সাড়ে চার শ’ বছর ধরে ভালুকা চাঁদপুর জামে মসজিদের মাটি-পানি মহৌষধ


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯ ||

এসএম শহীদুল ইসলাম: বিয়ের বারো বছর পর সন্তানের মুখ দেখেছেন জেসমিন সুলতানা। সন্তানের মুখে প্রথম ভাত দিতে খুলনার ফুলবাড়ি গেট থেকে এসেছেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর সাড়ে চার শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী জামে মসজিদে। এ মসজিদে আসার কারণ জানতে চাইলে জেসমিন সুলতানা বলেন, বারো বছর নি:সন্তান থাকার পর তিনি সৃষ্টিকর্তার নিকট মানত করেন ‘যদি তার সন্তান হয় তবে ভালুকা চাঁদপুর জামে মসজিদে মানিক চৌধুরী (রহ.) এর দরগায় একটি খাসি কোরবানী করে সন্তানের মুখেভাত দিবেন।’ সৃষ্টিকর্তা তার ডাক শুনেছেন। জেসমিনের কোলে ৯মাসের ফুটফুটে কন্যা সন্তান। তার মুখেভাত ও খাসি কোরবানী করতে সপরিবারে এসেছেন মানিক চৌধুরী (রহ.) এর দরগায়। বছর দেড়েক আগেও একাধারে তিন সপ্তাহ (তিন শুক্রবার) এসেছিলেন তিনি। প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের আজানের আগে এসে মসজিদের দক্ষিণ পাশের দিঘিতে গোসল করে দিঘির পানি বোতলে ভরে আর মসজিদের মাটি নিয়ে মসজিদের সামনে বিশেষ স্থানে রেখে নামাজন্তে সেই পানি-মাটি বিশেষ নিয়মে ব্যবহার করতেন জেসমিন সুলতানা। তার দাবি, এভাবে পরম ভক্তিতে মাটি-পানি ব্যবহারে পরম করুণাময় মহান আল্লাহ তার দোয়া কবুল করে মনের আশা পূরণ করেছেন। মেয়ের নাম রেখেছেন রুবাইয়া সুলতানা। তিনি রুবাইয়ার সুস্থতা কামনা করেছেন। এভাবে সন্তানের মুখে প্রথম ভাত খাওয়াতে এসেছেন আশাশুনির কুল্যা এলাকা থেকে লুৎফর রহমান, একই উপজেলার শোভনালী এলাকার জয়নাল আবেদীন, সদরের ফিংড়ী এলাকার মহিদুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ, শিমুলবাড়িয়া থেকে রহমত আলী, আনারুল ইসলাম, দেবহাটার কুলিয়া এলাকার জাকির হোসেনসহ শতশত পরিবার। এদের কেউ এসেছেন নি:সন্তান থেকে সন্তান লাভের আশায়, কেউ এসেছেন রোগমুক্তির আশায়, কেউ এসেছেন নতুন ফসলের ভাল ফলনের আশায়। ভক্তদের আগমনে প্রতি শুক্রবার এখানে মেলা বসে। কেউ আসেন মোরগ নিয়ে, কেউ আসেন ক্ষেতের প্রথম ফসলের অংশ নিয়ে, কেউ বাগানের ফল, কেউ ঘেরের প্রথম ধরা মাছ, কেউ গরু-ছাগল নিয়ে। এভাবে ভক্তদের মিলনমেলায় পরিণত হয় ভালুকা চাঁদপুর ঐতিহ্যবাহী জামে মসজিদ প্রাঙ্গন। সরেজমিনে দেখা যায়, ভক্তরা দিঘির পানিতে গোসল শেষে বোতলে পানি ভরে রাখছেন মসজিদের সামনে। এরপর মসজিদের সামনের প্রাচীরের গোড়া থেকে মাটি নিয়ে রাখছেন বোতলের পাশে। নামাজ শেষে সেই পানি-মাটি পরম ভক্তিতে ব্যবহার করছেন তারা। এ দৃশ্য দু’এক বছরের নয়। সাড়ে চার শ’ বছর ধরে চলছে এ মসজিদ ও দিঘির পানি-মাটি ব্যবহার।
জানা যায়, প্রায় সাড়ে চার শ’ বছর আগে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে মানিক চৌধুরী নামে এক সিদ্ধ পুরুষ জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ভালুকা চাঁদপুর জমিদার বংশের সন্তান। জনশ্রুতি আছে, এই গ্রামে খালাস সরদার নামে এক দরিদ্র ব্যক্তি বাস করতেন। তিনি ছিলেন অতি পরহেজগার ও খোদাভক্ত। অলৌকিকভাবে তিনি বহু গুপ্ত সম্পদের অধিকারী হন। এ সম্পদ দিয়ে তিনি নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নিকট থেকে তাঁর ছেলে আজমত উল্যাহর নামে একটি জমিদারি পরগনা ক্রয় করেন। পরগনা কেনার সম্মানে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর নাম দেন আজমত উল্যাহ চৌধুরী।
পরগনা কেনার পর তা রক্ষার জন্য এক শ’ বিঘা জমির চারপাশে একটি খাল খনন করেন। যা ‘গড়’ নামে পরিচিত। আকারে ছোট হওয়ায় একে গড়ের গাভীও বলা হয়। এই গড়ে ১৬জন মাঝি বিশিষ্ট একটি বড় নৌকা দিনরাত পরগনা পাহারা দিত। কারণ সে সময় পাশের সুন্দরবনসহ বহিরাগত ডাকাতদের উপদ্রব ছিল। জমিদার আজমত উল্যাহ চৌধুরীর ছিল ৭ ছেলে। তার মধ্যে মানিক চৌধুরী ছিলেন একজন। তিনি ছিলেন অলিয়ে কামেল এবং বিশিষ্ট দরবেশ। জনসাধারণের নামাজের সুবিধার্থে তিনি ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে নির্মাণ করেন তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। ২৬ হাত দৈর্ঘ্য ও ১০ হাত প্রস্থ বিশিষ্ট এ মসজিদের দেয়াল ৪০ ইঞ্চি পুরু। মসজিদের পাশেই আড়াই বিঘা আয়তনের কবরস্থান। মসজিদের দক্ষিণপাশে বিশাল দিঘি রয়েছে। দিঘিটির আয়তন এক একর ৬০ শতক। সাড়ে চার শ’ বছর পরও মানুষ এ দিঘির পানি মহৌষধ হিসেবে ব্যবহার করে।
মসজিদের একজন অবৈতনিক তত্ত্বাবধায়ক সাইদুর রহমান চৌধুরী (খোকন) বলেন, প্রায় চার শ’ বছর মসজিদটি মূল নকশায় ছিল। আজও সে নকশায় আছে। ১৯৮২ সালের দিকে ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের ক্যাপ্টেন রবিউল ইসলাম চৌধুরী অনেকগুলো জনহিতকর কাজ করেন। তিনি মসজিদটি সংস্কার করে আয়তন বৃদ্ধি করেন। এরপর ১৯৯৫ সালে ক্যাপ্টেন রবিউল ইসলাম চৌধুরী এমভি আল কাশেম নামের জাহাজসহ নিখোঁজ হন। দীর্ঘদিন পর মসজিদটির সংস্কার করা হয়। বর্তমানে দ্বিতল ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ত্রিতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মসজিদ ও দিঘি হতে পারে পর্যটকদের কাছে দর্শনীয় স্থান। সরকারি পৃষ্টপোষকতা পেলে ঐতিহ্যের স্মারক এ প্রাচীন মসজিদটি খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার নব দিগন্ত। কেননা মসজিদটি ইটের আকার ও গাঁথুনি বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের মতই। ছোট ছোট ইটের কারুকার্যে মসজিদের দেয়াল শোভা পায় অনন্য নান্দনিকতায়। মসজিদটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন সমাজ সেবক লুৎফর রহমান চৌধুরী।
ওই মসজিদের সাধারণ সম্পাদক হাসান মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রায় সাড়ে চার শ’ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদে প্রতি দিন শতশত মুসুল্লী নামাজ আদায় করেন। শুক্রবার এখানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানত আদায় ও মানত করতে দশ থেকে বারো হাজার মানুষ আসেন। বেশি আসেন নারী। মসজিদে পুরুষের পাশাপাশি পৃথকভাবে নারীদেরও নামাজ আদায় করার ব্যবস্থা আছে। এখানে একসাথে দুই হাজার পুরুষ ও ৫০০ জন নারী এক জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, মসজিদ ক্যাম্পাসটি প্রায় হভপড়ে ৮ বিঘা জমির উপর। এখানে নারীদের বসা ও বিশ্রামের জন্য ভবন দরকার। কেননা যে সব নারী এখানে আসেন তাদের কোলে থাকে শিশু। তাই নারী ও শিশুদের জন্য বিশ্রামাগার নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দিঘির পাড়ও সংস্কার করা জরুরী। এজন্য দরকার সরকারি উদ্যোগ ও বরাদ্দ। ইতোমধ্যে সীমানা নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রতি বছর বাংলা ২৮ ফাল্গুন ভালুকা চাঁদপুর জামে মসজিদে হযরত মানিক চৌধুরী (রহ.) এর স্মরণে তিনদিনব্যাপী পবিত্র উরস অনুষ্ঠিত হয়।