সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলাম


প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২০, ২০১৮ ||

এমএ ওয়াহাব
‘জ্ঞানই শক্তি’। প্রাচীন কালের ক্ষুরধার তরবারি বা আধুনিক সমরাস্ত্র কোনটাই শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জন অপেক্ষা মূল্যবান নয়। দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন, ‘না জানার কারণে মানুষ ভুল করে’। তাইতো সঠিক পথে চলার জন্য মানুষের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা হল জ্ঞান লাভ করা। আর জ্ঞান অর্জনের পথ হল পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ। ইসলামে দোলনা থেকে শুরু করে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী থেকে চির বিদায়ের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বিদ্যা শিক্ষা করা প্রত্যেক মানুষের জন্য আবশ্যিক ঘোষণা করা হয়েছে।
আরবী শব্দ ‘সলম’ থেকে উৎপন্ন ‘ইসলাম’ অর্থ ‘শান্তি’ ছাড়াও এর অন্য একটা পরিভাষাগত অর্থ হল- সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে সমর্পিত হওয়া; আল্লাহকে খুশি করার জন্য সব কর্মকা- পরিচালনা করা বা না করা। তবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মালিকানাধীন হওয়ায় অধিকাংশ শক্তিধর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বিভ্রান্তিকর ও হিংসাত্মক অপপ্রচারের ফলে শান্তির ধর্ম ইসলাম বর্তমানে আতংকের অপর নাম হিসেবে পরিচিত হতে যাচ্ছে: অতিরঞ্জিত সচিত্র প্রতিবেদন দেখে অনেকে এর সত্যাসত্য যাচাই না করেই ইসলাম ও সন্ত্রাসকে অবিচ্ছেদ্যভাবে একই সূত্রে গেঁথে ফেলেছে যা সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক চক্রান্তের ফসল। এমনকি অধিকাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দূর্বলতার সুযোগে সেখানে অবৈধ অর্থ যোগান, অপসংস্কৃতির প্রচলনসহ বিভিন্ন অপকৌশলের মাধ্যমে স্বধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও নানান বিষয়ে মতভেদের ইন্ধন যোগায়ে বিভিন্ন পথ ও মতের সৃষ্টি করে হানাহানি, মারামারির মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য-সংহতি বিনষ্ট করার অবিরাম চেষ্টায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিধর্মীয় ধনী দেশগুলো সফল। অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি, সমরাস্ত্র বিক্রি ও অন্যান্য স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারণে সৌদি আরবসহ মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আন্ত:দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, প্রভৃতি উন্নত দেশগুলো সুকৌশলে ‘বিভাজন ও শোষণ’ নীতি কার্যকরণের মাধ্যমে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে তৎপর। বিশেষ করে ধনতান্ত্রিক ও বস্তুবাদী পশ্চিমা বিশ্ব সৌহার্দ-সম্প্রীতি, সাম্য, শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলামকে নানা কৌশলে অপপ্রচারের মাধ্যমে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী ধর্ম হিসেবে পরিচিত করার সকল অপতৎপরতায় ব্যস্ত, এমনকি ব্যক্তি বিশেষের অপকর্মের দায়-দায়িত্বও ঢালাওভাবে সুমহান এ ধর্মের উপর চাপাতেও কুন্ঠিত হয়নি। তদুপরি বিশ্বব্যাপী অপ্রতিরোধ্য গতিতে ইসলাম ধর্মের সর্বাধিক ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধিতে ভীত হয়ে অন্য ধর্মের অনুসারীরা সংঘবদ্ধভাবে এর বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত উপায়ে তাদের মালিকানাধীন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচারের মত অশুভ তৎপরতার আশ্রয় নিয়েছে, যা আমেরিকার চবি জবংবধৎপয ওহংঃরঃঁঃব কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণাপত্র ও অন্যান্য প্রামাণ্য দলিলের তথ্য বিশ্লেষণ করলে সহজেই বুঝা যাবে।
এমনকি ঈঘঘ, ইইঈ, অষঔঅতঊঊজঅ, প্রভৃতি মিডিয়ার প্রচারিত খবর দেখলেও সিরয়া, মিয়ানমার, ফিলিস্তিন, আফগানিস্থান, হার্জেগভিনা, ইরাক, প্রভৃতি দেশের নিষ্পাপ শিশুসহ নিরীহ জনগণের উপর কি পরিমাণ অমানবিক ও নৃশংস অত্যাচার করা হচ্ছে তার কিছু খ- চিত্র দেখে যে কোন মানব হৃদয় নি:সন্দেহে ব্যথিত হবে !
মুসলমানদের প্রধান দায়িত্ব-কর্তব্য হল: ১. আল্লাহর হক ও ২. সৃষ্ট জীবের হক আদায় করা। সুতরাং কোন অবস্থাতেই তার একজন অনুসারী অন্যের হক নষ্ট করার অধিকারী নয়। শান্তির ধর্ম ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হল ‘সৎ কাজের নির্দেশ দান ও অসৎ কাজে বাঁধা প্রদান’ করে অপরাধমুক্ত, সুখী ও সমৃদ্ধশালী কল্যাণ সমাজ গঠন করা। প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব মানবতার দীপশিখা প্রজ্জ্বলনকারী, সৌহার্দ-সম্প্রীতিময় সুখী সমাজের প্রবর্তনকারী, বিশ্বময় সাড়া জাগানো যুগান্তর সৃষ্টিকারী ধর্ম ইসলাম সর্বক্ষেত্রে সব সময় মধ্য পন্থা অবলম্বনের পক্ষপাতি; ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে কেবল একাগ্রতা, বিশ্বাসে অটল থাকা, নমনীয়তা, আন্তরিকতা, অবিচল কর্তব্যপরায়ণতা, ইত্যাদি স্বভাবসিদ্ধ গুণাবলীর ফলেই অর্জিত হয়েছে মহা বিজয়। মহানবী (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম মানবীয় গুণাবলীর জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি কখনই তাঁর জানী শক্রর সাথেও উগ্র ব্যবহার করেননি। হুদায়বিয়ায় মুশরিকদের নেতৃত্ব দানকারী কোরায়েশ নেতা সোহায়েলের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, মক্কী জীবনে স্বজাতির অসহনীয় অত্যাচার, ইহুদী পাওনাদারের দূর্ব্যবহার, মসজিদে নববীর মধ্যে বিধর্মী আরব বেদুঈনের পেশাব করা, কিম্বা যুদ্ধক্ষেত্রে শক্রর আস্ফালন, চরম সময়ে প্রমাণিত মুনাফেক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইসহ অনেকের বিশ্বাসঘাতকতা ও শক্রপক্ষের হাজারো বিরুপ আচরণ তাঁকে কোন অবস্থাতেই উত্তেজিত করতে সক্ষম হয়নি বরং চরম ধৈর্য্যরে সাথে সকল বিরুপ পরস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহর রহমতে তিনি মুসলমানদেরকে সৎ পথে পরিচালনার মাধ্যমে বিশ্ব ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা সফল ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে চিরস্থায়ী আসনে নিজকে অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এমনকি রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়ের পর চরম শক্রদেরকেও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দিয়ে তাদের জীবনকে মহিমান্বিত করেছেন; চির শক্র আবু সুফিয়ানকে যথাযোগ্য মর্যাদা এবং তার ঘরে জীবন নাশের ভয়ে সন্ত্রস্ত আশ্রয়প্রার্থী কোরায়েশদেরকে অভয় দিয়ে ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্তের সৃষ্টি করে অবিস্মরণীয় হয়েছেন। যুদ্ধগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে প্রমাণিত হবে, আগে মুসলমানেরা আক্রমণ করেননি সর্বক্ষেত্রে আক্রান্ত হয়ে প্রতিরোধে বাধ্য হয়েছেন মাত্র।
পবিত্র আল-কোরআনে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে ঘোষণা করছেন: ‘নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করা ব্যতীত কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল’ [সূরা মায়িদা : ৩২]। ‘দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না’ [সূরা আরাফ: ৫৬]। ‘যারা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের জন্য রয়েছে লা’নত এবং মন্দ আবাস’ [সূরা রা’দ: ২৫]। ‘ফিতনা অর্থাৎ প্রলোভন, দাঙ্গা, বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ, শিরক, ধর্মীয় নির্যাতন ইত্যাদি হত্যা অপেক্ষা গুরুতর’ [সূরা বাকারা: ১৯১]।
রাসুলুল্লাহ (সা.) উপর্যোপরি তিনবার আল্লাহর কসম করে বলেছেন ‘ঐ ব্যক্তি মুমিন নয়, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়’ (বুখারি ও মুসলিম)।
মূলত আর্থ-সামাজিক কারণসহ যান্ত্রিক জীবনের অভিঘাত, মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির অপব্যবহারে নৈতিক অবক্ষয়, ইত্যকার বহুবিধ কারণে মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে আজ সমাজের প্রায় সর্ব স্তরে প্রতিহিংসা গ্রহণ, পেশী শক্তির বলে আধিপত্য বিস্তার, অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনের তীব্র প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার দাপট, মানবতার অপমান, অপপ্রচার, ধর্ষণ, নির্যাতন, দূর্বৃত্তায়ন, ঘুষ, দুর্নীতি, পরমত গ্রহণে চরম অসহিষ্ণুতা, ইত্যাদি অনাকাক্সিক্ষত ও অসামাজিক কাজের আধিক্য দেখা দিয়েছে। ফলে সুষ্ঠু সামাজিক পরিবেশ বিপন্ন প্রায়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের অন্যতম প্রধান উপায় হল সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর ভিত্তিতে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করে প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তি সচেতনতা সৃষ্টি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জনগণের জৈবিক, প্রাকৃতিক, মানসিক চাহিদাগুলো পূরণ করে সহজাত মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা, ব্যাপক প্রচার, কর্মোপযোগী প্রশিক্ষণ, পরিশুদ্ধকরণ, যুব সমাজের কর্মসংস্থান, প্রভৃতি প্রায়োগিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ফিৎরাতের ধর্ম ইসলাম দরদী সমাজ গঠনে প্রাথমিক স্তরে মূলত প্রত্যেক ব্যক্তির নৈতিক, আদর্শগত মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ ও তা কার্যকরীকরণের উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে; কারণ অবকাঠামো অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তিই হল সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় বা বৈশ্বিক পরিম-লীর মূল ভিত্তি। ব্যক্তি জীবন শান্তিময় হলে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় তথা বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠাও ‘ইউটোপীয়ন থিংকিং’ বা উদ্ভট চিন্তা হিসেবে পরিগণিত হবে না। ব্যক্তিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সকল পর্যায়ে ইসলামের সুমহান শিক্ষার অনুশীলনে জীবন পরিচালনা করলে ইহলৌকিক শান্তি ও পারলৌকিক কল্য্যণ অর্জন সম্ভব। লেখক: মানব সম্পদ ও আর্থিক পরামর্শক, প্রাক্তন অধ্যাপক-ঢাকা সিটি কলেজ