জৈব সার এবং মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৯ ||

মো. আবদুর রহমান
মাটি একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি পৃথিবীর অধিকাংশ জীবের খাদ্য উৎপাদন এবং বসবাসের মাধ্যম। ফসল উৎপাদনে মাটির উপযুক্ত বিকল্প নেই। কৃষি প্রধান এ বাংলাদেশে প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ খুব একটা বেশি নেই। ফলে এদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষি, যা এ মৃত্তিকা সম্পদের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ভাগ্যের সাথে জড়িত সোনার চেয়ে দামি এ মৃত্তিকা সম্পদ। কিন্তু অত্যন্ত দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, এ মৃত্তিকার পরিবেশ ও মাটির উর্বরতা আজ হুমকির সম্মুখীন। এক সমীক্ষায় জানা গেছে, বাংলাদেশের ৯০ লাখ হেক্টর কৃষি জমির শতকরা ৭৫ ভাগ তার উর্বরতা হারিয়েছে। অধিক মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারই এর প্রধান কারণ বলে উক্ত সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল এর বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গত ঠিক এক দশকে বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমির মাটির উর্বরতার মাত্রা শতকরা ২.৫ থেকে শতকরা ১.৫-এ দাঁড়িয়েছে। এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর আবাদযোগ্য জমির শতকরা অর্ধেকই তার উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়েছে। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি যৌথভাবে এ সমীক্ষা চালায়। দক্ষিণ এশীয় অপরাপর দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জমির উর্বরতা হ্রাস পরিস্থিতি আশংকাজনক। জমিতে অধিক মাত্রায় ও নির্বিচারে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলেই মাটির পরিবেশ ও উর্বরতা শক্তি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। অপরদিকে একই জমিতে এভাবে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাটির অম্লত্ব পরিবর্তিত হয়ে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে ও অনুজীবের কার্যাবলী ব্যাহত হচ্ছে। এতে মাটির উৎপাদনশীলতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
ফসল উৎপাদনের সঙ্গে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদিকা ক্ষমতার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। মাটির উর্বরতা বলতে ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানসমূহ সরবরাহের ক্ষমতাকে বুঝায়। অর্থাৎ মাটিকে তখনই উর্বর বলা হবে যখন তাতে কোন উদ্ভিদের পরিপূর্ণ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সব খাদ্য উপাদান সঠিক পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। অনুর্বর মাটিতে ফসলের ফলন হয় কম, আর উর্বর মাটিতে ফলন হয় আশাব্যঞ্জক। সুতরাং অধিক উৎপাদন পেতে হলে মাটির উর্বরতা শক্তি বজায় রাখতে হবে। আদিকাল থেকেই মানুষ মাটির উর্বরা শক্তি বজায় রাখার প্রয়াস চালিয়ে আসছে। পশু পালন যুগে মানুষ লক্ষ্য করে দেখতে পায়, যে স্থানে পশু মল ত্যাগ করে সেখানে গাছ তর তর করে বড় হয়ে উঠে। এভাবে মানুষ গোবর সার ব্যবহার শিখে। চীনা কৃষি রেকর্ডে দেখা যায় যে, প্রায় চার হাজার বছর আগে চীনারা গাছ ও জীবজন্তুর দেহাবশেষ ও মানুষের মলমূত্র ব্যবহার করতো। আমাদের দেশেও আবহমানকাল থেকে গোবর, খৈল, ছাই এর ব্যবহার চলে আসছে।
বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি থেকে রাসায়নিক সার এদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ইদানিং আমরা রাসায়নিক সারের ওপর এতই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি যে জৈব সারের কথা কেউ কেউ ভুলেই গিয়েছি। অবশ্য এখনও কিছু কিছু চাষি রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহার করছেন। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই সার অসম মাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে। অত্যধিক রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির পরিবেশও দূষিত হচ্ছে। পূর্বে শস্য কাটার পর শস্যের যে অবশিষ্টাংশ জমিতে পড়ে থাকত তা পচে জমিতে জৈব সার সার হিসেবে যোগ হতো। আজকাল তাও আর জমিতে পড়ে থাকে না। কেননা ওগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আজকাল মূল্যবান গোবর সার দিয়ে ঘুটে তৈরি করে রান্নার কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এক তথ্যে জানা যায়, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮০ লাখ টন গোবর সার এবং ২.৩২ কোটি টন বর্জ্য জ্বালানি হিসেবে উনুনে পোড়ানো হয়। এমতাবস্থায় জৈব সারের ব্যবহার ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
জৈব পদার্থ মাটির প্রাণ। মানব দেহে রক্তের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, মাটিতে জৈব পদার্থের গুরুত্বই তেমনি। তাই বিভিন্ন জৈব সার যেমন গোবর, খামারজাত সার, কম্পোষ্ট, বসতবাড়ির আশে-পাশের পচা আবর্জনা সার, খৈল, সবুজ সার, ছাই, খড়-নাড়া, কচুরিপানা, পচা পাতা ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে মাটিকে জৈব পদার্থে সমৃদ্ধ করে উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করা যায়। উদ্ভিদ যে কয়টি খাদ্য উপাদান গ্রহণ করে তার প্রায় সবগুলোই জৈব পদার্থে নিহিত থাকে। সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে সহজলভ্য আকারে রূপান্তরিত হয় এবং গাছ প্রয়োজন অনুসারে গ্রহণ করে থাকে। জৈব সার রাসায়নিক সারের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং জৈব সার ব্যবহার করলে আনুপাতিক হারে রাসায়নিক সারের মাত্রা কমানো যায়। মাটিতে কীটপতঙ্গ ও রাসায়নিক সারের আধিক্যজনিত কোন বিষাক্ততা সৃষ্টি হলে জৈব সার বিষাক্ততা কমাতে সাহায্য করে। তাছাড়া জৈব পদার্থ মাটির অনেক ভৌত ধর্মের উন্নয়ন সাধিত করে। যেমনÑ বেলে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও এঁটেল মাটিকে ঝুরঝুরা করে। ফলে পানি সহজেই নিষ্কাশন হতে পারে। গাছের শিকড় বৃদ্ধি পেতে পারে মাটির উত্তাপ নিয়ন্ত্রণ করে। মাটির রাসায়নিক ধর্মের উন্নয়নেও জৈব পদার্থের গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান ও হরমোন সরবরাহ করে এবং মাটির অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া মাটির জৈবিক ধর্মের উন্নয়নে জৈব পদার্থের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। যেমন মাটির জীবাণুর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও খাদ্য সরবরাহ করে। মাটির এ সব ধর্ম অর্থাৎ ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক ধর্মের উন্নয়ন মানেই মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি সাধন।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠির সীমিত জমি থেকেই খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। কিন্তু মাটি তার উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেললে খাদ্য উৎপাদনে ভাটা পড়বে এবং বর্ধিত খাদ্য উৎপাদনে দারুন সংকট দেখা দিবে। কাজেই এ সমস্যার গুরুত্ব উপলব্ধি করে মাটির পরিবেশ এবং তার উর্বরতা সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য রাসায়নিক সারের ব্যবহার যথাসম্ভব কমিয়ে মাটিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহন করতে হবে। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস রূপসা, খুলনা