জীর্ণ চেহারায় সুন্দরবন


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১৯ ||

 

নিজস্ব প্রতিনিধি: গহিন সুন্দরবনে ধু ধু বালুচর দেখা গেছে। বনের আশপাশের জঙ্গলে শীর্ণ বৃক্ষেরও দেখা মিলেছে। বিশে^র সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনের এই শীর্ণ চেহারায় চোখে পড়েনি পাখির পাল। সকাল সন্ধ্যা পাখির কলকাকলিও আকর্ষণ করছে না পর্যটকদের । দুই একটি জায়গায় কিছু পাখি দেখা গেলেও সুন্দরবনের সেই ‘পাখিরালয়’ যেনো হারিয়ে গেছে।

এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিলেন সুন্দরবন সফররত সাতক্ষীরার  একদল সাংবাদিক। তারা বললেন শতশত হরিণ বানর দেখেছি। বাঘের পদচিহ্ন দেখেছি। শুনেছি বাঘের গর্জনও। হেতালবনে বাঘের চলাফেরা অনুভব করা গেছে। নদী চরের বালুতে হাজার হাজার লাল কাঁকড়া দেখেছি। বিশেষ করে দুবলার চরের ১৮ চরের আলোর কোল, সাঁঝের মায়া, মেজ মিয়ার চরে যেনো লাল কাঁকড়ার মেলা  বসেছে।

গত রোববার থেকে সুন্দরবনের দুবলার চর, কটকা, জামতলা সী বীচ , হিরন পয়েন্ট, আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড , হাড়বেড়িয়াসহ বনের নানা স্থানে ভ্রমণ করে এই অভিজ্ঞতার কথা জানান তারা। সুন্দরবন সফরে রয়েছেন তাদের পরিবার পরিজনসহ  প্রায় দেড়শ’ সাংবাদিক।

নদীর পানিতে তীব্র লবণাক্ততার কথা জানিয়ে সাংবাদিকরা জানান, বড় বড় নদীতেও দেখা গেছে চর। বড় আকারের জলযান চরে আটকে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাংবাদিকরা। বনের দুই ধারের গোলপাতার সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য যেনো হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে বনে চোর বাওয়ালি ও চোর শিকারীর অভাব নেই। তারা সুযোগ বুঝে কেটে নিয়ে যাচ্ছে কাঠ গোলপাতা। শিকার করছে বন্য প্রাণিও। বনের গাছে গাছে শাখামৃগের দল দেখা গেছে। জেলে বাওয়ালিরা জানান সুন্দরবনে মিষ্টি পানির আঁধার না থাকায় বাঘ লোকালয়ে চলে আসে। এ ছাড়া মিষ্টি পানি না পাওয়ায় ব্যাঘ্রকুল নানা রোগে আক্রান্ত হয়। তবে কয়েকটি স্থানে বিশেষ করে বন বিভাগের স্টেশনগুলিতে মিষ্টি পানির পুকুর দেখা গেছে। বনবিভাগ এসব পুকুর খনন করায় মিষ্টি পানির চাহিদা কিছুটা হলেও মিটছে। তবে আরও পুকুর দরকার বলে জানান তারা।

দুবলার চরে প্রতি গোনে শত কোটি টাকার মাছ ধরা পড়ে। সেখানকার শুটকি পল্লীগুলি সবসময়ই কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু কী পরিমান মাছ এখানে উঠছে কিংবা শুটকিতে পরিনত হচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেল বনবিভাগের কোনো নজরদারি নেই এই শুটকি পল্লীতে। বনে লাগানো নারকেল গাছগুলি যেনো অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। শীর্ণ চেহারার এসব নারকেল বৃক্ষে কোনো ফল নেই। এর প্রতি কোনো যতœও নেই বন বিভাগের। এমন কি বনের যে সব বৃক্ষ মরে গেছে সেগুলি অপসারনেরও কোনো উদ্যোগ নেই। বন বিভাগের গেস্ট হাউসগুলি কেনো এবং কার জন্য তারও জবাব নেই। কারণ গেস্ট হাউসগুলি সব সময় বন্ধ দেখো গেছে।

সফররত সাংবাদিক সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ এবং সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ আনিসুর রহিম সুন্দরবন থেকে জানান তারা আজ মঙ্গলবার জামতলা সী বীচ এলাকায় ঘন জঙ্গলের মধ্যে বাঘের ডাক শুনেছেন। বেলা ১১টার দিকে বাঘ পরপর দুটি ডাক ছাড়লে তাদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কোস্টগার্ড সদস্যদের বরাত দিয়ে তারা জানান ওই জঙ্গলে এক বাঘিনী দুটি শাবকের জন্ম দিয়েছে। মা হিসাবে তাদের নিরাপত্তা রক্ষায় বাঘিনী প্রায়ই ডাক ছাড়ছে।

বনের গোলপাতা বিবর্ন হয়ে পড়ছে। প্রকৃতির বৈরি প্রভাবে বনের এমন হাল বলে জানিয়েছেন তারা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বনবিভাগের নজরদারিত্বের ঘাটতি। আছে বনকর্তন ও লুটপাটের অভিযোগও।

সাংবাদিকরা আরও জানান সুন্দরবনের সেই শ্যামল চেহারা যেনো মলিন হয়ে গেছে। বনের বৃক্ষরাজি রক্ষণাবেক্ষণে উদাসভাব লক্ষ্য করা গেছে।  বিশ^ ঐতিহ্য সুন্দরবন রক্ষায় এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে বলে জানিয়েছেন তারা।