২৪ বছর পর ফের ২৩ জানুয়ারি


প্রকাশিত : জানুয়ারি ২২, ২০১৯ ||

সুভাষ চৌধুরী
দেশ জুড়ে সরকার বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায়। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ১৪৭ সংসদ সদস্যের পদত্যাগ তখন ক্ষমতাসীনদের জন্য এক বড় ধাক্কা। সরকারি দল চায় উপ নির্বাচন। আর বিরোধী দল চায় তত্ত¡াবধায়ক সরকার। সালটা ১৯৯৫। চারদিকে মিছিল মিটিং সমাবেশ। কখনও হরতাল, কখনও অবরোধ। পেট্রল পাম্প বন্ধ। জ্বালানি তেলের সংকটে যানবাহন মুখ থুবড়ে থাকছে রাস্তাঘাটে। এমনই এক সময়ে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ। কম কথা নয়। ডিক্লারেশন পেয়ে প্রথম সংখ্যা কাগজ বের করতেই হবে। অভিজ্ঞতা নেই। অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো এমন সুযোগও কম। তবু গোঁজায় মিল করতে হবে আরকি। যার কাছে যাই সেই বলে ঠিক আছে আমি আছি সাহায্য করবো। কি ছাপা হবে তা জানিনা। কোথায় ছাপা হবে তাও তো জানিনা। সাতক্ষীরায় তখন যে প্রেসগুলি ছিল তাদের বড় কাগজ ছাপবার সুবিধা ছিল না। আর আমি এ সব নিয়ে ছিলাম বিপদে।
আর পত্রিকাটির মালিক সম্পাদক ও প্রকাশক আলাউদ্দিন ভাই আমার ওপর ছেড়ে দিয়ে বেশ ছিলেন। তিনি বললেন আপনার কাজে সব সহযোগিতা দেবেন আমার সাত্তার চাচা (প্রয়াত শেখ আবদুস সাত্তার সাংবাদিক দৈনিক পূর্বাঞ্চল)। আর সাত্তার ভাই আমাকে বললেন ‘আপনি সব কিছু রেডি করেন। কাগজ ছাপানোর দায়িত্ব আমার’। মনে হলো মাথার ওপর থেকে বিরাট এক বোঝা নেমে গেল। সাত্তার ভাই বললেন আমার সাথে লিয়াকতের (দৈনিক পূর্বাঞ্চল সম্পাদক, প্রয়াত লিয়াকত আলি) কথা হয়েছে। সমস্যা নেই। তিনিই কাগজ ছেপে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।

 


পত্রিকাটির ডিক্লারেশন পেতে কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি। পত্রিকাটি যাতে ডিক্লারেশন না পায় সে জন্য অনেকের নেপথ্য চেষ্টার কখা আমার জানা আছে। তবু ডিক্লারেশন যখন মিললোই তখন তো কাগজ বের করতেই হবে। তাই সব ঝামেলাকে ধারণ করেই নেমে পড়লাম মাঠে। বেশ কিছু রিপোর্ট তৈরি করলাম নিজে হাতে লিখে। এর আগে আমি লিখিত বাণী নিলাম জেলা প্রশাসক আবদুস সালাম ও পুলিশ সুপার সানাউল হকের কাছ থেকে। জেলা প্রশাসক তার বাণীতে বলেন ‘ছোট্ট একাট জেলা শহর থেকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দৈনিক পত্রদূতের আত্মপ্রকাশ সংবাদপত্র জগতের একটি মাইল ফলক। হাজারো কাগজের ভিড়ে দৈনিক পত্রদূত সাধারণ মানুষের কথা বলবে। তাদের সমস্যা নিরুপন করবে, এই প্রত্যাশা আমার। একজন সৎ সাংবাদিক বস্তুনিষ্ঠতাকে সমুন্নত রাখতে আপোসহীন হবেন। একজন সৎ সাংবাদিকের প্রকৃত অর্থে কোনো বন্ধু থাকে না। আমাদের কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের গ্রামীন মানুষের সমস্যা নিয়ে দৈনিক পত্রদূত সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা কাজ করে যাবেন বলে আমি আশা রাখি। সামাজিক দুর্নীতির কবর রচনায় এ পত্রিকাটি বলিষ্ঠ ভ‚মিকা রাখবে এমন বিশ্বাস আমার রয়েছে। সামাজিক উন্নয়ন ধারায় দৈনিক পত্রদূত সামিল হতে পারবে বলে আশা করি’। পুলিশ সুপার মো. সানাউল হক তার বাণীতে বলেন ‘একটি সুখী সমৃদ্ধিশালী সমাজ গঠনে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে। পুলিশ ও সাংবাদিক একই লক্ষ্যে কাজ করে থাকে। আমি আশা করি দৈনিক পত্রদূত তার সকল সামর্থ দিয়ে জনগনের সেবা করে যাবে। আমি আশা করি দৈনিক পত্রদূত সমাজের সকল মানুষের সুখ দুঃখের কথা বলবে। দৈনিক পত্রদূত সামাজিক দুর্নীতি ও সমস্যা নির্ণয় করবে। দায়িত্বশীলতার পরিচয়কে সমুন্নত রাখতে পত্রিকাটি নিরন্তর কাজ করে যাবে। দেশের অসংখ্য পত্র পত্রিকার মাঝে এ পত্রিকাটি স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে কাজ করে যাবে’। সেদিনের জেলা প্রশাসক আবদুস সালাম এখন অবসর জীবন পার করছেন। আর সেদিনের পুলিশ সুপার সানাউল হক এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার আইজিপি পদ মর্যাদার কো কো অর্ডিনেটর।
আমার স্পষ্ট মনে রয়েছে যে দৈনিক পত্রদূত প্রকাশনার আগে ডিক্লারেশনের জন্য আবেদন করেছিলেন সম্পাদক নিজেই। এরই সাথে আমরা কয়েকটি মিটিং করেছিলাম। ১৯৯২ এর ৭ ডিসেম্বর একটি মিটিং হয়েছিল। ১১ ডিসেম্বর আরও একটি মিটিং হয়েছিল। দুটি মিটিংই হয়েছিল সাতক্ষীরা জেলা শিল্প ও বনিক সমিতির অফিসে (নিউ মার্কেটের দোতলায়। এখন সেটি আধুনিক ভবনের আকাংখায় নিশ্চিহ্ন)। মিটিংয়ে প্রিসাইড করেছিলেন সম আলাউদ্দিন। আমি ছিলাম পরিচালক। মিটিংয়ে পত্রিকাটির পদ পদায়ন করা হয়েছিল। একজন সম্পাদক, একজন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একজন নির্বাহী সম্পাদক, একজন বার্তা সম্পাদক, কয়েকজন স্টাফ রিপোর্টার, পত্রিকার জন্য একজন জেনারেল ম্যানেজার পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
আলাউদ্দিন সাহেব পত্রিকার ডিক্লারেশন চেয়ে প্রথম আবেদন করেন ০৫.০১.১৯৯৩ তারিখে। ১৫.১২ ১৯৯৪ তে ডিক্লারেশন পত্রে স্বাক্ষরও দেন সম আলাউদ্দিন। সম্ভবতঃ এদিনই পাওয়া যায় জেলা প্রশাসকের অনুমতি পত্র। এতে বলা হয় অনুমতি প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে ঘোষণা অনুযায়ী পত্রিকা প্রকাশ না করলে তা বাতিল হয়ে যাবে। এজন্য সম্পাদক সাহেব খুব চাপ দিলেন। তিনি চাপ দিয়ে চলে যেতেন ঢাকা অথবা অন্য কোখাও। কয়েকদিন পর ফিরে এসে খোঁজ নিতেন কাজের কতো দুর। আমি মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে পড়তাম। কারণ কাজের তো কোনো অগ্রগতিই নেই। কিন্তু অনুমতিপত্র যখন হাতে এলো তখন তো আর পিছু টানের সুযোগ নেই। তখন একটাই কাজ, কবে সে মাহেন্দ্রক্ষণ, যেদিন প্রকাশিত হবে দৈনিক পত্রদূত।
সাত্তার ভাইয়ের আশ্বাস ভরসা পেয়ে আমি কাজে হাত দিলাম নতুন প্রেরণায়। দিনক্ষণ কবে তা নিয়ে মতামত নিতে থাকলাম। এ সময় সম্পাদক সাহেব বললেন ‘আমাদের এক কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক আবদুল জলিল সাহেব আসছেন। ওই দিন আমারা পত্রদূতের প্রথম সংখ্যা ছাপা চাই’। সেই দিনটি ছিল ২৩ জানুয়ারি ১৯৯৫। সেটা মাথায় রেখে কাজে আরও মনোযোগী হলাম আমি।
আমি ফার্স্ট রিপোর্ট লিখলাম ‘যাত্রা শুরুর অঙ্গীকার’। এতে লিখলাম ‘একটি জাতির জন্য দায়িত্বশীল সংবাদপত্রের বড়ই প্রয়োজন। কান্ডজ্ঞানহীনভাবে কোনো সংবাদ পরিবেশন একটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি স্বরুপ। আমরা বিশ্বাস করি উস্কানিমূলক কোনো তথ্য প্রকাশ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পর্যায়ে পড়ে না। দৈনিক পত্রদূত তার আদর্শ স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে চায়। আমরা পোষমানা তাবেদার সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করি না। তাবেদার সাংবাদিকতা করে আমরা আমাদের অনুভ‚তিকে ভোঁতা করতে চাই না। আমরা বিশ্বাস করি সংবাদপত্র জনসাধারণকে জাগ্রত রাখার দায়িত্ব পালন করে। কারণ যেখানে ডিকটেটরশীপ সেখানে সাংবাদিকের কলম ভোঁতা। যেখানে ডেমোক্রাসি সেখানে সাংবাদিকের কলমের কালি ফুুরায় না। আমাদের চলার পথে অনেক কন্টক থাকা স্বাভাবিক। তবু এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের। কোথাও বিশ্রামের সুযোগ নেই’। যোগাড় হলো আরও কিছু লেখা। সাংবাদিক অরুন ব্যানার্জি লিখলেন ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সমাজের প্রত্যাশা’। সাংবাদিক কল্যাণ ব্যনার্জি লিখলেন ‘প্রশাসনিক অনুমোদন না পাওয়ায় সাতক্ষীরা জেলা কারাগারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি’। ল্যারি কলিন্স ও ডমিনিক ল্যাপিয়ের লেখা ‘ফ্রীডম এ্যাট মিডনাইট’ (শাসন ও দমনের ভাগ্য নিয়ে জন্ম যে জাতির, লন্ডন, নববর্ষ ১৯৪৭ সাল) বাংলায় ভাষান্তর করে লিখলেন প্রফেসর আবদুল হামিদ। শেখ আবদুস সাত্তার লিখলেন ‘সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন, প্রচারণা তুঙ্গে’। বেশ কিছু বিজ্ঞাপনও নিয়েছিলাম আমরা। পলাশপোল শাপলা প্রিন্টিং প্রেস দৈনিক পত্রদূত প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছিল লিখিতভাবে। কিন্তু তাদের মেশিন সাপোর্ট না করায় শেষ পর্যন্ত সাত্তার ভাইয়ের ভরসায় আমি সব যোগাড় করে নিয়ে এক সাথে চললাম খুলনায়। রাতভর কাগজ প্রকাশনা নিয়ে বেশ আনন্দেই কাটালাম। আমার সাথে ছিলেন শেখ আবদুস সাত্তার ও তালার সাংবাদিক এমএম ফজলুল হক মনি। এ দু’জনই আজ লোকান্তরিত। রাতে দৈনিক পূর্বাঞ্চল সম্পাদক লিয়াকত আলি সাহেব ও তার সহধর্মীনি ডেইলি ট্রিবিউন সম্পাদক ফেরদৌসী আলির সাথে দুই এক দফা দেখা ও কথাও হলো। পূর্বাঞ্চল প্রেস আর খুলনার ময়লাপোতা মোড়ে রাতের গাড়ি চলাচল গুনে গুনে পাহারাও দিলাম। সেখানেই ভাত খেলাম। রাতভর চা খেলাম। আমরা কিন্তু সেই তিনজন।
পরদিন সোমবার কাকডাকা ভোরে দৈনিক পত্রদূতের বান্ডেল বান্ডেল কাগজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা তিনজন। এরপর কাগজের বান্ডেল বিভিন্ন স্থানে নামিয়েও দিলাম আমরা। অবশেষে ফিরলাম সাতক্ষীরায়। অপেক্ষমান হাস্যোজ্জ্বল সম্পাদক সম আলাউদ্দিন কাগজ হাতে তুলে নিয়ে মোটা গলায় বললেন ‘বাহ! চমৎকার’। তিনি বললেন ‘আওয়ামী লীগের একটি সমাবেশ আছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল আসছেন সাতক্ষীরায়। সে রিপোর্টটিও তো দেখছি ছাপা হয়েছে। আমাকে বেশ কিছু কাগজ দিন। ওগুলো নেতাকে দেবো। সাতক্ষীরার নেতাকর্মীরাও দেখবেন’। পত্রদূতের বড় একটি বান্ডেল আলাউদ্দিন সাহেবের মোটর সাইকেলের পেছনের কেরিয়ারে বেঁধে দেওয়া হলো। তিনি চললেন আওয়ামী লীগের সেই মিটিংয়ে।
দিনটি ছিল সোমবার, ২৩ জানুয়ারি, ১৯৯৫ যেদিন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক পত্রদূত।
এই দিনটি পার করা গেল বটে, বাকি দিনগুলিতে কী হবে। বারবার তো আর খুলনায় যেয়ে কাগজ প্রকাশ সম্ভব নয়। তখন কাগজের কলেবর ছোট করে আমরা ট্যাবলয়েড সাইজে নিয়ে এলাম। এরপর পত্রিকাটি প্রকাশনার বিষয় নিয়ে বসলাম জাহান প্রিন্টিং প্রেসের জলিল ভাইয়ের সাথে। জলিল ভাই দায়িত্ব নিলেন পত্রিকাটি নিয়মিত ছেপে দেওয়ার। প্রেস ম্যানেজার নির্মল দা ও মতিয়ার সাহেব বেশ সাহায্য করতেন। কাগজ কেনা না থাকলেও তারা কাগজ দিয়ে হেল্প করতেন। শহিদ আবদুর রাজ্জাক পার্কের প্রধান ফটকের সামনের বাড়ি ছিল দৈনিক পত্রদূত অফিস। আমি রাতে সবগুলি রিপোর্ট প্রস্তুত করে চলে যেতাম জাহান প্রেসে। সেখানে সীসার লেটার প্রিন্ট হতো। আমি বসে থাকতাম। আলাউদ্দিন ভাইও থাকতেন। আমার মনে পড়ে ২৫ শ’ শব্দ হলে চার পাতা পূরণ হতো। এর কম হলে মুশকিল। রাত ২টার দিকে কাগজটি যখন প্রকাশ হতো তখন আমি ধোপাপুকুরপাড়ে বাড়ি ফিরতাম। আমাকে আলাউদ্দিন সাহেব প্রায়ই ওই গভীর রাতে তার সবুজ রংয়ের মোটর সাইকেলে বসিয়ে আমাকে রেখে যেতেন। আর লস্করপাড়ার অন্ধাকারাচ্ছন্ন রাস্তা পেরিয়ে তিনি যখন বাড়ি পৌছাতেন তখন প্রায়ই ভাবী তাকে বকাঝকা করতেন। এ গল্প তার মুখে প্রায়ই শুনতাম। আর হাসতাম। বলতাম আজ থেকে আপনি আর প্রেসে দেরি করবেন না। জবাবে তার কাছ থেকে শুনেছি তাই কি হয়। আপনি বাড়ি যাবেন কিভাবে। তবে আমি যে বাড়ি পৌছে আমার সহধর্মিনীর মুখ থেকে রোজই বকাঝকা শুনতাম তা কিন্তু কোনো দিন বলিনি আলাউদ্দিন সাহেবকে।
প্রকাশক সম্পাদক সম আলাউদ্দিন এখন লোকান্তরিত। আর আজ ২৩ জানুয়ারি ২০১৯। ক্যালেন্ডারের হিসেবে ২৫ বছর। কম কথা নয়। দৈনিক পত্রদূতের পাঠকরাই বিচার করে বলবেন সে দিনের ‘যাত্রা শুরুর অঙ্গীকার’ কতটুকু রক্ষা হয়েছে। পাঠকই বলবেন সেদিন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের বাণীতে যে প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছিল তারও বাস্তবায়নই বা কতটুক্।ু সুভাষ চৌধুরী সাংবাদিক, সাতক্ষীরা, প্রতিষ্ঠাকালিন নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পত্রদূত।



error: Content is protected !!