সুন্দরবনের গোলপাতা মূল্যবান সম্পদ


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৯ ||

মোঃ আবদুর রহমান
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে বংগোপসাগরের কোল ঘেষে অবস্থান করছে সুন্দরবন। ৫ লাখ ৭৭ হাজার ২শ’ ৮৫ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট সুন্দরবনের প্রায় সর্বত্রই গোলপাতা জন্মে থাকে। তবে নদী ও খাল ধারে অধিক পরিমাণে দেখা যায়। সুন্দরবনে ছোট বড় মিলে প্রায় ৪৫০ এর মতো নদী ও খাল জালের ন্যায় বিন্যস্ত আছে। আর গোলপাতা গাছও এসব স্থানের নদী-খাল ও চড়াতে বিক্ষিপ্তরূপে শোভা পাচ্ছে।
গোলপাতা বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ প্রজাতি। এটি সুন্দরবনের একটি অতি মূল্যবান প্রাকৃতিক অর্থকরী সম্পদ। পামী পরিবারের এ গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতিটি সুন্দরবন ছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলের নদী-খালের ধারে জন্মাতে দেখা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও মায়নমার, শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, চীন, ভিয়েতনাম, কুইন্সল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল, পাপুয়া নিউগিনি, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে গোলপাতা জন্মে থাকে। এত তথ্যে জানা যায়, প্রতি বছর সুন্দরবন হতে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন গোলপাতা সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। আর এ থেকে সুন্দরবন বিভাগের প্রায় ৭০ লাখ টাকা রাজস্ব অর্জিত হয়। নামে গোল হলেও গোলপাতা আসলে গোলাকার নয়, লম্বা লম্বা। এর পাতা সবুজ বর্ণের অনেকটা নারিকেল গাছের পাতার মতো। গোলপাতার কান্ড বা রাইজোম মাটি হতে ৫০ সেঃ মিঃ এর মতো উচুঁ দেখা যায়। ৩-৪ বছরের নারিকেল চারার আকৃতি বিশিষ্ট গাছ ঝাড় আকারে বিন্যস্ত থাকে। একেক ঝাড়ে ১০-১৫টি পর্যন্ত ষ্ট্যাম্প থাকে। রাইজোমের মাধ্যমে এক গাছ হতে অন্য গাছের পাশাপাশি বিস্তার ঘটে। প্রতিটি গাছে প্রায় ৭-১০টি পাতা থাকে। নারিকেল পাতার ন্যায় প্রতিটি পত্রে বিপরীতমুখী জোড়ায় জোড়ায় প্রায় ৬০ থেকে ১২০টি পত্রক বা লিফলেট থাকে। পাতা ৪ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা ও প্রায় ১.৫-২.০ মিটার চওড়া হয়ে থাকে। প্রতিটি লিফলেট ২.৫ – ৫.০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হয়ে থাকে। চারার বয়স ৪-৫ বছর হলে পাতা সংগ্রহ করা শুরু হয়। প্রতিবছর ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সংগ্রহের কাজ চলে। প্রতি গাছ হতে ৩-৫টি পাতা সংগ্রহ করা হয়। অর্থাৎ সংগ্রহের সময় প্রতিটি গাছে দু’টি পাতা রেখে বাকি পাতা কাটা হয়।
গোলপাতার ফুল ‘মনোসিয়াস’ ও ‘স্প্যাডিক্স’ জাতীয়। প্রায় সারা বছর ফুল হতে দেখা যায়। তবে ফেব্রুয়ারি হতে এপ্রিল মাসের মধ্যে ফল পাকে। স্প্যাডিক্স ১-১.৫ মিটার লম্বা হয়ে থাকে। ফুলের মাথার অংশের ব্যাস প্রায় ৩০ সেঃমিঃ হয়ে থাকে। প্রতিটি কাঁদিতে প্রায় ৫০-১২০টি ফল বীজ থাকে। প্রতিটি ফলের ওজন প্রায় ৫০ হতে ১০০ গ্রাম। ফল অপক্ক অবস্থায় বাদামি ও পরে কালচে বর্ণের হয়ে থাকে। বীজের আকৃতি অনেকটা গোখরা সাপের ফনার মতো। প্রতিটি বীজ ১২-১৬ সেঃমিঃ লম্বা হয়। সুন্দরবনের গোলপাতা সংগ্রহের কাজে মৌসুমে প্রায় ৩০ হাজার লোক প্রতি বছর নিয়োজিত থাকে। যদিও বাঘের আক্রমণের কারণে গোলপাতা সংগ্রহ করা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। তথাপিও জীবন ও জীবিকার তাড়নায় এতো অধিক সংখ্যক লোক এ পেশায় নিয়েজিত থাকে। এতে সুন্দরবনের সন্নিহিত তিনটি জেলা (খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা) কর্মসংস্থানে একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। খুলনা অঞ্চলে গোলপাতা সংগ্রহের জন্য বহু ব্যবসায়ী নিয়োজিত থাকেন। আর এ কারণে নৌকার মালিক ও মাঝিরা সহজে উপর্জনসহ শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে সক্ষম হয়। নদী পথে গোলপাতা পরিবহনে ছোট বড় সব মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার নৌকা ব্যবহৃত হয়। বহুমুখী ব্যবহার ও সহজলভ্যতার করণে খুলনা ও বরিশাল বিভাগে প্রায় ১৬টি জেলার দরিদ্র ও নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের ঘরবাড়ি ও আশ্রয়স্থল নির্মাণে গোলপাতা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সুতরাং সুন্দরবনের গোলপাতা অর্থনৈতিক দিক হতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপরন্তু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবনের গোলপাতার অবদান অনস্বীকার্য।
গোলপাতার গুরুত্ব সর্বাধিক ব্যবহার মূলতঃ এর পাতার অংশ বিশেষের জন্য। তুলনামূলক কম দাম ও অধিক টেকসই হবার কারণে বিভিন্ন প্রকার ঘরের ছাউনির কাজে গরিবের ঢেউটিন হিসেবে হিসেবে খ্যাত, গোলপাতার জুড়ি নেই। ঘর ছাউনির কাজে গোলপাতার সর্বাধিক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এ দ্বারা কুড়ে ঘর, গোলাঘর, চালাঘর, গোশালা, কাঠগোলা, নৌকার ছাউনি, দোকান প্রভৃতির ছাউনির কাজ করা হয়। ছাউনি ছাড়াও রান্নার জ্বাল ধরাতে শুকনো পাতা ব্যবহার হয়। পাতার ডাটা জ্বালানি হিসেবেও বেড়া নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। মাছ ধরার জন্য উপযুক্ত আশ্রয়স্থল তৈরির কাজে পাতা ব্যবহৃত হয়। এছাড়া পাতার ডাঁটা, মাছ ধরার সময় জালে ভাসিয়ে রাখার জন্য জেলেরা ব্যবহার করে থাকে। গোলপাতার সাহায্যে ছাতা, সানহ্যাট, রেইনকোর্ট, ঝুড়ি, মাদুর, থলে, খেলনা প্রভৃতি তৈরি করা হয়। গোলফল অনেকটা তালের মতো। কচি ফলের শাঁস খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই শাঁস খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু। গাছের মাথি বিশেষভাবে রান্না করে করে সুস্বাদু খাদ্য তৈরি করা যায়। গোলগাছের মঞ্জুরী হতে রস সংগ্রহ করা যায়। এই রসে শর্করার পরিমাণ শতকরা প্রায় ১৮ ভাগ। যা চিনি তৈরিতে ও টনিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়াও রস হতে ভিনিগার তৈরি হয়। গোলের ব্যবহার এখন সারা বিশ্বে ক্রমশঃ জনপ্রিয় হচ্ছে। কানাডার বিজ্ঞানীরা গোলগাছের রসের মদ এবং পেট্রোল যথাক্রমে ২৫ ভাগ ও ৭৫ ভাগ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে জ্বালানী যেমন সাশ্রয় হচ্ছে পরিবেশ দূষণও হচ্ছে কম। পাপুয়া নিউগিনিতে এর রস থেকে দামী ভিনিগার তৈরি করছেন।
পরিশেষে বলা যায়, সুন্দরবনের গোলপাতা হতে প্রতিবছর প্রায় কোটি টাকার রাজস্ব অর্জিত হয় এবং বিস্তীর্ন এলাকার লাখ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়। দিন দিন গোলপাতার চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি বছর সুন্দরবন থেকে যে পরিমাণ গোলপাতা কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সে তুলনায় বর্তমানে আবাদ করা হচ্ছে না। তাছাড়া সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেও ধ্বংস হচ্ছে গোলগাছ। তাই অতি মূল্যবান অর্থকরী সম্পদ গোলগাছের ব্যাপক আবাদ ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া অতি জরুরি। তাছাড়া শুধু সুন্দরবনের উপর নির্ভর না করে বাড়ির আশে-পাশে নিচু নদী – খাল পাড়ে, নিচু জলাশয়ের ধারে গোলপাতা উৎপাদনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।
লেখক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপজেলা কৃষি অফিস, রূপসা, খুলনা।