পাইকগাছায় পরচুলা তৈরীর কারখানা স্থাপিত, কর্মসংস্থান ও সাবলম্বী হচ্ছে নারীরা


প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৬, ২০১৯ ||

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): খুলনার পাইকগাছায় কিউট হেয়ার কোম্পানী লিঃ নামে পরচুলা তৈরীর কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে চুল ক্রয়ের হাটবাজার গড়ে উঠলেও এটাই পরচুলা তৈরীর প্রথম কারখানা বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পরচুলা তৈরীর কারখানায় স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থান হচ্ছে এবং তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে।
পরচুলা বা নকল চুল এক ধরনের কৃত্রিম মাথার আবারণ বিশেষ, যা মানুষের চুল, পশুর চুল বা কৃত্রিম তন্তু দ্বারা তৈরী হয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় বড় উৎসব বা অভিনয়ের সময় পরিধান করা হয়। যেসকল লোকের মাথায় চুল থাকে না তারা পরচুলা ব্যবহার করে। প্রাচীন মিশরেও পরচুলার ব্যবহার ছিল। রোদের তাপ থেকে রক্ষা পেতে তারা পরচুলা পরতো।
জানাগেছে, পাইকগাছার চেঁচুয়া গ্রামের আকবর আলীর পুত্র মোঃ শাহীন শেখ ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করাকালীন ঢাকার উত্তরা কিউট হেয়ার নামে একটি চুল তৈরীর কারখানার এক কর্মকর্তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। এ সুবাদে শাহীন পরচুলা তৈরীর কাজ করার সুযোগ পান। এ কাজের জন্য শাহীনের স্ত্রী মঞ্জিলা বেগম ৬ মাসের পরচুলা তৈরীর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর তারা বাড়ি এসে ৮ মাস আগে পাইকগাছা বোয়ালিয়ার মোড়ে ঘরভাড়া নিয়ে কিউট হেয়ার কোঃ লিঃ নামে পরচুলা তৈরীর কারখানার কাজ শুরু করেন। পরচুলা তৈরীর চুল, সুতা, নেট, সুচসহ বিভিন্ন আনুসাঙ্গাকি সরঞ্জাম ঢাকা থেকে আনা হয়। এখানে পরচুলা তৈরীর পরে এগুলি আবার ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকায় যাওয়ার পর এসব পরচুলা ফিনিসিং করা হয়। মোঃ শাহীন শেখ কারখানার পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন ও তার স্ত্রী মনজিলা বেগম ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
কারখানায় পরচুলা তৈরীতে বর্তমানে ৩২ জন নারী কাজ করছেন। এরমধ্যে গৃহবধুসহ স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। কারখানায় ১১টি টেবিল বসানো হয়েছে। একটি টেবিলে ৪ জন করে কাজ করছেন। প্রতি টেবিলে ৪টি করে মাথার খুলির মত গোলাকৃতির বল স্টান্ডে বসানো রয়েছে। এই বলের উপর নেট বসিয়ে সুচ দিয়ে সেলাই করে চুল বসানো হচ্ছে। দক্ষ কারিগরদের একটি পরচুলা তৈরী করতে ৪ দিন সময় লাগে। নতুনদের ১টি পরচুলা তৈরি করতে ১০/১২ দিন সময় লাগে। পরচুলা তৈরীর কাজে সার্বক্ষণিক তদারকি ও নতুনদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঞ্জিলা বেগম। কারখানার কারিগররা কাজে যোগদান করলে প্রথম মাস থেকে ২৫০০ টাকা বেতন পাচ্ছেন। প্রশিক্ষণ শেষে প্রতি মাসে কাজের উপর বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারখানায় চুল বুনে পরচুলা তৈরী করছেন তোকিয়া গ্রামের হালিমা, তিনি ৬ মাস কাজ করছেন কারখানায়, এখন তিনি ৪ হাজার টাকা বেতন পান, ফসিয়ার রহমান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রী গোপালপুর গ্রামের সুবর্ণা দাশ কাজ করছেন ৫ মাস, তিনি মাসে বেতন পাচ্ছেন ৩ হাজার ৫ শত টাকা, মঠবাটী মাদ্রাসার সুমাইয়া আক্তার ঋতু কাজ করছেন ৫ মাস। তিনি বেতন পাচ্ছেন ৩ হাজার ৫শত টাকা। তোকিয়া গ্রামের মাদ্রাসার ছাত্রী ইরানী কাজ করছেন ৪ মাস, তিনি বেতন পাচ্ছেন ৩ হাজার টাকা, চেঁচুয়া গ্রামের আরিফা নতুন কাজে যোগদান করেছেন মাস শেষে তিনি ২ হাজার ৫ শত টাকা বেতন পাবেন। কারখানার কারিগর শিক্ষার্থী সুবর্ণা দাশ জানান, তাদের পড়াশুনা ও কলেজের যাওয়ার জন্য কারখানা থেকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার পাশাপাশি কারখানায় কাজ করে লেখাপড়ার খরচ চালিয়েও পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সিনেমা, নাটকে পরচুলার ব্যবহার হয় বেশি। নিয়মিত ব্যবহারের বাহিরে বিশ্বকাপের মত বড় বড় ক্রিকেট, ফুটবল খেলার আয়োজন হয় তখন পরচুলার চাহিদা বেড়ে যায়। দর্শকরা নানা সাজগোজ করে মাঠে উপস্থিত হন। সেসব সাজসজ্জার উপকরণ হিসেবে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে নানা রংয়ের পরচুলার ব্যবহার করেন বেশি।
খোজ নিয়ে জানাগেছে, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, কোরিয়া, জাপান, ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কিছু দেশে এ ধরনের পণ্য তৈরী হয়। যা পরে আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হয়। বাংলাদেশে কাঁচামাল হিসেবে সিনথেটিকের ব্যবহার বেশি হয়। চীন, ভারত, জাপান, কোরিয়া থেকেই সর্বাধিক কাঁচামাল আমদানি করা হয় বলে জানাগেছে।
বাংলাদেশে ২০০০ সালের ১ম দিকে বিদেশিরা চুল কেনা শুরু করে। বিভিন্ন জেলায় চুল ক্রয়ের হাট বাজার গড়ে উঠেছে। চুলের প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। ইপিজেড এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ বা বেপজা সূত্রে জানাগেছে ২০১০ সাল থেকে এসব প্রতিষ্ঠান এদেশের উৎপাদন ও রপ্তানী কার্যক্রম শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের চুল প্রস্তুত ও রপ্তানী করে। পিচ হিসেবে চুল রপ্তানী করা হয়। চুল রপ্তানী করে কোটি কোটি টাকা আয় হচ্ছে। চুল রপ্তানী করে ২০১৩-১৪ সালে বাংলাদেশ ১ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার ডলার আয় করেছে।
সৌন্দর্য বাড়ানো কিংবা চেহারার পরিবর্তন আনার জন্য ফ্যাশান হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরচুলার বেশ প্রচলন রয়েছে। অস্থায়ীভাবে চেহারার বিভিন্ন লুক আনার জন্য নারী-পুরুষ অনেকেই কিনছেন পরচুলা। এসব পরচুলা তৈরী হয় কৃত্রিম তন্তু দিয়ে। তবে ভালমানের পরচুলা তৈরী হয় মানুষের মাথার চুল দিয়ে। চুল এখন আর খেলনা নয়। কালের বিবর্তনে মাথার আচড়ানোর পর ফেলে দেওয়া চুল প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। মিল্প পন্যের উপকরণ হিসেবে হচ্ছে রপ্তানীও। গড়ে উঠেছে চুল প্রস্তুতের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা।
পরচুলা তৈরী একটি সম্ভাবনাময় খাত। এতে যুক্ত হয়ে গ্রামীন জনগোষ্ঠির জীবনমানের উন্নতি হচ্ছে। নারীদের কর্মসংস্থান ও তাদের আর্থিক উন্নতি হচ্ছে। এ বিষয়ে কিউট হেয়ার কোঃ লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঞ্জিলা বেগম জানান সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা পেলে পরচুলা তৈরীর প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিকভাবে আরো দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।