়েক মাস আগে বাড়িতে এসে বিয়ের দাবি করায় পুলিশ, একই পাড়ার মাংস বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম ও তার জামাতা যুবলীগ নেতা তুহীনের সহায়তায় তাকে তার বাড়িতে পৌছে দেওয়া হয়। পরে তার ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না বলে দাবি করে বলেন, মেয়েটি ফিটের রোগ ছিল। মেয়েটি বিয়ে নিয়ে যে কোন সময় অঘটন ঘটাতে পারে তাই তার মায়ের কাছে যাওয়ার সময় মেয়েটির সঙ্গে দেখা হওয়ায় তারই অনুরোধে গফুর সাহেবের বাগান বাড়ির আব্দুল জলিলের ছেলে মাদকসেবী শরিফুল ইসলামের বাড়িতে যেয়ে তার ক্ষয়ক্ষতির জন্য হুরাইরা ও তার ফেমিলি কেউ দায়ি নয় বলে লিখিয়ে নেই। তাতে স্বাক্ষর করেন পলাশের স্ত্রী লিপি, প্রতিবেশি চম্পা খাতুন ও ফতেমা। তবে ২৯ অক্টোবর চাঁদনীর আত্মহত্যার পর হুরাইরা কেন পালিয়ে আছে, তারা কেন কিছু দিন পালিয়ে ছিলেন এবং কি কারণে হুরাইরা ও তার পরিবার চাঁদনীর ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ি নয় এমনটি লিখে নিতে হলো? এর কোন সদুত্তর দিতে পারেননি ছখিনা খাতুন ও আব্দুর রহমান। তবে দোকানে বসে মোবাইলে দীর্ঘ সময় কথা বলা ও ফেসবুক দেখার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে সিম খুলে নেওয়ায় মৃত্যুর কয়েকদিন আগেই হুরাইরা বাড়ি থেকে চলে গেছে বলে দাবি তাদের। চাঁদনীর মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত ছেলের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি অস্বীকার করনেনি তারা।

 

গড়েরকান্দার মাংস বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম জানান, কয়েক মাস আগে আব্দুর রহমান মুন্সির বাড়িতে চাঁদনী নামের একটি মেয়েকে নিয়ে টানা হেচড়া হচ্ছে এমনটি দেখতে পেয়ে তার পরিচয় জেনে তাকে কারিমা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে আনোয়ারের দোকান পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে চলে আসেন তিনি। বাড়ি আসার পরপরই ইটাগাছা ফাড়ির পুলিশ এসে তার কাছ থেকে এ মর্মে একটি লিখিত নিয়ে যান।

 

সাতক্ষীরা পৌর যুবলীগের নেতা মেহেদী হাসান তুহিন জানান, তার শ্বশুর মাংস বিক্রেতা শফিকুলের কাছে তিনি খবর পান যে বিয়ের দাবিতে প্রেমিক হুরাইরার বাড়িতে এলে চাঁদনীকে মারপিট করে ছেলেটির বাবা আব্দুর রহমান মুন্সি ও মা ছখিনা খাতুনসহ তাদের স্বজনরা। এতে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে ওসখানে বহু লোক জমা হয়। খবর পেয়ে তিনি ইটাগাছা পুলিশ ফাড়িতে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বিয়ের দাবিতে মেয়েটি ওই বাড়িতে অবস্থান করায় তাকে নির্যাতন করা হয়েছে মর্মে পুলিশ নিশ্চিত হয়ে তাকে বিষয়টি অবহিত করে।

 

চাঁদনীর সহপাঠী সুমাইয়া জানায়, ২৮ অক্টোবর বিকেলে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকরা শিক্ষকদের আহবানে বিদ্যালয়ে এসেছিলেন। চাঁদনী, খাদিজাও বিদ্যালয়ে এসেছিলো। বিকেল সোয়া ৫টার দিকে মশলা মুড়ি বিক্রেতার পাশে রুনা আন্টি তাকে ডাকছে বলে চাঁদনী চলে যায়। পরে  মুন্নি  আন্টি ও রুনা আন্টি তাকে জেলা প্রশাসকের কাছে নিয়ে যায় বলে জেনেছে।

 

কারিমা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বদিউজ্জামান খান জানান, চাঁদনীসহ কয়েকজন বিকেলে তার কাছে প্রাইভেট পড়তো। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে থেকে চাঁদনী তার কাছে পড়তে আসতো না।

 

রাজারবাগান এলাকার শিক্ষক ফারুক হোসেন জানান, মৃত্যুর সপ্তাহ খানেক আগে থেকে চাঁদনী বিকেলে তার কাছে পড়তো। ২৯ অক্টোবর সকালে চাঁদনী তার কাছে পড়তে আসার পথে ইভটিজিং এর শিকার হয় এমনটি ঠিক নয়।

 

সম্প্রতি কালিগঞ্জ থানায় বদলী হওয়া পুরাতন সাতক্ষীরা পুলিশ ফাড়ির উপ-পরিদর্শক জিয়ারত আলী জানান, সুলতানপুরের মুন্নি নামের একজনের অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি ২৭ অক্টোবর গফুর সাহেবের বাগানবাড়ি এলাকার মেহেদী হাসানের বাড়িতে যান। তদন্তে মুন্নি খাতুনের শ্লীলতাহানি সম্পর্কিত মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাননি তিনি।

 

মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা সদর থানার উপ-পরিদর্শক নিমাই কুমার দেবনাথ জানান, হুরাইরা ও তার পরিবারের জন্য চাঁদনীর লিখে দেওয়া একটি জবানবন্দিসহ বেশ কিছু তথ্য তার কাছে এসেছে। ঘটনার নেপথ্যে বিস্তারিত তদন্ত শেষে উন্মোচিত হবে।

 

প্রসঙ্গত, সাতক্ষীরা শহরতলীর কারিমা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী আসফিয়া খাতুন চাঁদনী গত ২৯ অক্টোবর সকালে আত্মহত্যা করে। মৃত্যুর পর থেকে পালিয়ে যায় প্রেমিক আবু হুরাইরা ও তার পরিবারের সদস্যরা।