কুল একটি জনপ্রিয় পুষ্টিকর ফল


প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৩, ২০১৯ ||

মোঃ আবদুর রহমান
কুল বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় পুষ্টিকর ফল। কুল ‘বরই’ নামেও পরিচিত। কিশোর ও মহিলাদের কাছে এ ফলটি অধিক সমাদৃত। আকারে ছোট হলেও কুল পুষ্টিমানে ভরপুর। এ ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে শ্বেতসার, লৌহ, ক্যালসিয়াম, বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
অনেকের মতে, ভারত উপমহাদেশেই কুলের উৎপত্তি স্থান। বাংলাদেশের সর্বত্র কুল জন্মে থাকে। কুল জযধসহধপবধব পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে একে, ইবৎ বা ঔঁলরনধব বলে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশে অসংখ্য জাতের কুল আছে। কিন্তু অধিকাংশ জাতের ফলই টক ও কষা। তবে এদেশে দু’টি সুপরিচিত উন্নত জাত রয়েছে, যথাঃ নারকেলী ও কুমিল্লা। নারকেলী জাতের ফল লম্বাটে, অগ্রভাগ সরু ও কিছুটা অনিয়মিত আকৃতির, ফল অ¤ø মধুর ও খুবই সুস্বাদু। রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলে যথেষ্ট পরিমাণে এর চাষ হয়। কুমিল্লা জাতটি প্রধানতঃ কুমিল্লা জেলার কচুয়া ও চান্দিনা উপজেলায় বেশি জন্মে। এর ফল বেশ বড়, ডিম্বাকার ও আকর্ষণীয়। কিন্তু ফল তেমন মিষ্টি ও সুস্বাদু নয়। সম্প্রতি ‘আপেল কুল’ নামে আর একটি জাতের কুল এদেশে চাষ শুরু হয়েছে। এর ফল আকারে ছোট এবং কাঁচা থাকতেই কুলের খোসায় লালচে আভা শুরু হয়। পাকলে সবুজের মধ্যে ঠিক আপেলের মতোই রঙ লাল হয়ে ওঠে। শাঁস কচকচে, প্রচুর ধরে আটি বা বীজ ছোট, শাঁস বেশি, যে কোন কুলের চেয়ে মিষ্টি। বাউকুল নামে বড় আকারের আর একটি কুল এদেশে চাষ হয়।
খাদ্য উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম কুল ফলে ২.৯ গ্রাম প্রোটিন, ২৩.৮ গ্রাম শ্বেতসার ও ০.১ গ্রাম ¯েœহ থাকে। এছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম কুলে ০.০২ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১, ০.০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২, ৫১ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’, ১১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও ১০৪ কিলোক্যালোরি খাদ্যশক্তি রয়েছে। দেহের পুষ্টিসাধনে এসব পুষ্টি উপাদানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুল ভিটামিন ‘সি’-তে ভরপুর। খাদ্যোপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম কুলে যেখানে ৫১ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ থাকে, সেখানে সমপরিমাণ আপেলে ৪, আঙ্গুরে ২৯, কমলালেবুতে ৪০, জলপাইতে ৩৯ ও সফেদায় ৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। ভিটামিন ‘সি’ আমাদের দাঁত, মাড়ি ও পেশী মজবুত করে। তাছাড়া ভিটামিন ‘সি’ সর্দি-কাশি ও ঠান্ডার হাত থেকে রক্ষা করে এবং দেহে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়ায়। শরীরে ভিটামিন ‘সি’-এর অভাব হলে স্কার্ভি নামক এক প্রকার রোগ হয়। এ রোগে দাঁতের মাড়ি ফুলে যায়, মাড়ি থেকে রক্ত ও পুঁজ পড়ে এবং অকালে দাঁত পড়ে যায়। স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধে ভিটামিন ‘সি’ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ পরিবার ভিটামিন ‘সি’ – এর অভাবে ভুগছে।
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, একজন পূর্ণ বয়ষ্ক (পুরুষ ও মহিলা) লোকের জন্য প্রতিদিন ৩০ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ প্রয়োজন হয়। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে ও মেয়েদের দৈনিক ২০ মিলিগ্রাম এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের জন্য দৈনিক ৫০ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ গ্রহণ করা দরকার । তাই দেহের ভিটামিন ‘সি’ এর চাহিদা পূরণের জন্য কুল এবং অন্যান্য ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফল আমাদের বেশি করে খাওয়া উচিত।
কুলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। দেহের হাড় ও দাঁত গঠনের জন্য প্রচুর ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। গর্ভবতী মহিলারা যদি ক্যালসিয়ামের অভাবে ভোগেন তাহলে এর প্রভাব শিশুদের উপর দেখা দেয়। যেমনঃ ক্যালসিয়ামের অভাবে শিশুদের হাড়ের কাঠামো দুর্বল, ছোট ও বাকা হয় এবং দাঁত দেরীতে উঠে ও দাঁত হয় অপুষ্ট। তাছাড়া শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানের সময় প্রসূতি মায়ের খাবারে যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকা আবশ্যক। কাজেই শিশু ও মহিলাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য কুল অত্যন্ত উপকারী ফল।
কুল প্রধানত তাজা বা টাটকা অবস্থায় সরাসরি খাওয়া হয় বলে এতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানসমূহ আমাদের দেহের কাজে বেশি লাগে। কুল খেতে টক-মিষ্টি ধরণের, কিন্তু সুস্বাদু। লবণ-মরিচ মাখিয়ে কুলের ভর্তা খেতে খুব ভাল লাগে। শুকনো বা আচার করে ফল সংরক্ষণ করা হয়। কুলের ফল দিয়ে মুখরোচক চাটনি ও ক্যান্ডি তৈরি হয়। ইদানিংকালে বিভিন্ন দেশে কুলের শরবত ও অন্যান্য ফলের সাথে মিশিয়ে জেলীও তৈরি হচ্ছে।
কথায় বলে, ‘ফলই বল’ অর্থাৎ ফল থেকে শরীরে শক্তি হয়। বস্তুতঃ দেহের পুষ্টি সাধন, বৃদ্ধি এবং নানাবিধ রোগের হাত থেকে দেহকে রক্ষার জন্য সস্তা দামের পুষ্টি সমৃদ্ধ দেশীয় ফলমূলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শাক-সবজির ন্যায় ফলমূলকেও ‘রোগ প্রতিরোধক’ খাবার বলা হয়। তবে তুলনামূলকভাবে ফলের মধ্যে যে সব পুষ্টি উপাদান বিশেষ করে ভিটামিন ও খনিজ লবণ থাকে তা আমাদের দেহের কাজে লাগে বেশি। এর কারণ হচ্ছে শাক-সবজি রান্নার জন্য কাটা ও ধোয়ার সময় অনেক পুষ্টি উপাদানের অপচয় হয়। তাছাড়া রান্নার সময় আগুনের তাপে শাক-সবজির কোন কোন ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়। যত বেশিক্ষণ ধরে রান্না করা হয়, ততবেশি পুষ্টিগুণ বিশেষ করে ভিটামিন বি-১ (থায়ামিন) এবং ভিটামিন ‘সি’ নষ্ট হয়ে যায়। ফলমূল রান্না করে খেতে হয় না, তাজা বা টাটকা অবস্থায় সরাসরি খাওয়া হয় বলে ফলের পুষ্টিগুণ এভাবে নষ্ট হয় না। তাই একটা কুল কিংবা অন্যান্য ফলে যতটুকু পুষ্টি উপাদান থাকে, তার প্রায়ই সবটুকুই আমাদের দেহের কাজে লাগে। সুতরাং দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য মৌসুমের সময় আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় সস্তা দামের পুষ্টিকর দেশীয় ফল কুল ও অন্যান্য ফলমূল থাকা একান্ত প্রয়োজন। লেখক: উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপজেলা কৃষি অফিস, তেরখাদা, খুলনা।