স্মরণ রউফ বুক ডিপোর সেই আড্ডা


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৯ ||

সুভাষ চৌধুরী
বেশ পুরনো দিনের কথা। সাতক্ষীরা শহরে কমপক্ষে চারটি স্থানে নিয়মিত আড্ডা বসতো। দিনে দুপুরে রাতে। এই আড্ডা হলো মোতালেব ভাইয়ের আহমাদিয়া প্রেসের আড্ডা। ফজলুর রহমান স্যারের জাহান প্রেসের আড্ডা। মিউনিসিপ্যালিটি চেয়ারম্যান মোজাহার সাহেবের বৈঠকখানার আড্ডা। আর এড. আবদুর রউফের ‘রউফ বুক ডিপো’র আড্ডা। এর মধ্যে মোজাহার সাহেবের বৈঠকখানার আড্ডা বাদে অবশিষ্ট তিন আড্ডা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক বিষয় ছিল পুস্তক ব্যবসা, স্কুলের প্রশ্নপত্র প্রকাশ এবং সর্বোপরি প্রিন্টিং প্রেস বা ছাপাখানার ব্যবসা। একই সাথে শিক্ষক সমিতির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও হতো এখানে। এই তিন আড্ডা এখন কিন্তু আর নেই। কোথায় যে হারিয়ে গেছে তার কোনো হদিসও মেলানো যায় না। এখানে চায়ের কাপে ধোঁয়ার সাথে নিত্য ঝড় উঠতো। বলা দরকার যে এই তিন আড্ডার মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব ছিল। তবে আমরা যারা আড্ডাবাজ ছিলাম তারা কেউই কিন্তু এই দ্বন্দ্বে জড়িত ছিলাম না।
রউফ বুক ডিপোর আড্ডার কথাই বলি। এই আড্ডা বাড়ির প্রাণ পুরুষ ছিলেন এড. আবদুর রউফ। আশির দশকে আমি ইন্টারভিউয়ে প্রথম হয়ে সাতক্ষীরা পল্লীমঙ্গল হাইস্কুলে ইংরেজি বিষয় শিক্ষক নিযুক্ত হবার সময় সিলেকশন বোর্ডের সদস্য রউফ ভাইয়ের সাথে প্রথম পরিচয় ঘটে। তিনি সে সময় ওই বিদ্যালয়ের ভাইস চেয়ারম্যান। এরপর থেকে তার সাথে আমার নিয়মিত সংযোগ হতো। কখনও স্কুলে, কখনও আইনজীবী সমিতি ভবনে। আবার কখনও রউফ বুক ডিপোতে। তিনি আইনজীবী হিসেবে সন্ধ্যায় রউফ বুক ডিপোর উপর তলায় বসতেন। আর নিচতলায় বুক ডিপোতে আড্ডায় গল্পে বসতেন। দীর্ঘদিন পর সে দিনের সেই সব আড্ডার কথা খুবই মনে পড়ে। কারণ স্মৃতিতে ধুলো মরিচা জমলেও স্মৃতি কিন্তু অক্ষত থাকে। আমাদের আড্ডায় আমরা যারা সচরাচর শরিক হতাম তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রয়াত মীর এশরাক আলি ইসু মিয়া, সাবেক জেলা শিক্ষা অফিসার আবুল হোসেন, আলিপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রয়াত আবদুল হক, পল্লীমঙ্গল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ইউনুস আলি, প্রয়াত প্রফেসর অমল কুমার রাহা, অধ্যক্ষ আবদুল হামিদ, জনকন্ঠর মিজানুর রহমান এবং আমি নিজেই। আরও অনেকেই আছেন। আমাদের এই আড্ডায় অনেক সময় হঠাৎ সংযুক্ত হতেন কিংবদন্তী শিক্ষক নেতা বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি প্রয়াত প্রধান শিক্ষক শেখ আমানুল্লাহ। আমাদের এই আড্ডা নিয়মিত ফলো করতো পুলিশের বিশেষ বিভাগের সদস্যরা। কোনো রাজনীতি হয় কিনা কিংবা সরকার বিরোধী কোনো উচ্চারণ এখানে হয় কিনা তা দেখতো স্পেশাল ব্রাঞ্চ অব পুলিশ। আমাদের আড্ডার অন্যতম সদস্য মীর এশরাক আলি সবার প্রিয় ইসু ভাই বলতেন ‘আরে আমরা তো পিজিপি। আমাদের বিরুদ্ধে আবার কি রিপোর্ট করবে পুলিশ।’ আমরা প্রশ্ন করতাম পিজিপি মানে কি। সে আবার কোন দল। রসিকতা করে ইসু মিয়া হাসি দিয়ে বলতেন ‘আরে পিজিপি মানে বোঝেন না, মানে প্রেসেন্ট গবর্নমেন্ট পার্টি।’ আমরা হেসে রস আস্বাদন করতাম। আর আমাদের আড্ডাবাজিকে প্রাণবন্ত করে তুলতেন অ্যাডভোকেট আবদুর রউফের স্বজন গোলাম হোসেন। গোলাম হোসেন আমাদের চা সিগারেট পান চানাচুর সাপ্লাই করতেন সকাল দুপুর বিকাল ও রাতে। আড্ডায় আলোচনায় আসতো সমসাময়িক রাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি, পারিপার্শ্বিক দুর্নীতি, আলোচনা, সমালোচনা অনেক কিছু। তর্কের ঝড় উঠতো। চা খাইয়ে সে ঝড় আবার থেমে যেতো। রোজার দিনে রউফ বুক ডিপোতে নিয়মিত মজাদার ইফতারি আসতো। যারা রোজা নন তারাও রোজাদারদের সাথে শরিক হতেন। রউফ বুক ডিপোর আড্ডার চেয়ার টেবিলে বসে আমি সাদা কাগজ রেখে কালির কলমে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা রিপোর্ট লিখতাম। আমার বাঁ হাতের তর্জনী আর মধ্যমার ফাঁকে আটকা পড়া জ্বলন্ত সিগারেট ক্ষণে ক্ষণে উঠতো ঠোঁটে। আর মজার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়তাম আমরা। এভাবেই চা পান সিগারেটের আড্ডা জমে উঠতো রউফ বুক ডিপোতে। সাথে নানা গল্প, নানা আড্ডা।
অ্যাডভোকেট আবদুর রউফ নিজেও আমাদের সাথে গল্পবাজিতে মজে উঠতেন। অনেক বিষয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলতেন ‘আই অ্যাম দ্য লাস্টম্যান’। আমরা সবাই মিলে মজা লুটে নিতাম। পল্লীমঙ্গল হাইস্কুলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ম্যানেজিং কমিটি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। শিক্ষকদের যেমন সম্মান করতেন তেমনি তাদের ওপর প্রশাসনিক খবরদারিও চালাতেন। খোঁজ খবর রাখতেন বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার হালচাল সম্পর্কে। লেখাপড়া বিষয়ে কিংবা কোনো শিক্ষকের বিষয়ে যে কোনো ধরনের গোপনীয় অভিযোগ গ্রহন করতেন। এসব অভিযোগ নিষ্পত্তি করার উদ্যোগ নিতেনও তিনি। স্কুলের দরিদ্র ছাত্র ছাত্রীদের বেতন কনসেশন বিষয়ে তিনি সুপারিশ করতেন। তার সেই সুপারিশ সবাই মেনেও নিতেন। এমনকি প্রতি বছর এসএসসি পূর্ব টেস্ট পরিক্ষায় উত্তীর্ণদের সেন্ট আপ করার পাশাপাশি অনুত্তীর্ণদের নিয়েও তিনি ইতিবাচক ও নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দিতেন। তার এসব সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করতাম। অ্যাডভোকেট আবদুর রউফ একজন সামাজিক মানুষ ছিলেন। হাসিতে খুশীতে ভরা থাকতেন সব সময়’। দিনভর কোর্ট কাছারি করতেন। জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন করেছেন বারবার। হয়েছেন দুইবার সাধারণ সম্পাদক ও দুইবার সভাপতি। ১৯৪৭ এ ভারত থেকে তৎকালিন পুর্ব পাকিস্তানে আসেন অ্যাডভোকেট আবদুর রউফ ও তার পরিবার। পরিণত বয়সে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ ভাসানী)’র অনুসারী ছিলেন। জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে তিনি যোগ দেন বিএনপিতে। কিছুদিন পর থেকে আমৃত্যু জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন অ্যাডভোকেট আবদুর রউফ। তখন জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ছিলেন অ্যাডভোকেট আবদুর রহিম। রাজনৈতিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আইনজীবী অঙ্গন ছাড়াও তার বিচরণ ছিল সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। অ্যাডভোকেট আবদুর রউফ ছিলেন সাতক্ষীরা নজরুল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ফ্রেন্ডস ড্রামাটিক ক্লাবেরও সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। সাতক্ষীরার প্রাচীন ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান এরিয়ান্স ক্লাবের শীর্ষ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন অ্যাডভোকেট আবদুর রউফ। এছাড়া মসজিদ মাদ্রাসা, স্কুল এবং আহসানিয়া মিশনের সাথে জড়িয়ে ছিলেন তিনি।

ষাটের দশকে স্থাপিত হয় রউফ বুক ডিপো। এখনকার শহিদ নাজমুল সড়কের (পাকা পুলের মোড়) এই রউফ বুক ডিপো ছিল আমার আর জনকন্ঠর মিজানুর রহমানের পোস্টাল ঠিকানা। শুধু পোস্টাল ঠিকানা নয় আমাদের সাথে সাক্ষাতের ঠিকানাও এই রউফ বুক ডিপো। আমার সাক্ষাতপ্রার্থীরা জানতেন রউফ বুক ডিপোতে আমাকে পাওয়া যায়। এই ঠিকানায় আমাদের চিঠি আসতো। কুরিয়ার আসতো। এমনকি প্রেস বিজ্ঞপ্তিও আসতো এখানে।
আগেই বলেছি স্মৃতিতে ধুলো মরিচা জমলেও স্মৃতি কিন্তু মুছে যায় না। রউফ বুক ডিপোর সেই ভবন ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে, উচ্চ ভবনের প্রত্যাশায়। এখন আর রউফ বুক ডিপো নেই। আর এর প্রাণপুরুষ অ্যাডভোকেট আবদুর রউফও নেই। ২০১৮ এর ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু রউফ ভাই তার স্মৃতিগুলিকে রেখে গেছেন। এখনও মনে হয় রউফ ভাই তার লড়বড়ে মোটর সাইকেল থেকে এইতো যেনো নামলেন রউফ বুকের সামনে। কিংবা এইতো রউফ বুক ডিপোর আড্ডা ছেড়ে তিনি চলে গেলেন। এর কোনটিই কিন্তু সত্য নয়। কারণ আবদুর রউফ স্মৃতির তলে ধুলো মরিচায় চাপা পড়েছেন। আর আমি কেবল দুই হাতে তা সরিয়ে অম্লান স্মৃতিটুকু তুলে আনবার চেষ্টা করছি।
আমি বলবো তিনি বয়সে ছিলেন প্রবীণ অথচ কর্মে প্রাণে পেশায় তিনি ছিলেন একজন তরুণ। সুস্থ সবল প্রাণ উচ্ছাসের এমন একটি মানুষকে আকষ্মিক হারিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘মানসী’ কাব্যের ‘প্রকাশ বেদনা’ কবিতা থেকে ধার করে বলছি ‘ হৃদয় বেদনা হৃদয়েই থাকে, ভাষা থেকে যায় বাহিরে, শুধু কথার উপরে কথা, নিস্ফল ব্যাকুলতা’। লেখক: সাতক্ষীরা ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি