জেলায় সবজি নিয়ে বিপাকে চাষীরা: হিমাগার না থাকায় ক্ষেতের সবজি ক্ষেতেই নষ্ট


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৯ ||

নিজস্ব প্রতিনিধি: সবজি নিয়ে বিপাকে জেলার চাষীরা। ক্রেতা না পেয়ে শতশত মণ শীতকাীলন সবজি চাষীর ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে। সবজি বিক্রি করতে না পেরে অনেকে গরু ছাগলের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় চলতি মৌসুমে জেলাতে কয়েক কোটি টাকার সবজি নষ্ট হবে বলে জানান চাষীরা। ফলে ন্যায্য দাম না পেয়ে চাষীরা সবজি চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে জানান।
সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বড়বাজারে পাইকারী ব্যবসায়িরা জানান, বেগুন কেজি প্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা, বাঁধাকপি ১ থেকে ২টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫ থেকে ৭ টাকা, টমেটো ৬ থেকে ৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মূলা অবিক্রিত থাকছে। চাষীদের দাবি সিন্ডিকেট করে সবজির দাম কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। যেখানে উৎপাদন খরচ কেজি প্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা, সেখানে বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ৫ টাকায়। সবজি চাষীদের দাবি তাদের কেজি প্রতি ক্ষতি ৫ থেকে ১ টাকা। পাইকারী ব্যবসায়ীদের দাবী রাজধানী উৎপাদন বেশি থাকায় সবজির চাহিদা কমে গেছে। এছাড়া জেলাতে এত বেশি পরিমানে সবজি উৎপাদন হয়েছে যা কেনার লোক নেই। ফলে দাম অনেক কম। এছাড়া পরিবহন খরচ বেশি হওয়াতে ঢাকাতে সবজি পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
জেলা কৃষিখামার বাড়ি সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৯ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে সবজির চাষ হয়েছে। এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ২ হাজার ৮০ হেক্টর, কলারোয়ায় ১ হাজার ৬শ’ হেক্টর, তালায় ১ হাজার ৬৬০ হেক্টর, দেবহাটায় ৫৫০ হেক্টর, কালিগঞ্জে ১ হাজার ৯১০ হেক্টর, আশাশুনিতে ৬২০ হেক্টর এবং শ্যামনগরে ৭শ’ হেক্টর জমিতে শীতকালিন সবজির আবাদ হয়েছে।
শীতকালিন সবজির মধ্যে বিশেষ করে ফুলকপি ৭৭৫ হেক্টর, বাঁধাকপি ৮০৫ হেক্টর, ওলকপি ৮৩০ হেক্টর, মূলা ৩৮০ হেক্টর, টমেটো ৪৮০ হেক্টর, সীম ৩৯৩ হেক্টর, পালংশাক ৫৭০ হেক্টর, বেগুন ৯৯৬ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবছর জেলাতে সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে।
কৃষি সূত্র জানায়, বিশ্বের মধ্যে সবজী উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়। জিডিপিতে বাংলাদেশের কৃষি খাতের অবদান ১৬ শতাংশ। দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ লোক কৃষি খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট। সবজির বাম্পার ফলন হলেও কোনো মৌসুমেই সবজির ন্যায্য দাম পায়না কৃষক। পানির দামে বিক্রি হয় কৃষকের কষ্টার্জিত সবজি। চলতি মৌসুমেও সবজির বাজারে ব্যাপকভাবে ধ্বস নেমেছে।
জেলার বিভিন্ন হাটে সবজির মধ্যে ফুলকপি ৪-৫ টাকা, সিম ও বেগুন ৫-৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এই দামে সবজি বিক্রি করে হাটে আনতে ভ্যান ভাড়া এবং জমি থেকে ফসল উঠানোর খরচ হচ্ছে না কৃষকদের। বাধাকপি প্রতি পিস ৩-৪ টাকা, গাজর ৭-৮ টাকা কেজি, টমেটো ৮-১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত সবজির ন্যায্য দাম না পেলেও খুচরা বাজারে আবার তিনগুন বেশি দামে সবজি কিনছে ভোক্তাসাধারণ।
সাতক্ষীরা পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের মিয়াসাহেবেরডাঙ্গী গ্রামের মোহর আলীর ছেলে ইসমাইল হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে তিনি একবিঘা জমিতে ওলকপির চাষ করেন। এতে তার খরচ হয় ২০ হাজার টাকা। কিন্তু বাজারে বর্তমানে যে দাম তাতে তার ওলকপি বিক্রি হবে ৫-৬ হাজার টাকায়। ফলে বিঘা প্রতি তার ক্ষতি ১৪-১৫ হাজার টাকা। একই অভিযোগ জেলার লক্ষাধীক সবজি চাষীর।
সুলতানপুর বড়বাজারের পাইকারী ব্যবসায়ী তেজরাত ভান্ডারের ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, বাজারে সবজির দাম একে বারেই কম। পরিবহন খরচ বেশি থাকায় ঢাকাতে পর্যাপ্ত সবজি পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় জেলার পাইকারী ও খুচরা বাজারে সবজির দামে তারতম্য বেশি।
জেলার প্রত্যেকটি থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে হিমাগার না থাকায় সবজি সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে কর্তৃপক্ষের দাবি। এখাতে সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষক যদি সবজি সংরক্ষণের উপযুক্ত মাধ্যম পেতো তথা হিমাগার বা সংরক্ষণাগার পেতো তাহলে তারা উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ সবজি হিমাগার রাখতে পারতো। এতে করে সিন্ডিকেট মহল দরপতনের চেষ্টা করলেও কৃষক এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেনা। সেইসাথে সবজি মৌসুমে পরিপূর্ণ সরবরাহ দিয়ে ন্যায্যমূল্যও পেতে পারবে।
কৃষি বিভাগ জানায় দেশে মোট হিমাগার আছে ৩৪৩টি। এগুলোয় মাত্র প্রায় সাড়ে ২০ লাখ টন পণ্য মজুদ রাখা যায়। এরমধ্যে ১ লাখ ৬২ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ৪৭টি হিমাগার বন্ধ রয়েছে। চালু রয়েছে ২৯৬টি হিমাগার। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ১৫ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ১৭টি হিমাগার রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অরবিন্দ বিশ্বাস জানান, জেলাতে সবজি সংরক্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারিভাবে হিমাগার তৈরি জন্য সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। তিনি জানান জেলাতে হিমাগারে তৈরি হলে সবজি নষ্ট হবে না। এছাড়া চাষীরা ন্যায্য দামও পেতে পারবে।