কবিতার তৃতীয় শ্রেণির পাঠক


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯ ||

তৈমুর খান

কবিতার সেকেলে ধারণা নিয়ে কবিতার তৃতীয় শ্রেণির পাঠক জন্ম নেয়। স্কুল-কলেজের সিলেবাস মার্কা দৌড়, রাবীন্দ্রিক বলয়ের ঘুরপাক খাওয়া উপগ্রহ এবং কবিতা চর্চায় নিজস্ব তৃতীয় শ্রেণির জগৎ তৈরি করে এরা বসবাস করেন। কখনও আঞ্চলিক কোনও সংস্কৃতি কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে কূপমন্ডুকীয় ধারণায় এক কৃত্রিম করিশমা জাহির করেন। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে যখন কবিতা চর্চায় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার হিড়িক পড়ে গেছে তখন এই শ্রেণির পাঠক সংখ্যাই বেশি। নিতান্ত খারাপ সময় বলেই কবিতায় মিশে যাচ্ছে ইগোটিজমের বিপুল অ-সাধনা।

এইসব কবিদের তৃতীয় শ্রেণির পাঠক কেন বলব?
কবিতা যদি আনন্দের প্রকাশ হয় তা হলে সেই প্রকাশের মধ্যে একটা উত্তরণ খুঁজে পাওয়া যায়। স্রষ্টা নিজেকে প্রকাশ করার মাধ্যম হিসেবেই কবিতাকে বেছে নেয়। কবিতা ঘন্টা বাজিয়ে আসে না। কবিতার কোনও পূর্ব প্রস্তুতি নেই। অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ শব্দে প্রতিফলিত হলে লয়ে-মাত্রায় আন্দোলিত হলে কবিতা হয়ে ওঠে। সুতরাং কবিতা বিষয়ের বিবৃতি নিয়ে কিংবা পথ-সভার সেøাগান হয়ে ফেটে পড়ে না। দুর্জ্ঞেয় মানসলোকের নিরন্তর পর্যবেক্ষণ থেকে দীক্ষিত হয়ে বেরিয়ে আসে। সুতরাং ব্যক্তির স্বপ্নটি সেখানে মর্যাদা পায়। তার অন্ধকার দশা কোন্ আকুতি নিয়ে স্পন্দিত হতে চায়, আলোকিত হতে চায় তা কেবল ¯্রষ্টাই জানেন। অতএব কবিতায় অধরা, অস্পষ্টতা, অসংলগ্নতা এবং অপ্রমেয়তা মিশে থাকেই। সেই কারণে অনেক সময় বিষয় না-থেকে বাজনার ব্যাপ্তিটাই বড় হয়ে ওঠে।

তৃতীয় শ্রেণির কবিতা পাঠক কবিতার ভেতর যখন বিষয় খুঁজে পান না, কবির অধরা, অপ্রমেয়তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারেন না, ব্যক্তির খোলসে যখন নৈর্ব্যক্তিক অনুভূতির মিশেল ঘটাতে পারেন না তখন মুখ ফিরিয়ে পেছন দিকে হাঁটেন। হয়তো ফিরে যান রবীন্দ্রনাথে, ফিরে যান সিলেবাসের নির্বাচিত জীবনানন্দে। মোল্লার দৌড় ওই মসজিদ পর্যন্তই। আবৃত্তিকার-সাংবাদিক-কবিরা ঘুরেফিরে জয় গোস্বামীর সাক্ষাৎকার নিতে এসে তিনটি কবিতার কথাই বারবার বলেন
১. নুন
২. মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়
৩. মেঘবালিকার জন্য রূপকথা
বহুবার পঠিত। বহুবার আলোচিত এই কবিতাগুলি নিয়ে একই কথা বলতে শুনি। সেইসঙ্গে শুনি সুবোধ সরকারের ‘রূপম’ কবিতাটির কথাও।

হে কবিতার পাঠক, কবি প্রতিভার কোনও একটি সময় এই সহজ কবিতাগুলি বেরিয়ে এসেছে কবিদের কলমে। আবৃত্তিকারদের কণ্ঠ টপাস করে তুলে নিয়েছে এগুলিকে। আর তাতেই এরা বিখ্যাত হয়ে গেছে। কিন্তু এই কবিদেরই আরও বহু কবিতা ছিল, সেগুলির কথা একবারও ওঠে না। পাঠক যখন তার প্রকৃত মনন হারিয়ে ফেলে, কবিতায় আত্মমগ্নতার ধার ধারে না, তখন সহজবোধ্য, বিবৃতিমূলক, সেøাগানধর্মী কবিতাতেই প্রতিভার দীপ্তি দেখতে পায়। নিজের দৌড়টুকু বোঝার ক্ষমতা থাকে না। ভাবে, কবিতা হবে নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ লেখা আবেগের মতো। কবিতা হবে রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’র মতো। কবিতা হবে ভিয়েতনামের সৈনিকদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মন্ত্রের মতো। শোষক ও শোষিতের বাস্তব চিত্র, কিংবা জীবনানন্দের ‘রূপসীবাংলা’র মতো। ঘুরেফিরে সেই একই সিলেবাস, একই সাজেশন, একই নোটস্। কবিতা তাদের কাছে বৈচিত্রহীন, আন্দোলনহীন, নতুনত্বহীন ডানাওয়ালা পিঁপড়ের মতো, স্তিমিত, মৃত্তিকাগামী, গর্তচারী ।

মোটকথা তৃতীয় শ্রেণির পাঠক এক ঝাঁক পায়রার মতো গড্ডালিকা প্রবাহী জাতক-সাঁতারু। এরা সমুদ্র নয়, নদী নয়, এঁদো পুকুরের পশ্চাদগামী মননহীন প্রাণি। জল ছিটিয়ে পাঁক মেখে চির শুভ্রতার গর্ব অনুভব করেন। শিক্ষক, অধ্যাপক থেকে শুরু করে ছাত্র-কবি-সম্পাদক অনেকেই এই দলে থাকেন। তাদের চোখের সামনে যখন তুলে ধরা হয় রবীন্দ্রনাথের “আরোগ্য” কাব্যের একটি কবিতা

‘একা বসে সংসারের প্রান্ত জানালায়
দিগন্তের নীলিমায় চোখে পড়ে অনন্তের ভাষা।’

তখন এই শ্রেণির কবিতা পাঠকরা ‘সংসারের প্রান্ত জানালা’ কী তা জানেন না। ‘দিগন্তের নীলিমায়’, ‘অনন্তের ভাষা’ও তারা পড়তে পারেন না। এরকম বহু পংক্তি রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ছড়িয়ে রয়েছে, যা ‘দুই বিঘা জমি’র বাবু ও উপেনের বেড়া ডিঙিয়ে অনন্ত সভ্যতায় মানুষের চিরন্তন বাণী হয়ে উঠেছে। ঠিক তেমনি জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসীবাংলা’র মৃত্যু এবং প্রকৃতির ধূসর ছায়া-মাখা থেকে বেরিয়ে আর এক জগতের ঠিকানায় পৌঁছাতে পারলে তাঁকে জানার সুবিধা হত

‘আমলকী গাছ ছুঁয়ে তিনটি শালিক
কার্তিকের রোদে আর জলে
আমার হৃদয় দিয়ে চেনা তিন নারীর মতন
সূর্য? নাকি সূর্যের চপ্পলে’

এই পাঠকেরা আমলকী গাছের খোঁজ রাখেন না। তিনটি শালিকের সঙ্গে হৃদয়ের তিনটি নারী তারা সূর্য, নাকি সূর্যের চপ্পল পায়ে দিয়ে পৃথিবীতে এসেছে পাঠক জানতে চায় না। যেখানে বিষয়ের সহজ লভ্যতা নেই, কিংবা যে কবিতা সিলেবাসে ছিল না ÍÍতা নিয়ে পাঠকের ভাবনার সময় থাকে না। সুতরাং আজকের কবিতা আন্দোলন এইসব কবিতা পাঠকের দরজায় কড়া নাড়তে পারে না।

তেমনি জয় গোস্বামীর ‘নুন’, ‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’ এবং ‘মেঘবালিকার জন্য রূপকথা’. ছাড়াও অনেক অনেক কবিতা আছে যেগুলির কথা উক্ত পাঠকদের মুখে একবারও শুনি না। ‘ভুতুম ভগবান’, ‘ঘুমিয়েছ ঝাউপাতা’ ‘ও: স্বপ্ন!’, ‘পাগলী, তোমার সঙ্গে’, ‘বজ্রবিদ্যুৎ-ভর্তি খাতা’, ‘পাখি, হুস’-এর মতো দুর্দান্ত কবিতাগুলি। এগুলিতে জয় গোস্বামীর প্রতিভা কতখানি বিস্ময়কর তার কিছুটা নিদর্শন মিলবে। অথচ কাব্যের কবিতাগুলি আলাদা বৈশিষ্ট্যে ও মাধুর্যে সমন্বিত ও উদ্ভাসিত। যেমন ‘বজ্রবিদ্যুৎ-ভর্তি খাতা’ কাব্যের ‘ভোজবাজি’ কবিতায় লেখেন

‘আর সাজাবো কানার পাশে খোঁড়া
আর দেখাব হাতপোড়া রন্ধন
আর মেলার সইপুতুলের জোড়া
মানবো না আর মানবো না বন্ধন
আর শোয়াব শিলের বুকে নোড়া
আর দেখাব বরবধূ রং-ঢং
মুড়ি়য়ে দেব হিংসে গাছের গোড়া
মানবো না আর মানবো না বন্ধন”

তখন ছন্দ-লয়ের দোলায় আমরা কীরকম দুলতে থাকি তা পড়লেই অনুভব করা যায়। আমাদের শত অসামঞ্জস্যতায়ও আবেদনের মাধুর্যের রেশ শেষ হয়ে যায় না। কারণ কবিতার শেষ স্তবকে কবি বলেন

‘আর নেভাব প্রেমের জ্বালাপোড়া
দেব তোমার আঘাতে চন্দন
ফেরাব ঢিল অন্ধকারে ছোঁড়া’

এখানেই কবিতাটির উত্তরণ ও মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়। ‘পাখি, হুস’ কাব্যের ‘প্রেম’ নামের একটি চার পংক্তির কবিতায়ও জীবনের আবেদন মারাত্মক

‘আজ যেখানে রক্ত রাখো
কাল সেখানে তৃণ
কুড়িয়ে নিয়ে গিয়েছি সব
বলিনি একদিনও!’

কবি তো নিঃশব্দে রক্ত এবং তৃণ দুই-ই কুড়িয়ে নিয়ে যান। প্রেম তো তাই-ই। এভাবেই জয়ের কবিতার বিশাল সমুদ্র ছড়িয়ে থাকে। তার কয়েক বিন্দু আবৃত্তিকারদের দৌলতে আমাদের কানে বাজে। আর সেসব নিয়েই তৃতীয় শ্রেণির কবিতা পাঠকেরা তাদের জানার সীমানাকে সংকুচিত করে ফেলেন। বাকি কবিতা পড়ার প্রয়োজন মনে করেন না।

সুবোধ সরকারের ‘রূপম’ কবিতায় ‘রূপমকে একটা চাকরি দিন’ আবেদনটি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। বাস্তব দিক থেকে কবিতাটি আমাদের মনের দরজায় করাঘাত করে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে সুবোধ সরকার একটিই ভালো কবিতা লিখেছেন এ ধারণা উক্ত পাঠকেরা কেন পোষণ করবেন? এর কোনও সদুত্তর পাইনি। তা ছাড়া কবিতাটির ভেতর যে দর্শন আছে পাঠক কি তারও ঠিকানা জানে? সুবোধ সরকার যখন ‘আড়াই হাত মানুষ’ কাব্যের একটা ছোট্ট কবিতায় বলেন,

‘ভালোবাসা কুয়াশায়, কুয়াশাকে পান করি, খাই
আমি যেন এ জীবনে কুয়াশাকে লিখে রেখে যাই।’

তখনই মানবজীবনের জটিল ক্রান্তিকাল নির্দেশিত হয়। বাহ্যিক চাওয়া-পাওয়ার ভেতর লুকানো থাকে সেই কুয়াশা যা হয়তো জীবনানন্দের কাব্যে ‘উটের গ্রীবার মতো’ আমাদের জানালায় এসে দাঁড়ায়। পাঠক খোঁজ রাখে না এই কুয়াশারও। এইভাবেই কিছু কিছু কবিতা দুর্বল পাঠকের ভাললাগার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এদের শিল্পীর মানসলোক বোঝার সামর্থ্য থাকে না। ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এমনকী সামাজিক অবক্ষয়ও অনুধাবন করার বোধ গড়ে ওঠে না। ফুরফুরে বাতাস আর পোশাকের নান্দনিক ঔজ্জ্বল্যে এরা হাইব্রিড প্রজন্মের কবি-পাঠক হয়ে সভ্যতার ক্রান্তদর্শী রূপে নিজেরা উচ্ছ¡াস প্রকাশ করে। কী তীব্র দহন আর নিঃসঙ্গের হাহাকার যখন মানুষকে অস্তিত্বের ধ্বংসস্তূপে ঠেলে দেয়, তখন কবি কী লিখতে পারেন? যা লিখতে পারেন তা শুধু আত্মিকসংকট থেকে বেঁচে থাকা তথা টিকে থাকার সংকটকেই। অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছেন

‘ও ংধি ঃযব নবংঃ সরহফং ড়ভ গু মবহবৎধঃরড়হ উবংঃড়বুবফ নু সধফহবংং, ংঃধৎারহম যুংঃবৎরপধষ হধশবফ.’

সুতরাং ঐতিহ্য মুছে গিয়ে সময়ের স্বাক্ষর নিয়ে কবিতার সৃষ্টিধারা। কবিতা যেন উৎসবের নয়, ভালো থাকার নয়, কবিতা যেন ধ্বংস আর কালবেলার ; ইতিহাস আর রক্তের, মরণ আর জীবনের। কবিতার পাঠক আবেগের উদ্বেল কণ্ঠস্বরে কবিতাকে পেতে চায়। যেখানে মনন নেই, ফ্রয়েড নেই, জীবনের একান্ত নিঃসঙ্গতার স্তব্ধতা নেই, রূপক এবং সাংকেতিক বিনির্মাণে কবিতায় অসংলগ্নতা আসে না, ভাবের অস্পষ্টতায় কুয়াশা সৃষ্টি করে না, মেধার ইন্টেলেকচুয়াল পরিচয় নেই ÍÍসেই ধরনের কবিতা এই শ্রেণির পাঠকের কাছে জনপ্রিয় ওঠে। দুঃখের বিষয় এদের সংখ্যাই বেশি। আর এই কারণেই ¯্রষ্টার সৃষ্টি এখনও সেই আলোয় আলোকিত হয় না।