নারীদের পাশাপাশি ঘরের কাজ পুরুষেরও


প্রকাশিত : মার্চ ৮, ২০১৯ ||

ন্যাশনাল ডেস্ক: নাঈমা নীতু কর্মজীবী নারী। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বড় পদে চাকরি করেন। বেশ খুশি মনে গল্প করেন, তার স্বামী রাশেদ হাসান ঘরের কাজে তাকে সহায়তা করেন। নাঈমাকে প্রশ্ন করা হয়, রাশেদ আপনার কী কী কাজ করে দেন? তিনি বলেন, শুক্রবার বই গোছানো, আসবাবপত্র মোছা, কখনও কখনও ভাত রান্না করা, রান্নাঘর পরিষ্কার রাখার কাজ করেন। আবারও নাঈমাকে প্রশ্ন করা হয়, এসব কাজ আপনার এটা কে বললো, এই কাজগুলোতো আপনাদের দুজনেরই। তাহলে কেন ভাবছেন আপনার কাজ করছে রাশেদ। নাঈমা কিছুক্ষণ ভাবেন, ভেবে বুঝতে পারেন, ভাবনায় ভুল ছিল তার। রাশেদ তার কাছে সহায়তা করছেন এমন না, বাসার এই কাজগুলো তাদের দুজনেরই।

নারী নেত্রী, অ্যাক্টিভিস্ট, অ্যাকাডেমিশিয়ানরা বলছেন, এ বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ তোলাটা জরুরি। যে পুরুষ ঘরের কাজ করছেন, তিনি দায়িত্বের জায়গা থেকে করছেন, নাকি নারীর অনুপস্থিতিতে কাজটা করতে বাধ্য হচ্ছেন, সেটিও বিবেচনার বিষয়। তবে কোনও ‘বিশেষণ’ দিয়ে পুরুষদের কাজকে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য তাদের।

সবকিছু বিবেচনায় এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘সবাই মিলে ভাবো, নতুন কিছু করো, নারী-পুরুষ সমতার নতুন বিশ্ব গড়ো’।

সমাজ গবেষক ও রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের মেঘনা গুহঠাকুরতা মনে করেন, বাসার কাজ পুরুষরা বাধ্য হয়ে করছেন কিনা সেটি বিবেচনায় নেওয়ার বিষয় রয়েছে।’ অ্যাকশন এইড এর একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গাইবান্ধায় গ্রাম সমাজে দেখা গেছে, দিনের ১২ ঘণ্টার মধ্যে নারী সাত ঘণ্টা বিনামজুরের কাজ করছে। সেখানে পুরুষেরা ঘরের কাজ করছে ১২ ঘণ্টায় দেড় ঘণ্টার মতো। তাও আবার দায়িত্বের জায়গা থেকে করছে এমন নয়। বাসায় নারী সদস্য না থাকালে অনেকটা বাধ্য হয়ে।’

শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এই কাজ করাটা ‘গ্ল্যামার জব’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি করপোরেটাইজেশনের সঙ্গে যুক্ত। যেখানে শ্রেণিবিভাজন আছে। পুরুষদের এটা গ্ল্যামার হিসেবে দেখানও হচ্ছে, তার দায়িত্ব হিসেবে না। করপোরেটাইজেশন এক ধরনের ‘ভুয়া সমতা’র ভাবনা নিয়ে এসেছে। অন্যের কাজ ভেবে রান্না বান্না করা, সুপারমার্কেটে গিয়ে বাজার করে আনা এক ধরনের সমতার আভরণ আনছে, যেটা আসল সমতাকে প্রতিষ্ঠা করে না।’

এই মানসিকতা পরিবর্তনে আলাপগুলো তোলা খুব জরুরি উল্লেখ করে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট বাকী বিল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই মানসিকতা দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হয়েছে। আমাদের জাতিগত অন্যান্য বিষয়, জেন্ডার ইস্যু নিয়ে সাধারণ যে ধারণা প্রতিষ্ঠিত, সেসবও এর সঙ্গে জড়িত। এটা বদলাতে সময় লাগবে, তবে আলাপ হওয়া দরকার। কী আলাপ এবং কারা করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাসার কাজটা যে কেবল নারীর না, পুরুষ যখন কাজ করছে, সেটা যে তার নিজের এটিই অনেক পুরুষের মাথায় থাকে না। কথা বললে এই সূক্ষ্ম জায়গাগুলো চিহ্নিত হবে।’

কর্মজীবী নারী সকালে পরিবারের সদস্যদের সব চাহিদা পূরণ করে তারপর কাজে বের হন। কিন্তু বছরের পর বছর ঘরের ও বাইরের কাজ করতে করতে নারীদের মধ্যে ভাবনা তৈরি হয়েছে, দুটই তারই কাজ। এসব বিষয় নিয়ে আলাপ তুলতে হবে। রাষ্ট্র একটা কর্মসূচি নিয়ে এটা করে দেবে, এমনটাও হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে ঠিক কোথায় আঘাত করলে এই ভাবনার জগতে পরিবর্তন আসবে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। নারীদের অন্যান্য ইস্যু নিয়ে যারা কাজ করেন তারা মানসিকতা বদলানোর কাজের উদ্যোগ নিতে পারেন।

কোনও রকম বিশেষণ না দিয়ে পুরুষের কাজটি দৃশ্যমান করা দরকার উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি কাবেরী গায়েন বলেন, ‘সমাজে নতুন ধারণা, নতুন কোন কাজ এলে মানুষের মেনে নিতে সময় লাগে। তখন যত বেশি অংশগ্রহণ হবে, সেটার মধ্য দিয়ে ওই নতুন বিষয়টি স্বাভাবিক হবে। এটা আদেশ দিয়ে হবে না। সচেতনভাবে স্বাভাবিক করে তুলতে পারলে তখন আর চোখে লাগবে না। তবে সেটা স্বাভাবিকভাবে করতে হবে, পুরুষের এই কাজের প্রয়োজনীয়তাকে চিহ্নিত করতে গিয়ে কোনও বিশেষণ যোগ না করলে ফল ভিন্ন হতে পারে। পুরুষরা ঘরের কাজ করছে, কোনও বিশেষণ ছাড়া এটি দৃশ্যমান করে তুলতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নানা আন্দোলন সংগ্রামের ভেতর থেকে একটা জায়গায় আসা গেছে যে, ছেলেরাও কাজ করে। তাই তাদের বিশেষভাবে দেখানোর প্রবণতা আছে। এই দেখানোর মধ্যে যে জিনিস বের হয়ে আসে তা হলো, নারী যে কাজটা বছরের পর বছর করে চলেছে সেটার অদৃশ্যমানতা এবং তার বিপরীতে পুরুষদের করার দৃশ্যমানতা। যে যার কাজ করবে এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। যেহেতু তাদের করার হার কম, তাই দেখার যোগ্য একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।’