অপুষ্টি রোধে শাক-সবজির ভূমিকা


প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮ ||

মো. আবদুর রহমান
বাংলাদেশের মানুষের জন্য অপুষ্টি একটি পারিবারিক, সামাজিক তথা জাতীয় সমস্যা। ধনী, গরীব প্রায় সকল পরিবারের অপুষ্টি বিদ্যমান। অপুষ্টির প্রধান শিকার হচ্ছে শিশু, কিশোর-কিশোরী ও মহিলারা। পুষ্টিহীনতার কারণে গর্ভবতী মায়েরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুর্বল শিশুর জন্ম দেয়। একারণেই ৫০ ভাগেরও বেশি নবজাত শিশু লৌহের অভাবে রক্তস্বল্পতার শিকার। ভিটামিন ‘এ’র অভাবে এখনও দেশে প্রতি বছর ৩০ হাজারের অধিক শিশু অন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া অপুষ্টির কারণে এদেশের শিশুরা রাতকানা, চর্মরোগ, ম্যারাসম্যাস, কোয়াশিয়কর, বেরিবেরি, মুখ ও ঠোঁটের কোণে ঘা, স্বার্ভি, রক্তস্বল্পতা প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হয়।
শিশুসহ বয়স্ক লোকের অপুষ্টি রোধে শাক-সবজির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, শাক-সবজি অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য। এতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন এ,বি,সি এবং ব্যালসিয়াম, লৌহ, আয়োডিন প্রভৃতি অতি প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ রয়েছে। তাছাড়া শাক-সবজি থেকে কিছু পরিমাণে প্রোটিন ও ¯েœহ পদার্থ এবং যথেষ্ট পরিমাণে শর্করা জাতীয় পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। প্রোটিনের পরিমাণ শাক-সবজিতে কম হলেও লাইসিন ও ট্রিপটোফেন নামক অপরিহার্য এমাইনো এসিড বেশি থাকে। গাঢ় সবুজ ও হলুদ রঙের শাক-সবজি বিশেষ করে কচুশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, গাজর ও মিষ্টি কুমড়াতে প্রচুর ক্যারোটিন থাকে। এ ক্যারটিন হতে আমাদের দেহে ভিটামিন ‘এ’ উৎপন্ন হয়। কাজেই পুষ্টির দিক থেকে শাক-সবজির ভূমিকা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করার পাশাপাশি শাক-সবজি দেহের রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই অধিক শাক-সবজি খেলে অনেক রোগ দূর হয় এবং শরীর সুস্থ থাকে। ক্যান্সার মারাত্মক একটি প্রাণসংহারী ব্যাধি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীগণ বলেছেন, ক্যান্সার প্রতিরোধে শাক-সবজির ভূমিকা অত্যন্ত কার্যকর। তাঁরা আরও বলেছেন, যে সব লোক শাক-সবজি বিশেষ করে সীম, বরবটি, মটরশুঁটি, আলু, মিষ্টি আলু, কপি জাতীয় সবজি (যেমন- ফুলকপি, বাঁধাকপি প্রভৃতি), গাজর ইত্যাদি নিয়মিত আহার করেন, তারা তুলনামূলকভাবে ক্যান্সার রোগে কম আক্রান্ত হন। কারণ, এসব শাক-সবজিতে এমন কিছু বিশেষ উপাদান রয়েছে যা শরীরে ক্যান্সার কোষ হওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করতে সহায়তা করে। সম্প্রতি ব্রিটেন ও নিউজিল্যান্ডের গবেষকরা জানিয়েছেন, মাংস ভোজীদের চেয়ে যারা শাক-সবজি বেশি করে খেয়ে থাকেন, তাদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আশংকা শতকরা ৪০ ভাগ কম। গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, যারা পর্যাপ্ত শাক-সবজি খেয়ে থাকে, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আশংকাও কমে যায়। কাজেই দেখা যাচ্ছে, অপুষ্টি ও দেহের রোগ প্রতিরোধে শাক-সবজির ভূমিকা অপরিসীম। শীতকালীন জনপ্রিয় পাতা জাতীয় সবজি বাঁধাকপিতে রয়েছে ইনডলস (ওহফড়ষবং) নামক ক্যান্সার প্রতিরোধক উপাদান। ইনডলস অন্ত্র এবং মলদ্বারের ক্যান্সার প্রতিরোধের ভূমিকা রাখে। এছাড়া কপি জাতীয় কিছু শাক-সবজিতে প্রচুর জেনিষ্টেন রয়েছে। স্তন, প্রষ্টেট ও মস্তিস্কের ক্যান্সার প্রতিরোধে এর বিরাট ভূমিকা রয়েছে। সম্প্রতি আমেরিকার ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনষ্টিটিউটের গবেষকরা টমেটোর উপর গবেষণা করে দেখেছেন যে, এতে রয়েছে এক ধরণের এন্টি অক্সিডেন্ট যার নাম লাইকোপেন (খুপড়ঢ়বহব)। এই লাইকোপেন দেহ কোষ হতে বিষাক্ত ফ্রি রেডিক্যাল সরিয়ে প্রোষ্টেট ক্যান্সারসহ মূত্রথলি, অগ্নাশয়, ফুসফুস, পাকস্থলি ও অন্ত্র নালীর ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।
শাক-সবজির বিদ্যমান আঁশ থাকায় এটি দেহের হজমের কাজে সহায়তা করে। তাই অধিক সবজি খেলে কোষ্ঠ-কাঠিন্য দূর হয় এবং শরীর সুস্থ থাকে। আজকাল চিকিৎসা ও পুষ্টি বিজ্ঞানীরাও শাক-সবজি খেয়ে দীর্ঘায়ু লাভের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ‘নিউট্রিশন একশন হেলথ’ লেটারের এক ইস্যুতে ক্যন্সার প্রতিরোধ শাক-সবজি ও ফলমূল গ্রহণের সুপারিশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, শাক-সবজি ও ফলমূল ২০ শতাংশ ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যও সবজি খুব উপকারী। সম্প্রতি ক্যমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানান, শাক-সবজি নিয়মিত খেলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি শতকরা ৮০ ভাগ হ্রাস পায়। সুতরাং, যাদের শরীরে এখনও ডায়াবেটিস রোগ দেখা দেয়নি, তাদের প্রতিদিন বেশি করে শাক-সবজি খাওয়া উচিত। এছাড়া শাক-সবজি শিশুদের অপুষ্টিজনিত রাতকানা, রিকেট, বিভিন্ন প্রকার চর্মরোগ, স্কার্ভি, মুখ ও ঠোঁটের কোণে ঘা, রক্তশূণ্যতা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র এবং অতিশয় স্থলতায় কার্যকর ভূমিকা রাখে।
প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান দেয়া ছাড়াও লাভজনক ও অর্থকরী ফসলের (ঈধংয ঈৎড়ঢ়ং) মধ্যে শাক-সবজি অন্যতম। এর চাষ করে অনেক ফসলের তুলনায় হেক্টর প্রতি অধিক আয় করা যায়। তাছাড়া শাক-সবজি চাষের জন্য খুব বেশী জমির দরকার হয় না। অল্প জমিতে সারা বছর শাক-সবজির মতো পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন করে অনায়াসেই আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী ও লাভবান হওয়া যায়। তাই বলা হয়ে থাকে ‘বসতবাড়ির আশে-পাশে,/ভরে দে ভাই সবজি চাষে।/ তাতেই পুষ্টি ও বাড়তি আয়,/ হয়ে যাবে বারো মাসে’।
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিদিন একজন শিশুর কমপক্ষে ১০০ গ্রাম ও একজন পূর্ণবয়স্ক লোকের জন্য দৈনিক ২০০ গ্রাম শাক-সবজি খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে একজন পূর্ণ বয়স্ক লোক গড়ে মাত্র ৩০ গ্রাম সবজি খায়। এর সাথে আলু ও মিষ্টি আলু যোগ করলেও প্রতিদিন গড় পরিমাণ ৭০ গ্রামের বেশি হয় না। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় আমরা খুব অল্প পরিমাণে শাক-সবজি খাই। পৃথিবীর আর কোন দেশের মানুষ সম্ভবত এত কম পরিমাণ শাক-সবজি খায় না। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড এবং আর একটু দূরবর্তী দেশ চীন ও জাপানে ভাত আমাদের মতোই প্রধান খাদ্য। কিন্তু এসব দেশের লোকেরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ শাক-সবজি খায়। মাথাপিছু প্রতিদিন সবজি খাওয়ার পরিমাণ ভারতে ১৬৭ গ্রাম, মায়ানমারে ১৫১ গ্রাম, থাইল্যান্ডে ১৬৪ গ্রাম, চীনে ২৬৯ গ্রাম ও জাপানে ৩৪৮ গ্রাম। আমরাও যদি এসব দেশের মানুষের মতো ভাতের উপর বেশি মাত্রায় নির্ভর না করে বেশি করে শাক-সবজি খাই। তাতে ভাতের উপর কেবলমাত্র চাপই কমবে শুধু তাই নয়, বরং ভাতের তুলনায় অনেক বেশি
ী পরিমাণ পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা হবে।
সুতরাং, শিশুসহ বয়স্ক লোকের দেহের পুষ্টি সাধন এবং দেহকে সুস্থ-সবল ও নিরোগ রাখা এবং আর্থিক অবস্থা উন্নয়নের জন অধিক পরিমাণে শাক-সবজি উৎপাদন করে তা বেশি করে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা একান্ত অপরিহার্য। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, তেরখাদা, খুলনা