দৈনিক পত্রদূতের রজত জয়ন্তী


প্রকাশিত : জানুয়ারি ২২, ২০১৯ ||

এসএম শহীদুল ইসলাম
২৬ বছরে পা রাখলো কোটি পাঠকের প্রাণের পত্রিকা ‘দৈনিক পত্রদূত’। আজ ২৩ জানুয়ারি দৈনিক পত্রদূত’র ২৬তম জন্মদিন। দৈনিক পত্রদূত আজ এগিয়ে চলেছে আগামীর স্বপ্নালোকিত পথে আলোর মিছিল জ্বেলে। রজত জয়ন্তীর এই শুভ লগ্নে সকল পাঠক, লেখক, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, এজেন্ট, বিক্রয়কর্মী, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি হৃদয়ের গহীন থেকে উৎসারিত একরাশ শুভেচ্ছা। দৈনিক পত্রদূত ও পত্রদূত অনলাইন আজ ডানা মেলেছে বিশ্ব দরবারে। দেশে তো বটেই, বিদেশেও বাংলা ভাষীদের নিকট পত্রিকাটি পছন্দের তালিকায় স্থান পেয়েছে। প্রবাসী ভাই ও বোনেরা পত্রিকাটির পাতায় পাতায় খুঁজে নেন এলাকার খবর। পাঠকের উৎসাহ প্রেরণা আর ভালবাসায় দুই যুগ অতিক্রান্ত করেছে পত্রদূত। সংবাদের শেকড়ের রস নিয়ে বেড়ে উঠেছে পত্রদূত। মেলেছে শাখা প্রশাখা। খবরের পাশাপাশি খেলাধুলা, শিক্ষা, সাহিত্য, কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি, ধর্ম, যাতায়াত ও যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে নিরন্তর সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে পত্রদূত। গণতন্ত্রের বিকাশে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাদীপ্ত সংবাদ প্রকাশে কোন আপোষ করেনি পত্রদূত। নারীর ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা রক্ষায় সর্বদা অবিচল থেকে অন্যায় ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বাংলা প্রমিত বানান রীতি অনুসরণ করে প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে নানা খবর। দৈনিক পত্রদূত জন্মলগ্ন থেকেই জনতার কন্ঠকে বেঁধেছে সুরের বাঁধনে। সমস্যা ও সম্ভাবনাকে কখনোই এড়িয়ে যায়নি। উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সাক্ষী হয়েছে বারংবার। পাঠকের পরামর্শ ও চাহিদাকেও গুরুত্ব দিয়েছে পত্রদূত। যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। যে কারণে পাঠকের মননে আপন মহিমায় পত্রদূত পৌছে গেছে শ্রেষ্ঠতম স্থানে।
অবহেলিত সাতক্ষীরার শিল্প সাহিত্য ব্যবসা বানিজ্যসহ সার্বিক উন্নয়নের সুমহান লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালের এই দিনে আধুনিক সাতক্ষীরার স্বপ্নদ্রষ্টা, ভোমরা স্থল বন্দরের প্রতিষ্ঠাতা, চেম্বার অব কমার্সের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি, সাবেক এমএলএ, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, কৃষক দরদী, ভূমিদস্যুদের মূর্তিমান আতংক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক, নির্যাতিত- নিপীড়িত মানুষের পক্ষে প্রতিবাদী কণ্ঠ, অন্যায়-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন নেতা, চিন্তা-চেতনা ও মননশীলতায় সর্বদা সৃষ্টিশীল এক মহান ব্যক্তি শহীদ স.ম. আলাউদ্দিন প্রতিষ্ঠা করেন দৈনিক পত্রদূত। প্রতিষ্ঠালগ্নে তিনি ঘোষণা করেন দৈনিক পত্রদূত হবে গণমানুষের পত্রিকা। ১৯৯৪ সালের ২৩ জানুয়ারি দৈনিক পত্রদূতের প্রকাশনার যাত্রা শুরুর সময় স. ম. আলাউদ্দিনের অঙ্গীকার ছিল স্বাধীন সাংবাদিকতা ও বাক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা। ইতিহাস ঐতিহ্যের লীলাভূমি সাতক্ষীরার শিক্ষা সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্য, সমস্যা, সম্ভাবনাকে সমাজের সকল স্তরে ছড়িয়ে দেয়ার মধ্যদিয়ে একটি অসা¤প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণ করা। নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ পত্রিকায় পাতায় প্রকাশ করে তাদের শক্তি ও সাহস দেয়া। বস্তুনিষ্ঠ সৎ সাংবাদিকতার আদর্শকে লালন করে গণতন্ত্রের বিকাশের লক্ষ্যে চিরন্তন সংগ্রাম করার অঙ্গীকার করেছিলেন স. ম. আলাউদ্দিন। ২০০৩ সাল থেকে ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ১৬টি বছর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে মননশীলতা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের বারবার নির্বাচিত সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ। বর্তমানে তিনি উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে নিবেদিত প্রাণ। ২০১৮ সালের ২৪জানুয়ারি থেকে পত্রদূতের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন শহীদ স. ম. আলাউদ্দীন তনয়া লায়লা পারভীন সেঁজুতি। তার এই দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরার নারী সাংবাদিকতাকে আরও একধাপ উঁচু মাত্রায় পৌছে দিয়েছেন। নারীর মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষায় আপোষহীন নেতৃত্ব দিয়ে জ্বেলেছেন আশার আলো। ২০১৮ সাল থেকে দৈনিক পত্রদূতের ‘সাহিত্য দূত’ নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এতে করে জেলার নবীন প্রবীন কবি সাহিত্যিকদের নব নব লেখায় সমৃদ্ধ হচ্ছে পত্রদূত। পত্রদূতের সাহিত্য সম্পাদক গাজী শাহজাহানের নিরলস প্রচেষ্টায় একঝাক দেশি বিদেশি কবি সাহিত্যিক আজ পত্রদূতের দক্ষ কলম সৈনিক। এখানেই শেষ নয়, পত্রদূত সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠা করে জেলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে পত্রদূত।
স. ম. আলাউদ্দিন আজ আর আমাদের মাঝে নেই। আমাদের ছেড়ে তিনি চলে গেছেন না ফেরার জগতে। ১৯৯৬ সালের ১৯জুন রাত ১০টা ২৩ মিনিটে ঘাতকের গুলিতে নিজ পত্রিকা অফিসে কর্মরত অবস্থায় তিনি শহীদ হন। তাঁর মৃত্যুর পর ঘাতকেরা বারবার দৈনিক পত্রদূত’র পথচলায় বাঁধা দিয়েছে। দৈনিক পত্রদূত’র লক্ষ লক্ষ ভক্ত পাঠক ষড়যন্ত্রকারীদের বাঁধাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে নিয়েছেন। কোনো বাঁধাই পত্রদূত’র অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি। তাই তো পত্রদূত আজ লক্ষ পাঠকের প্রাণের স্পন্দন। অপ্রতিরোধ্য তো বটেই।
দৈনিক পত্রদূত প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে লেটার প্রিন্টে ট্যাবলয়েট আকারে প্রকাশ হতো। পত্রিকার দাম তখন ছিলো এক টাকা। স. ম. আলাউদ্দিন শহীদ হবার পর ১৯৯৮ সালে সাতক্ষীরায় ভূমিহীন আন্দোলন শুরু হয়। সে আন্দোলনে ভুমিহীন নেত্রী জাহেদা নিহত হন। ফলে আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে সাতক্ষীরার জনপদ। দৈনিক পত্রদূত ভুমিহীনদের সেই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে পাশে দাঁড়িয়ে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছে। শুধু তাই নয়, অবহেলিত সাতক্ষীরার সমস্যা ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে করেছে ত্বরান্বিত। ন্যায় ভিত্তিক আন্দোলনে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে পত্রদূত সর্বদা সামনের সারিতেই অবস্থান নিয়েছে। ২০০৩ সাল থেকে দৈনিক পত্রদূত কম্পিউটার কম্পোজ আকারে প্রকাশ হয়। কাগজ, কালি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এক টাকার পরিবর্তে পত্রিকাটির মূল্য নির্ধারণ হয় দুই টাকা। আন্তর্জাতিক, জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের সব শ্রেণির মানুষের খবর থাকে পত্রদূতে। তবে স্থানীয় সংবাদের প্রতি বরাবরই পত্রদূত বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। দৈনিক পত্রদূত শুধু কাগুজে প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০১০ সাল থেকে দৈনিক পত্রদূত অনলাইন ভার্সনে প্রকাশ হচ্ছে। ২০১৫ সাল থেকে দৈনিক পত্রদূত ২৪ঘন্টা সংবাদ আপলোড করছে। এতে যখনই সংবাদ তখনই জানতে পারছেন পত্রদূত’র অসংখ্য অনলাইন পাঠক। দেশের বাইরে বিদেশেও রয়েছে পত্রদূত’র অসংখ্য পাঠক। তাদের সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শ পত্রদূত’র লেখনিকে করেছে আরো সমৃদ্ধ ও শাণিত। এছাড়া পত্রদূত’র একঝাক নবীন-প্রবীন সাংবাদিকের নিরন্তর প্রচেষ্টায় কোটি পাঠকের হৃদয় ছুঁয়েছে পত্রদূত। কাকডাকা ভোরে পত্রদূত পৌছে যাচ্ছে গ্রাম-গ্রামান্তরে। গ্রামের কৃষক শ্রমিক থেকে শুরু করে সকল শ্রেণির মানুষ পত্রদূতের পাঠক। একদিন কোন কারণে দেরিতে পত্রিকা পৌছালে সেদিন বুঝতে পারি পাঠকের ভালবাসার টান। আবার কোন কারণে পত্রদূত বানান ও তারিখ ভুল করলেও বুঝতে পারি কোথায় ভুল হয়েছে। পাঠকই ভালবেসে ভুল ধরিয়ে দিয়ে সংশোধনের পরামর্শ দেন। এতে পত্রদূতের শ্রীবৃদ্ধি তো হয়েছে সাথে সাথে সাংবাদিকতার ভিতও হয়েছে মজবুত।
কোনো দৈনিক পত্রিকার ২৪টি বছর টিকে থাকা শুধু নয়; অপ্রতিরোধ্য থাকা খুব সহজ কথা নয়। ২৪বছর অল্প সময় নয়। দৈনিক পত্রদূত ২৪ পার করে ২৫ এ পড়েছে। তার জন্য পত্রিকার কর্ণধার ও তাঁর সহকর্মীদেরই শুধু অভিনন্দন প্রাপ্য নয়, তার পাঠকদেরও ধন্যবাদ প্রাপ্য। সুযোগ্য ব্যবস্থাপনা ও সম্পাদনার সঙ্গে পাঠকের অকুণ্ঠ সমর্থন পত্রিকার যাত্রাকে করেছে অপ্রতিরোধ্য।
২৪বছরে দেশের বহু বিশিষ্ট ও খ্যাতিমান ব্যক্তি দৈনিক পত্রদূতে লেখালেখি করেছেন, এখনো করছেন। একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকের পাঠকশ্রেণি বিচিত্র। তাদের পছন্দের পত্রিকার কাছে বিচিত্র তাদের প্রত্যাশা। সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তিও কাগজ পড়েন আবার কুঁড়েঘরে বাস করা অল্প শিক্ষিত গরিব মানুষটিও পড়েন। বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী সবাই পড়েন পত্রদূত। সবাই চায় তাঁর স¤প্রদায়ের, তাঁর এলাকার মানুষের সুখ-দু:খের কথা বেশি মানুষ জানুক। এমন পাঠকও আছেন যাঁরা শুধু পড়েন না, পড়ে বিষয়বস্তু মনে গেঁথে রাখেন। দৈনিক পত্রদূত’র কিছু শিশু-কিশোর পাঠকও রয়েছে। পত্রিকার মধ্যে তারা দৈনিক পত্রদূত নিয়মিত পড়ে; অন্য দু-একটি কাগজও। কোন লেখক কী কী লেখেন, তা তাদের অনেকটা মুখস্থ। সাহিত্যপাতা হোক, কৃষিপাতা হোক আর খেলার খবর হোক; খুঁটিয়ে পড়ে। শুধু পড়েই না, পড়ে তা নিয়ে আলোচনা করে। শহরের ছেলেমেয়ের মত অনেক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হলেও এদিক থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবহেলিত ছেলেমেয়েরা বরং ভাগ্যবান। তাদের চিন্তা করার অবকাশ আছে। গ্রামের পাঠকরা পত্রদূত পড়ে প্রতিনিয়ত তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তাঁদের সুখ দু:খের কথা বলেন। তাঁদের সমস্যা সম্ভাবনার কথা বলেন।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডা এবং এদিকে মালয়েশিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়ায়ও দৈনিক পত্রদূত’র পাঠক রয়েছে। তারা পত্রদূত’র অনলাইন পোর্টালে খবর পড়ে অনুভূতিও প্রকাশ করতে গিয়ে কেউ কেউ বলেন, “যখন পত্রদূত পড়ি তখন আমার মায়ের মুখ দেখি”। কেউ বলেন, জন্মভূমির মুখ দেখি। ওসব দেশের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা ও গবেষণা করছেন সাতক্ষীরা বহু মানুষ। হঠাৎ হঠাৎ কোনো দিন খুব ভোরে অথবা রাতে ফোন আসে। দৈনিক পত্রদূতে প্রকাশিত কোনো লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে তাঁরা কথা বলেন। সমর্থন করে হোক বা ভিন্নমত প্রকাশ করে হোক তাঁরা দীর্ঘ আলোচনা করেন। প্রবাসীরা এলাকার সমস্যা নিয়ে একটু বেশিই ভাবেন। তাঁরা দেখতে চান দেশের বাস্তব অবস্থার বস্তুনিষ্ঠ চিত্র। সেটা তাঁরা সম্ভবত পত্রদূত থেকে পান।
গত ২৪ বছরে সাতক্ষীরা তথা দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন ঘটেছে। অভাবিত উন্নতি হয়েছে ক্ষেত্রবিশেষে। অন্যদিকে অবক্ষয়ও দেখা দিয়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। গত ২৪ বছরের সাতক্ষীরাসহ দেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা, বাণিজ্য প্রভৃতি বিষয়ে যখন কেউ গবেষণা করবেন, পত্রদূত হবে তাঁদের জন্য তথ্য প্রাপ্তির সবচেয়ে অন্যতম সহায়ক। মোটের ওপর সব ধরণের তথ্য উপাত্ত এখানে পাওয়া সম্ভব।
দৈনিক পত্রদূতে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রভৃতি থেকে পাঠক খুব সহজেই বুঝতে পারেন এর নৈতিক অবস্থান কী। এটি নিছক কোনো বাণিজ্যিক খবরের কাগজ নয়। পাঠক পড়া মাত্রই বুঝতে পারেন রাষ্ট্রের যে চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি দৈনিক পত্রদূত’র অঙ্গীকার অবিচল এবং এগুলোর সঙ্গে আপোষও করে না। সামাজিক প্রগতির পথে প্রতিবন্ধকতাগুলোকে প্রতিহত করার সাহস প্রদর্শনে পিছপা হয়নি দৈনিক পত্রদূত।
নারীর প্রশ্নে দৈনিক পত্রদূত আপোষহীন। নারীর সমস্যা শনাক্ত করায় ক্লান্তিহীন। নারীর অগ্রযাত্রার পথে যেসব বাঁধা, তা অব্যাহত আলোচনায় আসে। বাল্যবিবাহ-যৌতুকসহ নারীর বিকাশ বিঘ্নিত করে যেসব শত্রু, তাকে প্রতিহত করার পরামর্শ থাকে। যেসব ক্ষেত্রে নারী তাঁর মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর এরই মধ্যে রেখেছেন, যাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাঁদের সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যেন অন্য মেয়েরা উদ্বুদ্ধ হন।
নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে পত্রদূত’র ভূমিকা অনেকটাই জিহাদি। কোনো আপোষ নেই, তা যত বড় ক্ষমতাধরই হোক। এসিডদগ্ধ হোন বা যেকোনোভাবে নির্যাতিত হোন, অসহায় নারীর পাশে পত্রদূত’র অবস্থান অনড়। ফলে মফস্বলের মেয়েদের মধ্যেও দৈনিক পত্রদূত অতি জনপ্রিয়।
একটি উন্নয়নশীল দেশে মানুষের হৃদয়ের কাছে পৌঁছাতে হলে সাধারণ মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমাদের সমাজে মানুষ নিপীড়িত হয় প্রতিমুহূর্তে। প্রশাসন থেকে অন্যায়-অবিচারের কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না। সামাজিকভাবেও দুর্বলের পাশে বিশেষ কেউ দাঁড়ানোর ঝুঁকি নেয় না, বিশেষ করে যাদের দাঁড়ানো উচিত এবং যাদের সামর্থ্য আছে। রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ মানুষের দু:খ-দুর্দশার মূল্য সামান্যই। এ পরিস্থিতিতে দুর্বলের মধ্যে সাহসের সঞ্চার করতে পারে একটি প্রভাবশালী পত্রিকা। দৈনিক পত্রদূত বিপদের ঝুঁকি নিয়েও দুর্বলের পাশে দাঁড়ায়। অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে। ২৪বছরে বহু ব্যাপারে দেখা গেছে সবলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দুর্বলকে সমর্থন দিয়েছে। অসহায় ও দুর্বলকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দৈনিক পত্রদূত অবস্থান শক্ত।
শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে দৈনিক পত্রদূত’র ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নে দৈনিক পত্রদূত আপস না করার খেসারত বারবার দিয়েছে। ২০০৫ সালে দৈনিক পত্রদূত’র কণ্ঠকে রুদ্ধ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল তৎকালীন প্রশাসন। কিন্তু সচেতন সাতক্ষীরাবাসি প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পত্রদূতকে এগিয়ে নিয়েছিলেন এক উঁচু মাত্রায়।
আমাদের সমাজে নানা দুর্বলতা রয়েছে। নিষ্ঠার অভাব প্রকট। তার ভেতরেও বহু মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। বহু মানুষ জনহিতকর কাজ করছেন। তাঁদের অনেকেই প্রচারবিমুখ। তাঁদের কাজের কথা দেশবাসি জানেন না। সেসব কৃতী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে সমাজ ও জাতির কাছে পরিচয় করিয়ে দেয় দৈনিক পত্রদূত। বিশেষ করে যেসব তরুণ-তরুণী অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ও সৃষ্টিশীল কর্মে সফলতা দেখিয়েছেন, তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় দৈনিক পত্রদূত অতি উদার।
সব ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদ আজ সারা পৃথিবীতেই প্রবল। বাংলাদেশে ধর্মান্ধতা বহুকাল থেকেই রয়েছে। তার মধ্যে যোগ হয়েছে রাজনীতিতে ধর্মীয় মৌলবাদ। মৌলবাদকে প্রতিহত না করে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ অসম্ভব। দৈনিক পত্রদূত ধর্মীয় মূল্যবোধকে শ্রদ্ধায় রেখে মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরোধিতা করে। এখানে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ খ্রিষ্টান প্রভৃতি ধর্মীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এক অসা¤প্রদায়িক উদার সমাজ। সেই ধারাটিরই লালন করে দৈনিক পত্রদূত।
একটি বস্তুনিষ্ঠ কাগজের পক্ষে সবাইকে সন্তুষ্ট করা কঠিন। ২৪বছরে বহুবার দৈনিক পত্রদূত অনেকের অসন্তুষ্টির কারণ ঘটিয়েছে। কিন্তু পাঠকের আনুকূল্য ও সমর্থনের ঘাটতি ঘটেনি।
এ জগতে কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে নয়। পথ চলতে গিয়ে কখনো দৈনিক পত্রদূত ভুলও করে থাকবে, কিন্তু ভুল স্বীকার করে সঠিক পথটি বেছে নিতেও মুহূর্ত দেরি করেনি। সে জন্যই তার অগ্রযাত্রা রয়েছে অগ্রতিরোধ্য।
সব বাঁধা উপেক্ষা করে সকলের ভালোবাসায় এক আলোকিত সমাজ বিনির্মাণে দৈনিক পত্রদূত’র ভূমিকা আরও আপোষহীন হবে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে এটাই প্রত্যাশা। লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক পত্রদূত