৭৬ তম জন্মস্টেশনে কবি আসাদ চৌধুরী/সালেম সুলেরী


প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯ ||

 

 

জীবনের উপান্তে যেন নিজেকে দ্বিখন্ডিত করলেন। অনেকের চোখে আধা স্বদেশী, আধা প্রবাসী। ছিলেন বাংলাদেশের কবি-পরিব্রাজক। পান বা তাম্বুলপ্রিয় সহজকাব্যের প্রিয়মুখ। ভারতবাংলাতেও বাউল-বৃত্তান্তের বরপুরুষ। অথচ জীবনের অনুষঙ্গে যোগ হয়েছে প্রবাস। শীতপ্রধান কানাডাতেও প্রবাসবাংলার উজ্জল ব্যক্তিত্ব।

 

২০০৩-এর ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনবাংলা’র অভিযাত্রা। (বাংলাদেশ-ভারত-প্রবাসবাংলা’র সাহিত্য-সংস্কৃতি-প্রধান সংগঠন)। কিংবদন্তী ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন ছিলেন প্রধান অতিথি। সম্মানিত অতিথির আসনে একুশে পদকপ্রাপ্ত চার কৃতবিদ্য। সর্বকবি আসাদ চৌধুরী, আল মুজাহিদী, নির্মলেন্দু গুণ। মূল প্রবন্ধসহ মুহম্মদ নূরুল হুদা। সভাপতিত্বে আমি (সালেম সুলেরী, কবি)।

 

‘তিনবাংলা’ আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অনুপ্রেরণা-আসাদ চৌধুরী। স্বদেশবাংলার উল্টোপিঠে প্রবাসবাংলার বাতিঘরও তিনি। একজীবনে অনেক সান্নিধ্য-শাসন পেয়েছি। রক্তের অধিক এই সাহিত্যসাধকের অভিভাবকত্ব। এক বিছানায় ঘুমিয়েছি, নৈকট্য দেখেছি। রাতভর ভাবেন-হাঁটেন, ভোররাতে বিছানা নেন। অসাধারণ সব বক্তব্য দেন অনুষ্ঠানাদিতে। আর কবিতা-৮৬ ভাগ সহজ মানুষের জন্যে। সামন্তমুক্ত মাঠ-মানুষের  প্রিয় কবি তিনি। ‘ওদের হাতে ঘড়িতো নেই, সূর্য ওদের ঘড়ি’। ক’জন কবির এমন করে দেখবার চোখ আছে? শহীদ বুদ্ধিজীবী বা যুদ্ধশহীদদের প্রতি কি আকুলতা! ‘তোমাদের যা বলার ছিলো বলছে কি তা বাংলাদেশ?’

 

আমার সম্পাদিত দুটো স্মারক সংকলনে লিখেছেন তিনি। বাংলাদেশের ছড়ার প্রথম এনসাইক্লোপেডিয়া। ১৯৮৩-৮৪ সালে ঘটে প্রামাণ্য প্রকাশনা। ‘কবিতা ও তার পটভূমি’ সংকলনেও লিখেছেন। ২০০২-এ সাদাকালো’র আয়োজনে লিখেছেন কবিতার নেপথ্য গল্প।

 

অগ্রজ আসাদ চৌধুরীকে নিয়ে গল্পের শেষ নেই। স্মারকগ্রন্থে দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছি স্মৃতিগল্প সমেত। সূচনা ও শেষ পর্বে রয়েছে ভিন্ন স্বাদ। ১১ ফেব্রুয়ারি ৭৬তম জন্মস্টেশনে প্রিয় কবি। কবিতার টিকেট নিয়ে আরোহণ করছেন আয়ু-বায়ুর ট্রেনে। গন্তব্য নিশ্চিত হোক- কাঙ্খিত ‘শতাব্দী এক্সপ্রেসে’।

স্মারক প্রবন্ধ থেকে দুটি চুম্বকাংশ:

‘আসাদ চৌধুরী’ নামটির সঙ্গে পরিচয় ১৯৭১ সালে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার হলদিবাড়িতে। সেই যুদ্ধবর্ষে আমরা তখন শরণার্থী। তবে বসবাস শরণার্থী শিবিরে নয়, পরিত্যক্ত বাড়িতে। বাবার দ্বিতীয় বোনের বিয়ে হয়েছিলো হলদিবাড়িতে। ১৯৪৭-এর পূর্বে, পাক-ভারত বিভাজনের আগে।  ফুপুর বোনজামাই অমর গায়ক আব্বাসউদ্দীন আহমদ। ফুপা পরিবারসহ থাকেন গ্রামে, প্রধান পাড়ায়। হলদিবাড়ি শহরে ছিলো একটি পরিত্যক্ত বাড়ি। উদ্বাস্তু হিসেবে সেই আবাসনে আমাদের ঠাঁই হয়। আমার বয়েস তখন ১০ ও ১১-এর মধ্যিখানে।

আমাদের চিত্তে তখন ভয়, আশংকা, দেশের চিন্তা। কিন্তু হাতে খরচের মতো সময়ের অভাব নেই। পাঠের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব শৈশব থেকেই। ঐ সময়ে হলদিবাড়িতে একটি বই নিয়ে কাড়াকাড়ি। বই মানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিষয়ক সংকলন। লাল প্রচ্ছদ, প্রতিবাদী নাম ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’। প্রকাশ করেছে কলকাতার (পরে বাংলাদেশের) মুক্তধারা প্রকাশনী। তাতে দারুণসব লেখা লিখেছেন ‘পূর্ব পাকিস্তানে’র লেখকেরা। তারাও নাকি কলকাতা শহরের শরণার্থী। শুনে আমরা ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হলাম। আগ্রহভরে নামগুলোর দিকে তাকালাম। আনিসুজ্জামান, সৈয়দ আলী আহসান, আহমদ ছফা। আবার রামেন্দু মজুমদার, কামাল লোহানী, আসাদ চৌধুরী।

 

সংকলনটি মুক্তধারা’র পক্ষে প্রকাশ করেছেন চিত্তরঞ্জন সাহা। সবগুলো লেখাতেই স্বাধীনতার প্রত্যাশা। পাকিস্তানের শাসন থেকে মুক্তির আকুলতা। আসাদ চৌধুরী সেরকমই প্রতিবাদী গদ্য লিখেছিলেন। লেখক পরিচিতির স্থানে লেখা ছিলো- কবি, অধ্যাপক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পড়তেন কবিতা ও কথিকা। সে সবেরই আলোছায়া পড়েছিলো বারুদ মাখানো কবিতায়-

 

নদীর জলে আগুন ছিল আগুন ছিল বৃষ্টিতে

আগুন ছিল বীরাঙ্গনার উদাস করা দৃষ্টিতে।

…………………………………..

এখন এসব স্বপ্নকথা দূরের শোনা গল্প,

তখন সত্যি মানুষ ছিলাম এখন আছি অল্প।

 

(তখন সত্যি মানুষ ছিলাম/আসাদ চৌধুরী)

 

কবি আসাদ চৌধুরী বিষয়ে আরেকটি তথ্য প্রণিধানযোগ্য। যতোই প্রাঞ্জল হোক, একটি বিষয়ে একেবারেই লজ্জাবতী লতা। সেটি হলো-‘প্রিয়দিন জন্মদিন’ প্রতিপালন। ২০০৪-এ জানলাম, জীবনে কখনো এ কাজটি করেননি। আমরা খুঁজতে থাকলাম-আর কারা এ-রোগে ভোগেন। জানলাম, মহাপদ্যকার-কলামিস্ট ফয়েজ আহমদ। ষাট দশকের নিভৃতচারী কবি-সাংবাদিক আবু কায়সারও। আমরা আর বিন্দুমাত্র বিলম্ব করলাম না। ১১ ফেব্রুয়ারি আসাদ চৌধুরীর ৬০ তম জন্মতিথি। ‘হিরক জয়ন্তী’ পালনের ঝিনুক মুহূর্ত যেন। জন্মেছিলেন ১৯৪৩-এ বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে। অন্যদিকে কবি আবু কায়সারের জন্ম ১৯৪৫-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি। ‘আমি খুব লাল একটি গাড়িকে’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থের লেখক। আমরা একযোগে কবিতার দুই বরপুত্রকে শুভেচ্ছাভিনন্দন জানালাম। তোপখানা রোডস্থ আমাদের নিউজব্যাংক হলে আয়োজন। তিনবাংলা ও একাধিক সাহিত্য সংগঠন উদ্যোক্তা। প্রধান অতিথি করা হলো চিরকুমার লেখক ফয়েজ আহমদকে। সভাপতিত্ব করতে দেওয়া হলো আমাকে। এই নির্বাচনের নেপথ্যেও কারণ রয়েছে। আমিও ঢাকার জীবনে কখনও জন্মদিন পালন করিনি। অসংখ্য সাহিত্য-বান্ধব মানুষের জন্মদিনের উদ্যোক্তা। অথচ নিজেকে গুটিয়ে রাখি শামুক বৈশিষ্টে।

 

সতীর্থরা বলেন, সেদিন আমরা ইতিহাস গড়েছিলাম। জন্মদিনবিমুখ কবি আসাদ চৌধুরীকে বরণ করেছি। জন্মস্মারকের মাল্য দিয়ে বরণমালা পরিয়েছি। করকমলে যথাসাধ্য স্মারক উপহার তুলে দিয়েছি। প্রথা মেনে প্রদীপ জ্বেলে কেকও কেটেছি। একই কর্মে জড়িয়েছি আরও তিন সমার্থবাদীকে। তিনজনই কবি-পদ্যকার-সাংবাদিক পদবাচ্যধারী। যথাক্রমে ফয়েজ আহমদ, আবু কায়সার, সালেম সুলেরী। ২০০৪-এর উদ্যোগটি হয়তো একদিন ইতিহাস হবে।

 

জীবনচক্রে জন্মতিথি আসবে, যাবেও। স্মৃতিপ্রদ সেই আয়োজনের দু’জন প্রয়াত হয়েছেন। প্রিয়-শ্রদ্ধেয় ফয়েজ আহমদ, আবু কায়সার। নিয়তির ডাকের অপেক্ষায় আসাদ ভাই, আমি।

 

জন্মদিন বা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে প্রায়শ পদ্য পড়ি। লেখক, সৃষ্টিকর্মীর বৈশিষ্ট নিয়ে চার পংক্তির নিবেদন। কবি আসাদ চৌধুরীর প্রথম জন্মতিথি পালনকালে রচিত। এখন সেটি যেন সার্বজনীন সম্পদে পরিণত হয়েছে-

 

জীবনের কাছে পরাজিত তাই বয়েস হচ্ছে লীন,

টুকরো টুকরো ঝরছে মানুষ এলেই জন্মদিন।

ঝরতে ঝরতে অবশেষে হয় জীবনের পারাপার,

তাই দিয়ে যায় স্মৃতির শব্দ আগামীকে উপহার।