একজন হিরো আলম ও আমাদের ভাবনা!


প্রকাশিত : ডিসেম্বর ৬, ২০১৮ ||

মো. জাবের হোসেন
আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্প্রতি একটা বিষয় খুব ভাইরাল হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন পত্র-পত্রিকায় তাকে নিয়ে লেখা হচ্ছে। এতে করে ফ্রিতে তার পরিচিতিটা বেড়ে যাচ্ছে। আগে হয়তো তাকে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ চিনতো। কিন্তু এখন তাকে দেশের প্রায় সকল মানুষ চেনেন। এই যে চেনা-জানার বিষয়টা কিন্তু আমরাই তাকে পথ তৈরি করে দিয়েছি।
আমাদের দেশ যখন স্বাধীন হয়েছিলো তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিদেশ থেকে ৭ কোটি মানুষের জন্য ৭ কোটি কম্বল নিয়ে এসেছিলেন।কিন্তু ভাগ শেষে দেখা গেলো তার নিজের ভাগই নেই। তাই তিনি তখন বলেছিলেন, ‘সবাই পেলো সোনার খনি, আর আমি পেলাম চোরের খনি।’ আমি বাঙালিকে খাটো করে দেখার জন্য কথাটা বলেননি। কারণ আমিও একজন বাঙালি। কথাটা উপমা অর্থে ব্যবহার করলাম।
আমরা যদি ওই কথাটার একটু বিশ্লেষণ করি তাহলে যেটা বুঝি সেটা হলো, বাঙালি হিসেবে আমরা যেমন নিজেদের ভালো চাইনা, তেমনি অন্যের ভালোও চাইনা। ভালো-মন্দ না বুঝেই তর্ক-বিতর্ক শুরু করি। আমরা একটা কথা বলার আগে ভাবিনা কথাটা কতটা যুক্তিসংগত। একটা হুজুগ উঠলেই হয়। আমরা হলাম হুজুগে বাঙালি।
আমরা যাকে নিয়ে এত মাতামাতি, যাকে নিয়ে এত আলোচনা-সমালেচনার ঝড় তুলেছি সেই ব্যক্তি আসলে কে সেটা হয়তো আমরা অনেকেই জানিনা।
আসলে হিরো আলমের প্রকৃত নাম আশরাফুল আলম। ছোটবেলা থেকেই অভাব-অনটনের সাথে চলা আলমের পরিবার তাকে আরেক পরিবারের হাতে তুলে দেয়। পরে রাজ্জাক নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে বড় হন। অভাবের তাড়নায় আলম ৭ম শ্রেণির পরে আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। তারপর সিডি বিক্রির ব্যবসা করতেন।পরে নিজ গ্রাম বগুড়ার এরুলিয়ায় ক্যাবল নেটওয়ার্কের ব্যবসা শুরু করেন।
সিডির ব্যবসা থেকে ক্যাসেটে মডেলদের ছবি দেখি তিনিও নিজেকে মডেল হওয়ার বাসনায় অস্থির হয়ে পড়েন। ২০০৮ সালে প্রথম একটা গানের মডেলিং করেন। সেটাই তার শুরু। এরপরের বছরই সে বিয়ে করে পাশের গ্রামের এসএসসি পড়ুয়া সুমীকে। এখন দুই সন্তান আলম দম্পত্তির।
তারপর তার মাথায় রাজনীতির ভূত চাপে।সে থেকে ইউপি নির্বাচনে দাঁড়ায়।কোনো বার পাশ করতে পারেন নি।তবে শেষের বার মাত্র ৭০ ভোটে হেরেছে।
হঠাৎ করে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তার মাথায় এমপি ইলেকশনের ইচ্ছা জাগ্রত হয়। সেই থেকে হিরো আলমের বাহাদুরি বাড়তে থাকে। মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে হিরো আলম। এ যেনো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি।
একটা গল্পের সাথে আলমের যেনো ঘনিষ্ঠ মিল আছে বলে আমার মনে হয়। একদা একজন লোক নদী পার হচ্ছিলো। নদীর উপরে দেয়া সাঁকো দিয়ে পার হওয়ার সময় লোকটি মাঝপথে যেয়ে দেখলো একটা পাগল তার সাঁকোর খুটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পাগল লোকটির দিকে না তাকিয়ে নিজের মনের সুখে খুঁটিটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় নদী পার হওয়া লোকটি পাগলকে বলছে, এই পাগল তুমি যেনো খুঁটিতে ঝাঁকা দিওনা, তাহলে আমি পড়ে যাবো। তখন পাগলের নজর লোকটির দিকে ফিরে আসলো, আর পাগলটি ভাবলো তাই তো আমি এই খুটিতে ঝাঁকা দিলে লোকটি পড়ে যাবে। তাহলে আমি শুধু শুধু কেনো ধরে দাঁড়িয়ে আছি। তার চেয়ে বরং আমি খুঁটিটি ধরে ঝাঁকা দেই তাহলে লোকটি পড়ে যাবে। এভাবে খুঁটিতে ঝাকা দিয়ে লোকটিকে নদীতে ফেলে দিলো।
এই গল্পটা থেকে স্পষ্ঠ প্রতিয়মান হলো, কাউকে অযথা কোনো কথা না বলাই শ্রেয়।
হিরো আলম কিন্তু হিরো হয়েছে আমাদের কারণে। তাকে নিয়ে আমরা যদি না আলোচনা করতাম, না সমালোচনা করতাম তাহলে কিন্তু সে এত পরিচিতি পেতোনা। ঠিক তেমনি সে এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইচ্ছা পোষণের মাধ্যমে সে নিজেকে নিজের জায়গায় নিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা যে অকালকুষ্মা- সেই অকালকুষ্মা-ই রয়েই গেছি। এই যে আমি তাকে নিয়ে লিখছি এতেও কিন্তু তার প্রচার হচ্ছে।
জাতিগতভাবে আমরা অনেকটা অলস প্রকৃতির। মস্তিস্কে যখন কোনো কাজ করা না হয় তখন মস্তিস্ক অপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ভাবে। বাস্তব কথা হলো আমরা নিজেরা কতটা নিজের জন্য কাজ করছি, দেশের জন্য কাজ করছি সেটা ভাবতে হবে। একজনের জন্য সমালোচনার বাজার তৈরি না করে কীভাবে নিজেকে এগিয়ে নিতে হবে সেটা ভাবতে হবে।
বাইরের দেশে যখন ছাত্ররা ঘরের মধ্যে গবেষণাগারে বসে নতুন নতুন আবিষ্কারের লক্ষে গবেষণা করতে থাকে। ঠিক সেই একই সময় আমাদের দেশের ছাত্ররা রাস্তায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। যখন বাইরের দেশের ছাত্ররা মহাকাশে গবেষণায় লিপ্ত থাকে, তখন আমরা মত্ত্ব থাকি ইউটিউবের বিভিন্ন চ্যানেলে। যখন বাইরের দেশের ছাত্ররা জীবন রক্ষার্থে বিভিন্ন গবেষণা চালায়, তখন আমরা ভোজাল খাদ্য তৈরিতে ব্যস্ত থাকি। যখন বাইরের দেশের ছাত্ররা মেধা বিকাশের জন্য বই চর্চা করে, তখন আমরা পরীক্ষার খাতায় পাশ করার জন্য সারারাত জেগে বই পড়ি।
সত্যি বলতে আমাদের ভাবনাটা হয়ে গেছে ব্যক্তিস্বার্থ কেন্দ্রিক। যতদিন না আমরা এই ব্যক্তিস্বার্থ কেন্দ্রিকতা দূর করতে পারবো, যতদিন না আমরা সচেতন হবো ততদিন আমাদের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আসল কথা হলো আমরা যাকে নিয়ে যত বেশি সমালোচনা করবো তার তত বেশি উপকার হবে। আমাদের সমালোচনা, অন্যের প্রচারণা। আলোচনা-সমালেচনার মধ্যেই মানুষ বেঁচে থাকে চিরকাল।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, লাল সবুজের কথা ডট কম