পরিযায়ী পাখি: অভয়ারণ্য বাংলাদেশ


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৯ ||

সুহৃদ সরকার
‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল, কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল’ কিংবা ‘পাখিটার বুকে কেউ তীর মেরো না, ওকে গাইতে দাও’ এই সব স্মৃতি জাগানিয়া কবিতা আর গান আমাদের যাপিত জীবনে পাখির সকন্ঠ উপস্থিকে যানান দিয়ে যায়। কিংবা কোনো প্রণয়িনীর বুকে বেঁধা শোলের যন্ত্রনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে এভাবেÑ‘ও পাখি, একবার আয় দেখে যা কেমন আছি’ অথবা ‘আমি একবারই কাদিয়াছিলাম, যেদিন আপন হাতে পোষ মানা পাখিটারে ছাড়িয়া দিলাম’। গান আর কবিতায় পাখি এসেছে তাই নানা অনুচ্ছেদে নানা মাত্রিকতা।
সেই পাখি নিয়ে যনম এতো কথা তখন চিরসুন্দরে নিয়ে একটু আলেঅচনার গভীরে যাওয়া যাক।
বাংলাদেশে পাখি আছে দুধরনের। যেমন দেশি পাখি আর বিভিন্ন ঋতুতে দূর দুরান্ত থেকে খানিকটা হাওয়াবদল কিংবা খাবারের খোঁেজ আমাদের দেশে আসা বিদেশি পাখি যাদেরকে আমরা পরিযায়ী পাখি বলে জানি।
গোটা বিশে^ কত প্রজাতির পাখি আছে ? এই প্রশ্ন নিয়ে নানা মুনির নানা মত। সেই মতামত বা ধারনাকে যদি গড় করা যায় তবে তবে বলা যায় পৃথিবীতে প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখি আছে। আনুমানিকভাবে এর সংখ্যা ২০ থেকে ৪০ হাজার কোটির মতো ভারতীয় উপমহাদেশে কমবেশি ১২শ’ প্রজাতির পাখি বাস করে। এদের মধ্যে বাংলাদেশে আছে ৭শ প্রজাতির পাখি। গবেষকদের দেয়া তথ্য মতে বিগত কয়েক শতাব্দীতে পৃথিবী থেকে ২শ’র অধিক পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর ১২শ’ প্রজাতির পাখি হুমকির সম্মুখীন।
ইংরেজি শব্দ মাইগ্রেশন শব্দটির বাংলা পরিভাষা হলো সাংবাৎসারিক পরিযান। আর পরিযান বলতে বোঝায় কিছু পাখির সমাহার যারা প্রতিবছর বা কয়েক বছর পরপর একটি নিদিষ্ট ঋতুতে এক দেশ থেকে আরেক েেশ যাওয়া আসা করে। আর এই আসা-যাওয়া করে যে পাখিগুলে সে পাখিগুলোকে বলা হয় পরিযায়ী পাখি।
পরিযায়ী পাখিগুলো একটা নির্দিষ্ট ঋতুতে আমাদের দেশে আসে। আবার এখানে কিছুদিন থেকে তাদের নিজস্ব বাসভূমি ফিরে যায়। সে ক্ষেতে এই পাখিগুলোকে অতিথি পাখিও বলা হয়ে থাকে। পরিযান কি শুধু পাখিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ? তা কিন্তু নয়। কিছু প্রজাতির মাছ, স্কন্যপায়ী প্রাণীসহ পোকামাকড়ও পরিযান ঘটে। পরিযায়ি প্রাণিদের মধ্যে পাখিই খুব বেশি পরিযান ঘটায়। পৃথিবীর প্রায় ১০ হাজার পাখির মধ্যে ১৮শ’ ৫০ জাতিই পরিযায়ী।
এখন প্রশ্ন হলো কেন এই পাখিগুলো পরিযান ঘটায় ? এর দুটি কারণ। ১. খাদ্যের সহজলভ্যতা ২.বংশ বৃদ্ধি।
আবহাওয়া পরিবর্তন অর্থ্যাৎ ঋতুর পরিবর্তনজনিত কারণকে পরিযানের বিশেষ কারণ হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে। আধিকাংশ পাখি উত্তর গোলার্ধ অর্থাৎ এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকা থেকে দক্ষিনে চলে আসা খাবার খাদ্যের প্রয়োজনে। প্রচন্ড শীতের কারণে উত্তর গোলার্ধে বিশেষ করে সাইবেরিয়া আঞ্চলে বরফ জমে যায় এবং এবং অপ্রতুলতা দেখা দেয়। আর সে কারণে খাদ্যের জন্য তারা নিজের এলাকা ছেড়ে নিরাপদ অঞ্চলের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। বাংলাদেশের পরিযায়ী পাখি বলতে বোঝানো হয় কেবলমাত্র শীতকালে আসা পাখিসমুহকে। আবার বাংলাদেশের পরিযায়ী পাখি বলতে ধরেই নেওয়া হয় যে, সেগুলো শীতকালে আসা হাঁস ও রাজাহাঁসকে। আবার কালেম সরালী ও ডাহুক পাখিকে পরিযায়ী পাখি হিসাবে ধরা হয়। এগুলো বাংলাদেশের নির্ভেজাল বাসিন্দা প্রজাতির পাখি। পরিযায়ী পাখি মানেই যে হাঁসজাতীয় ও জলচর পাখি এমনটি কিন্তু নয়। এর একটি বিশাল অংশ জুড়ে আছে খজœনা (ডধহমঃধরষং), চটক (ঋষুপধঃযবৎং), মাঠ চড়–ই (খধৎশং), কসাই পাখি (ঝযৎরশবং), গাঙচিল, বিভিন্ন শিকারী পাখি ইত্যাদি।
বাংলাদেশের আবাসিক ও পরিযায়ী পাখিগুলোর মধ্যে আছে জলা ও সৈকতের পাখি। আবার আছে লোকালয় ও বনজঙ্গলের পাখি। আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় পাখিটির নাম রামশালিক বা লোহার জঙ্গ এবং সবচেয়ে ছোট পাখিটির নাম সিদুরে পিঠ বা ফুলঝুরি। অঅবার কোনো কোনো পাখি স্বল্প সময়ের জন্য আমাদের দেশে এসে আবার তাদের স্বদেশে ফিরে যায়। কোনো কোনো পাখি প্রজননের জন্য আমাদের দেশে আসে। ডিম পাড়া, বাচ্চা ফোটানোর পর আবার তারা ফিরে যায়। বলা যেতে পারে এদেশ তাদের স্বল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম নেয়ার জায়গা।
পক্ষীবিশারদ শরীফ খান রচিত বাংলাদেশের পাখি একটি সচিত দ্বিভাষিক প্রমান্য গ্রন্থ। একে ইংরেজি রূপ দিয়েছেন ড. আনম আমিনুর রহমান। বর্ণিত গ্রন্থটিতে সর্বমোট ২০৫টি পাখির সংক্ষিপ্ত তথ্য প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলঅদেশের আবাসিক পাখির সংখ্যা ১৭৫ এবং ২২ টি পরিযায়ী পর্যায়ভুক্ত। এছাড়া দুর্লভ, বিরল ও অনিয়মিত পাখি সমূহের মধ্যে সংকটাপন্ন পাখি একটি, বিপন্ন ৫টি ও মহাবিপন্ন ৯টি পাখি রয়েছে।
ইতোপূর্বে পরিযায়ী পাখির আমাদের দেশে আসার প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তর গোলার্ধে যখন গ্রীষ্ম দক্ষিণ গোলর্ধে তখন শীত। আবার কখনো তার উল্টো। উত্তর গোলার্ধে বিশেষ করে পরিযায়ী পাখিদের যেখানে নিজস্ব নিবাস সেখানে নদী, পুকুর, সাগর বরফে বরফে সাদা। খাদ্যের সংকট সেখানে। জীবন সেখানে বিপন্ন প্রায়। সুতরাং খাদ্যের খোঁজে সূর্যকে অণুসরণ করে হাজার হাজার মাইল উড়ে উড়ে চলে আসে বাংলাদেশে। আশ্রয় নেয় এখানকার হাওড়, বাওড় ও জলভ’মিতে। ঢাকার অদূতে জাহাঙ্গীর নগর। এখানকার জলভূমিতে শীতকালে প্রচুর অতিথি পাখির সমগম ঘটে। আর সে কারণে সেখানে গোটা শীতকাল জুড়ে থাকে পাখি প্রেমিকদের ভীড়।
এখানে আমরা কিছু সংখ্যক পরিযায়ী পাখির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরছিÑ
ক্স কালো টুপি মাছরাঙ্গা : দৈর্ঘ্য ২৮ সেমি। বেগুনি- নীল পিঠ, কাঁধ কালো, ঘাড়ের চারপাশ ও গলা সাদা। মাথায় যেন একটি সাদা টুপি। দেহের নিচের অংশ লালচে। লম্বা ঠোট ও পা উজ্জল লাল। ডিম দেয় ৪-৫টি। ১৯ থেকে ২৫ দিনে বাচ্চা ফোটে।
ক্স পান্না কোকিল : দৈর্ঘ্য ১৮ সেমি। পুরুষ কোকিলের দেহের উপরাংশ ও গলা পান্না সবুজ, তাতে সোনালি ব্রোঞ্জ আভা। স্ত্রী কোকিলের মাথা ও ঘার সোনালিÑলাল।
ক্স পাপিয়া : দৈর্ঘ্য ৩৩ সেমি, ওজন ৬৫ গ্রাম। মাথায় কালো ঝুটি, দেহের উপরিভাগ কালো ও নিচের অংশ সাদা। লেজের ডগায় সাদা দাগ ও পাখার প্রান্তে সাদা ছোপ। সে অন্যের বাসায় ডিম পাড়ে।
ক্স মানিকজোড় : দৈর্ঘ্য ৯০-১২৫ সেমি, ওজন ৩.৫ কেজি। গোলাকার লম্বা ঠোটটি উলের মতো সাদা। পিঠ কালো। লম্বা পা দুখানা হালকা লাল। ঠোট লাল। ডিম দেয় ৩-৪ টি। ফোটে ২৭-২৯ দিনে।
ক্স মদনটাক : দৈর্ঘ্য ১১৫-১২০ সেমি। ওজন ৪-৫ কেজি। গোলাকার হলুদ গলা। পাদুখানা ধূসর-ছাই রঙ্গের। পিঠ নীলাভ-কালে। বুক পেট ও লেজের তলা মাখনের মতো সাদা। ডিম পাড়ে ৩-৪ টি। ফোটে ২৮-৩২ দিনে।
ক্স সাদা হালতি : দৈর্ঘ্য ১৯ সেমি, ওজন ৬৫ গ্রাম। চোখের উপর দিয়ে কালো কাজলের রেখা চলে গেছে ঘাড় পর্যন্ত। মাথার তালু সবুজাভ তাতে হলুদের আভা ও লালচে মিশ্রন, বুক ও পিঠ হালকা হলুদাভ। পিঠ ঘন সবুজ। হলুদ পা, কালো পেঁট।
ক্স ফুটফুটি : দৈর্ঘ্য ১৩ সেমি, ওজন ৮ গ্রাম। হলুদাভ বুক ও পেট। ঘাড় ও পিঠ মাথা ছাই-ধূসর। পিঠ হলুদাভ ও সবুজাভ। ঠোঁট ও পা হলুদ্ভ। ডিম দেয় ৪ টি। ফোটে ১০-১৪ দিনে। শীতের পরিযায়ী পাখি।
ক্স ছোটো ভীমরাজ : দৈর্ঘ্য ২৮ সেন্টিমিটার, ওজন ৫০ গ্রাম। এক নজরে ধাতব কালো পাখি। তারের ন্যায় লেজের বাহির পালক দুটির শেষ প্রান্তে পাতার মতো র‌্যকেট রয়েছে। পা ও ঠোট কালো। ২-৩ টি ডিম দেয়। ফোটে ১৫-২০ দিনে। পরিযায়ী পাখি হিসাবে বাংলাদেশে প্রায়শই দেখা যায়।
ক্স ধুসরাঙ ফিঙে : দৈর্ঘ্য ৩০ সেমি, ৪০ গ্রাম। এক নজরে পুরোপুরি ধুসর কালো পাখি। লম্বা লেজটি গভীরভাবে চেরা। পা ও ঠোট কালো। ডিম দেয় ২-৩ টি। এটি একটি দূর্লভ পরিযায়ী পাখি।
ক্স দুধরাজ : দৈর্ঘ্য ২০ সেমি, ওজন ২০ গ্রাম। মাথায় চমৎকার খাড়া ঝুঁটিসহ পুরুষের মাথা, ঘাড় ও গলা চকচকে নীলাভ কালো। ডানার প্রান্তদেশ বাদে বাকি দেহ লালচে। লেজের সুদৃশ্য লম্বা ফিতে পালক দুটো একই। বয়স্ক পুরুষের লালচে রং সাদায় রূপান্তরিত হয়। স্ত্রী লালচে ও লেজ ছোট। ঠোট ও পা নীলচে। একবারে ডিম দেয় ৪ টি। ডিম ফোটে ১৫-২১ দিনে। দূর্লভ আবাসিক পাখি। শীতের পরিযায়ী হিসেবেও আসে।
ক্স সোয়ালো : দৈর্ঘ্য ১৮ সেমি, ওজন ১৯ গ্রাম। কপাল, থুতনি ও গলা তামাটে। দেহের উপরটা উজ্জল ইস্পাত-নীল। দেহতল ও ডানার নিচ উপজাতি ভেদে সাদাটে বা ক্রিম থেকে তামাটে। স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে একই রকম। ঠোঁট ও পা কালো। ডিম দেয় ৩-৪ টি। ফোটে ১২-১৭ দিনে। এটি একটি সচরাচর দৃশ্যমান পরিযায়ী পাখি।
এছাড়া পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে আছে মদন টাক, কসাই, ছোট ভীমরাজ, ধুসরাভ ফিঙে, দুধরাজ, সোয়ালো প্রভৃতি। এই সকল পরিযায়ী পাখিরা সাধারণত শীতকালে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন হাওড়-বাওড় ও জলাশয়ে আশ্রয় নেয়। টাঙ্গুয়ার হাওড়, বাইক্কা বিল, কুলীক পাখিরালয়, হাকালুকি হাওড়, রবীন্দ্রনাথ সরোয়ারসহ জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় পরিযায়ী পাখিদের আবাসস্থল। পরিযায়ী পাখিরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বিপদজনক জীবাণু বহন করে। তারা নিজেরা সে জীবাণুতে আক্রান্ত হয়না। এরা ঐ সকল জীবাণু বাহক হিসেবে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। ফলে যে সব পাখির প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই তাদের মধ্যে জীবাণুবাহী পাখি রা জীবাণু ছড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশের আবাসিক পাখি হোক বা পরিযায়ী পাখি হোক সব পাখিই পৃথিবীর সবেেচয়ে সৌন্দর্যের প্রতিক। সামগ্রিকভাবে পাখি হচ্ছে প্রকৃতির অপরূপ দান। পাখির গুরুত্বটিকে বিশেষ ভাবে অনুধাবনকরে দোয়েলকে বাংলাদেশের জাতীয় পাখির আসনে বসানো হয়েছে। পাখি শিকার পৃথিবীর মধ্যে আদিম শখগুলোর মধ্যে অন্যতম। আর এই শখের কাজটি করার ফলে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে অজ¯্র প্রজাতির পাখি। সুতরাং সবার উচিত পাখি শিকার থেকে বিরত থাকা। পরিযায়ি পাখি আমাদের অতিথি। এই অতিথিদের প্রতি আমাদের আরও বেশি যতœবান হওয়া উচিত। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পরিযায়ী পাখিদের অভয়ারন্য হোক আমাদের এই বাংলাদেশ।