পাটকেলঘাটার দীপন মজুমদার সাহিত্যাঙ্গনে এক উদীয়মান নক্ষত্র


প্রকাশিত : ডিসেম্বর ৫, ২০১৮ ||

পাটকেলঘাটা প্রতিনিধি: শিক্ষা ও সাহিত্যে গবেষণাধর্মী কাজে তালা উপজেলাবাসি অনেক দিন পিছিয়ে ছিল। সাহিত্যিক, উপন্যাসিক ও নাট্যকর হিসেবে তালা উপজেলায় আলো জ্বালিয়ে ছিলেন কবি ও সাংবাদিক সিকান্দার আবু জাফর। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত তাঁর সিরাজউদ্দৌলা নাটকটি ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যঙ্গনে বেশ সাড়া জাগায়। এরপর তালা উপজেলা অনেক মেধাবীর জন্ম দেয়, কিন্তু সাহিত্যে গভীর বিচরণ হয়ে ওঠেনি সকলেই। অথছ মাইকেল মধুসূদন যেমন বিদেশের ভার্সাই নগরীতে বসে দেশের কথা ভুলতে পারেননি, ভুলতে পারেননি কপোতাক্ষ নদের কথা। তেমনি লন্ডনে বসে দেশের কথা ভুলতে পারছেন না তালার এক অঁজ পাড়াগায়ে জন্ম নেওয়া এক তরুণ উদীয়মান লেখক শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা ও গবেষক। নামটি তার দীপন মজুমদার। ছোট বেলায় তাকে গ্রামে সবাই লক্ষ্মীকান্ত নামে জানেন। তিনি সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার খলিষখালী ইউনিয়নের কাটাখালী গ্রামে ১৯৭৭ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মৃত (ঈশ্বর ) কালীপদ মন্ডল ও মাতা ননীবালা মন্ডল। বড় ভাই ব্যারিস্টার স্বপন মজুমদার লন্ডনে থাকেন। খলিষখালীর এ বাড়িটি বর্তমানে ব্যারিস্টার বাড়ি নামে পরিচিত। ৪ ভাই ৩ বোনের মধ্যে দীপন সবার ছোট। ১৯৯২ সনে প্রাচীন স্বনামধন্য বিদ্যাপীট কুমিরা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে ১ম বিভাগে পাস করেন। ১৯৯৪ সনে সাতক্ষীরা সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি প্রথম বিভাগে পাস করে ঢাকার একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে অর্নাস সম্পন্ন করেন। সকল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে গমন করেন। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভাসির্টি থেকে টেলিকমিউনেকেশন ও কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং বিষয়ে ¯œাতকোওর সম্পন্ন করেন। বর্তমানে লন্ডনে তিনি ঈজগ উবাবষড়ঢ়বৎ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি ছোট বেলা থেকে তিনি সাহিত্যে চর্চাই মনোনিবেশ করেন। ছোট-বড় গল্প, গদ্য, কবিতা লেখায় ছিল তার সখ। লেখাপড়ার চাপে সেগুলো তখন প্রস্ফুিটত হতে পারেনি। ২০১২ সালে একুশে বই মেলার প্রথম উপন্যাস ‘নিভৃতে কাঁদি’ বইটি প্রকাশিত হয়। এরপর পর্যায় ক্রমে আরও দুটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। ইতোমধ্যেই ছোট গল্প, উপন্যাস, শিশুগ্রন্থ সহ ৭-৮ টি বই তিনি রচনা করেছেন। মাইকেলের মত তিনিও সুদুর লন্ডনে বসে দেশের মায়া মোটেই ভুলতে পারছেন না। দেশকে নিয়ে ভাবনায় সারাক্ষণ। এদেশের মাটি মায়ের সন্তান দীপন মজুমদার ছোট বেলায় পাটকেলঘাটার কপোতাক্ষের পাড়েই কাটত তার প্রায় সময়। মাইকেলের মত একাধারে তার কলমের ক্ষুরধারে লিখেই চলেছেন তিনি। তার লেখা বই গুলো পড়ে বর্তমানে দেশের প্রধান আতঙ্ক ছিল উগ্রপন্থা সেটি দুর হবে বলে তিনি আশা করেন। শিশুদের বিনোদের জন্য কয়েকটি শিশুতোষ গ্রন্থ লিখেছেন। তার লেখা বইয়ের মধ্যে টুনটুনি ও রাজকন্যা, টুনটুনির স্বপ্ন পুরণ, টিং টং বক, অবয়ব, অন্যপথে, তিন ট পাঠকদের কাছে বেশ সমাদৃত হয়েছে। তিনি বলেন, কর্তব্যের তাগিদে আজ বিদেশ আসতে হয়েছে বটে-তবে মনটা পড়ে থাকে দেশে তার পল্লী মায়ের কোলে। তিনি আরো বলেন, দ্রুত দেশে ফিরে এসেই শিশু শিক্ষার বিকাশে শিশু বিদ্যাপিঠ ও দাতব্য চিকিৎসালয় করে দেশের সেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন। তাই সকলের কাছে তিনি আশির্বাদ কামনা করেন। দীপন মজুমদারের মতো অনেক মেধাবী সাহিত্যিক আজ তালা উপজেলা তথা দেশের বড় প্রয়োজন। যদিও পাটকেলঘাটার আশ-পাশ জুড়ে অনেক লেখক সাহিত্যিক তাদের লেখার মাধ্যমে নিজেকে প্রস্ফুটিত করার চেষ্টা চালিয়েছেন, এলাকায় সাহিত্য গবেষণার জন্য তেমন কোন প্রতিষ্ঠান না থাকায় বিকশিত হতে পারছেনা তাঁদের লেখাগুলি। তাদের মধ্যে কুমিরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মরহুম শেখ আব্দুল ওয়াদুুদ, পাটকেলঘাটা হারুণ অর রশিদ ডিগ্রী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সুলতান আহম্মেদ, কলেজের বাংলা বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক ফকির আহমেদ শাহ, কলেজের কর্মচারী আব্দুল খালেক, সেনপুর গ্রামের বদরু মোহাম্মাদ খালেকুজ্জামান (সুহৃদ সরকার), হাফিজুর রহমান প্রমুখ।
দীপন মজুমদারের ‘টুনটুনি ও রাজকন্যা’ ছোট গল্প পড়লে জানা যাবে একজন কিশোর কিশোরী কিভাবে স্বপ্নের দেশে যেতে পারে। এ গল্পে টুনটুনি ও রাজকন্যার মধ্যে বন্ধুত্ব হওয়ার পর কিভাবে টুনটুনি তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রাজকন্যাকে সকল বিপদ থেকে রক্ষা করে রানীর আসনে অধিষ্ঠিত করেছে সে কথা বলা হয়েছে। ‘টিং টং বক’ ছোট গল্পে বক যখন মাছ ধরতে যায় তখন মাছেরা জীবন বাঁচাতে কিভাবে বককে ফাদে ফেলে বেঁচে যায় সেকথা বলা হয়েছে। ‘তিন ট’ গল্পে গ্রামে বাংলার হারিয়ে যাওয়া বিল-ঝিল, শতদল, শাপলা, ডিঙি নৌকা, কলার ভেলা চড়ে ভেসে যাওয়া এমনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বলা হয়েছে। ‘অবয়ব’ কাব্য গ্রন্থে জীবনের সর্বদিক কবিতার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। এ গ্রন্থে সংসারের প্রেম-বিরহ, সমাজ পরিবর্তন, জীবন গঠনের ভূমিকা সহ দৃঢ় সংগ্রামের কথা বলা হয়েছে। ‘নিভৃতে কাঁদি’ উপন্যাসে যৌবন বয়সে এমনি অনেক ঘটনা ঘটে একবার পা পিচলে পড়ে গেলে পরবর্তী জীবনে নিভৃতে একা কাঁদা ছাড়া উপায় থাকে না এমনি উপদেশ মূলক কথা বলা হয়েছে। ‘অন্যপথে’ উপন্যাসে একজন বিপদের বন্ধু যখন পাশে এসে হাত মিলায় জীবনকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে আবার সেই বন্ধু পরিস্থিতির খাতিরে বিপদের বন্ধুকে দূরে ঠেলে দিতে বাধ্য হয় কেন, এমনি ঘটনা অবলম্বনে বইটি রচিত হয়েছে। সর্বশেষ দীপন মজুমদার জানান বিজয়ের এ মাসে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কিছু উপন্যাস, গল্প, কবিতা লেখার উদ্যোগ নিয়েছেন।