কে হচ্ছেন সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ? অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগে অর্ধ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের মিশন


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৯ ||

পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও কিছু সংখ্যক কর্মচারী নিয়োগে অর্ধ কোটি টাকার নিয়োগ বানিজ্যকে সামনে রেখে কে হবেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তা নিয়ে জোর লবিং ও গ্রুপিং শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের জেলা পর্যায়ের দুই নেতা রয়েছে দু’পক্ষে। এতে মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য এমনকি কয়েকজন শিক্ষকও জড়িয়ে পড়েছেন।

সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোস্তফা শামছুজ্জামান গত সোমবার গ্রেপ্তার হলে পরবর্তী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কে হবেন এ নিয়েই শুরু হয়েছে রাজনীতি। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ মাওলানা শামসুর রহমান ২০১৩ সালে অবসরে যান এবং উপাধ্যক্ষ অবসরে যান ২০০৪ সালে। সেখান থেকে অধ্যক্ষের পদটি ৬ বছর এবং উপাধ্যক্ষের পদটি ১৪ বছর শূণ্য রয়েছে। বিভিন্ন কারণে এমনকি উপযুক্ত বা মনপূত? প্রার্থী শূণ্যতায় পদ দুটি শূণ্য রয়েছে। অত্র মাদ্রাসার বোর্ডে লিখিত দায়িত্ব তালিকা অনুযায়ী জানা যায়, অধ্যক্ষ মাওলানা শামসুর রহমান অবসরে যাবার পর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হন যথাক্রমে- মুনছুর রহমান, মুফতি আখতারুজ্জামান, আমির আলী, নূরুল ইসলাম ও মোস্তফা শামছুজ্জামান। মুনছুর আলী অবসরে যাওয়ায় জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মুফতি আখতারুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে আসেন। ২০১৫ সালে একটি নাশকতার মামলায় তিনি আটক হলে দায়িত্বে আসেন আমীর আলী। তিনি অসুস্থ হলে ঐ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলে ভারপ্রাপ্ত হন মুফতি নূরুল ইসলাম। কিছু দিন পর তিনিও দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব আসেন কনিষ্ঠ শিক্ষক মোস্তফা শামছুজ্জামান। তিনি গত সোমবার আটক হলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পদটি শূণ্য রয়েছে।

সাতক্ষীরা আলিয়া মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোস্তফা শামছুজ্জামান আটক হবার পরের দিন কামিল পরীক্ষা চলমান থাকার কারণে জরুরীভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কে হবেন এবং কে প্রয়োজনীয় কাজগপত্রাদিতে স্বাক্ষর করবেন তা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। এ কারণে ঐদিন সকালে মাদ্রাসার ৩জন শিক্ষক প্রতিনিধি জেলা প্রশাসক ও মাদ্রাসার সভাপতির স্মরণাপন্ন হন। মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ শিক্ষক কে? এমন প্রশ্নের জবাবে ৩জন শিক্ষক প্রতিনিধি দু’ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। একজন প্রতিনিধি জানান, জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মুফতি আখতারুজ্জামান। অন্য দু’জন জানান, তার নামে নাশকতার মামলা আছে। অতএব পরের জন মনিরুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোক। এ সময় এক শিক্ষক প্রতিনিধি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কে হবেন- এ সংক্রান্ত কয়েকটি সরকারি চিঠি প্রতিষ্ঠানের সভাপতিকে অবহিত করেন। তিনি সরকারের মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা-পরিচালকের এবং ইসলামি আরবি বিশ^বিদ্যালয়ের তিনটি পত্র উপস্থাপন করেন। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ পত্রটি হচ্ছে ২১-০৫-২০১৮ তারিখের। যার স্বারক নং-৫৭.০০০০.০০৩.০২.০২৩.১৭-৩৫০। এতে বলা হয়েছে- মো. আখতারুজ্জামান (ফকিহ) এর বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা থাকলেও তাকে চাকরি হতে বরখাস্ত করা হয়নি। অধিকন্তু তিনি চাকরিতে বহাল আছেন, এমপিও শীটে তার নাম বিদ্যমান আছে এবং তিনি নিয়মিতভাবে সরকারি অংশের বেতন ভাতাদি প্রাপ্ত হচ্ছেন সেহেতু মাদ্রাসাটির একাডেমিক ও প্রশাসনিক শৃংখলা রক্ষার জন্য সর্বোপরি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইসলামি আরবি বিশ^বিদ্যালয় নির্দেশনা বাস্তবায়নের নিমিত্তে মাদ্রাসাটির জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. আখতারুজ্জামান ফকিহকে অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) এর দায়িত্ব হস্তান্তর প্রয়োজন। এমতাবস্থায় সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ দায়িত্বপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইসলামি আরবি বিশ^বিদ্যালয়ের আদেশ মোতাবেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. আখতারুজ্জামান (ফকিহ)কে অধ্যক্ষ ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আগামী ৩১-০৫-২০১৮ ইং তারিখের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করে এ অধিদপ্তরকে অবহিত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হল। ব্যর্থতায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসার একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের ক্ষমতা হস্তান্তরের সর্বশেষ পত্রটি মোস্তফা শামছুরজ্জামানের হস্তগত হলে তিনি কুটকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর না করে এমনকি মাদ্রাসার সভাপতিকে না জানিয়ে ক্ষমতাসীন দলের পৌর এক নেতার মাধ্যমে গত ৩০ অক্টোবর মুফতি আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করান। এসময় তিনি বলতে থাকেন, ‘আমি কার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করব?’ উল্লেখ্য মোস্তফা শামছুজ্জামান দীর্ঘ ৮মাসেও ক্ষমতা হস্তান্তরের ঐ পত্রটি জেলা প্রশাসক ও মাদ্রাসার সভাপতিকে অবহিত করেননি। এ বিষয়ে মুফতি আখতারুজ্জামানকে মোবাইলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আমার কথা সভাপতি মহোদয়কে অবহিত করেন। আপনাদের সাথে কিছু বলতে চাচ্ছিনা।

এদিকে দীর্ঘ দেড় বছর আগে মাদ্রাসার গভর্নিং বডির মেয়াদ শেষ হলেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ইসলামি আরবি বিশ^বিদ্যালয় ঐ গভর্নিং বডির অনুমোদন দেননি। উল্লেখ্য ইসলামি আরবি বিশ^বিদ্যালয়ের অডিন্যান্স অনুযায়ী অত্র মাদ্রাসার গভর্নিং বডি নির্বাচনে তফশীল ঘোষণা হয়নি। গভর্নিং বডির নির্বাচনে ৭.১-৭২.২ ও ৭.৪ ধারা লঙ্ঘন করায় বিষয়টি তদন্তও হয়েছে। প্রসঙ্গত: অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ঐ গভর্নিং বডির মধ্যে অভিভাবক সদস্য মো. ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে এসটিসি ৪৩/১৭ এবং ৪৪/১৭ সহ কয়েক নাশকতার মামলা রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে রয়েছে কয়েকটি নাশকতার মামলা। শিক্ষক প্রতিনিধি মো. হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে এসটিসি ৪৪৩/১৫ এবং ৪৪৪/১৫ নং মামলা রয়েছে এবং অপর শিক্ষক প্রতিনিধি মো. ইউনুস আলীর বিরুদ্ধে রয়েছে নাশকতার মামলা। তিনি ক্ষমতাসীন দলের লোক হয়েও মাদ্রাসা রাজনীতির কারণে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকাবাসি জানান, আটক ভারপ্রাপ্ত মোস্তফা শামছুজ্জামান ক্ষমতাসীন কিছু ব্যক্তির যোগ সাজসে নাশকতার মামলার আসামীদের নিয়েও গভর্নিং বডি গঠন করেছিলেন। ইতোপূর্বে অনুমোদিত গভর্নিং বডির বিদ্যোৎসাহী সদস্য ছিলেন সদর এমপির নিকটজন মীর মইনুল হক ও সৈয়দ নাজমুল হক বকুল। ওই দু’জনকে বাদ দিয়ে বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা গভর্নিং বডির বিদ্যোৎসাহী সদস্য করা হয়েছে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু সাঈদ ও পৌর কমিশনার শেখ আব্দুস সেলিমকে সঙ্গত কারণেই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা জেলার শীর্ষ নেতাদের সহযোগিতায় কনিষ্ঠতম শিক্ষক মোস্তফা শামছুজ্জামানকে এতদিন ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছিলেন। বর্তমানে তারাই দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মনিরুজ্জামানকে (জেনারেল শিক্ষক) ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার জন্য জোর তদবীর করেছেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের জেলা পর্যায়ে অপর এক নেতা রয়েছেন মুফতি আখতারুজ্জামানের পক্ষে। তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা-পরিচালকের ঐ পত্রকেই জোর দিচ্ছেন। সবচেয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে মুফতি আখতারুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত না হলে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ ঐ আদেশ ঠওঙখঅঞওঙঘ হচ্ছে। আর আখতারুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত হলে নাশকতার মামলার আসামীকে ক্ষমতায় দেয়া হয়েছে এমন একটি চাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ঠদের।

এদিকে সাতক্ষীরা আলিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ না থাকায় যে রাজনীতি শুরু হয়েছে তার প্রতিকার দাবি করেছেন এলাকার ছাত্র অভিভাবকগণ। তারা এক লিখিত আবেদনও করেছেন মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা-পরিচালক বরাবর। এতে বলা হয়েছে-মাদ্রাসার একাডেমিক ও প্রশাসনিক শৃংখলা যার পর নেই ভেঙ্গে পড়েছে এবং ছাত্র, অভিভাবক ও এলাকাবাসির মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা মাদ্রাসার এসব সমস্যা সমাধানসহ লেখা পড়ার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন ।