উন্নত মানব সম্পদ গঠনে পুষ্টি


প্রকাশিত : মার্চ ৮, ২০১৯ ||

মো. আবদুর রহমান
শরীর সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম এবং নিয়োগ রাখার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন। খাদ্যের সাথে পুষ্টির সম্পর্কে নিবিড়। যে প্রক্রিয়ায় খাদ্যদ্রব্য পরিপাক ও পরিশোধিত হয়ে দেহের কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেহের ক্ষয়পূরণ, পরিপোষণ, বৃদ্ধি সাধন এবং তাপশক্তি উৎপাদন করে তাকে পুষ্টি বলা হয়।
পুষ্টির ছয়টি উপাদান হলো-প্রোটিন, শ্বেতসার, ¯েœহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি। সকল মানুষের পুষ্টি উপাদানগুলোর চাহিদা এক রকম নয়। বয়স, লিঙ্গ (পুরুষ/মহিলা), পেশা (শারীরিক পরিশ্রম) ও শারীরিক অবস্থা (অসুস্থতা, গর্ভবতী/প্রসূতি) ভেদে বিভিন্ন লোকের জন্য বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের চাহিদা বিভিন্ন পরিমাণে হয়। শরীরের চাহিদা ও খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানের উপর নির্ভর করেই আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা তৈরি করতে হয়। যে খাদ্য তালিকায় সকল পুষ্টি উপাদান শরীরের চাহিদা অনুপাতে সঠিক পরিমাণে থাকে তাকেই সুষম খাদ্য বলে।
প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাদ্যকে শরীর বৃদ্ধি ও ক্ষয়গপূরক খাদ্য বলা হয়। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, সব ধরণের ডাল, সিমের বিচি প্রভৃতি আমিষ জাতীয় খাদ্য। এ খাদ্যগুলো বাড়ন্ত শিশুদের শরীর বৃদ্ধি ও মেধা শক্তির বিকাশ ঘটায়। প্রাপ্ত বয়স্কদের ভেঙ্গে যাওয়া কোষের ক্ষয়পূরণ করে। ভাত, রুটি, আলু, চিনি প্রভৃতি শর্করা জাতীয় খাদ্য এবং সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, ঘি এসব ¯েœহ জাতীয় খাদ্যকে তাপ ও শক্তিদায়ক খাদ্য বলে। এ খাদ্যগুলো আমাদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখে, দেহাভ্যন্তরের ক্রিয়াকান্ড অব্যাহত রাখে এবং কাজ করার জন্য শক্তি দেয়।
ভিটামিন শক্তিবর্ধন ও দেহ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশু, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের জন্য ভিটামিন ‘এ’ অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান। এর অভাবে স্বাস্থ্যে ও চোখের দৃষ্টি শক্তি ক্ষীণ হতে থাকে। এছাড়া শিশুদের রাতকানা রোগ ও চোখের ঘা হতে পারে। ভিটামিন ‘এ’ ত্বক হাড় ও দাঁতের গঠন ও সুস্থতার জন্য বিশেষ প্রয়োজন। সাধারণতঃ প্রাণিজ খাবারে ভিটামিন ‘এ’ বেশি থাকে। যেমন: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ছানা, দধি, মাখন ইত্যাদি। তাছাড়া গাঢ় সবুজ ও হলুদ রঙের শাক-সবজি ও ফলমুল প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায়। ফলমূলে বিশেষ করে পাকা আম, পেঁপে, কাঁঠাল, আনারস এবং শাক-সবজি যেমন- কচুশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, গাজর, টমেটো, মিষ্টিকুমড়া ইত্যাদিতে প্রচুর ক্যারোটিন থাকে। এ ক্যারোটিন হতে আমাদের দেহে ভিটামিন ‘এ’ সৃষ্টি হয়। ভিটামিন ‘এ’ কে দেহে গ্রহণোপযোগী করার জন্য খাদ্যে তেল ব্যবহার করা দরকার। থায়ামিন বা ভিটামিন বি-১ এর অভাবে বেরিবেরি রোগ হয়। এই রোগে শরীরে পানি জমে, হৃৎপিন্ড ও মস্তিস্কের কার্যক্ষমতা কমে যায়। চাল, গম ও ভুট্টার খোসার নিচে সে পাতলা আস্তর রয়েছে তাতে এই ভিটামিন থাকে। দানা জাতীয় শস্য, ঢেঁকি ছাঁটাচাল ছাড়াও বিভিন্ন শাক-সবজি বিশেষ করে সিম, বরবটি, মটরশুঁটি ও ডালে প্রচুর থায়ামিন থাকে। ভিটামিন বি-২ বা রাইবোফ্লেবিনের অভাবে জিহ্বা, ঠোঁট ও মুখের কোণায় ঘা দেখা দেয়। ডালে প্রচুর পরিমাণে রাইবোফ্লেবিন পাওয়া যায়। তাছাড়া দুধ, চাল, ভুট্টা ও সিম জাতীয় খাদ্যে রাইবোফ্লেবিনের প্রাচুর্য রয়েছে। ফলিক এসিড বা ভিটামিন বি-১১ এর অভাবে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। এর অভাবে প্রসূতি ও দুগ্ধবতী মায়েদের বদহজম ও পেটের অসুখ দেখা দেয়। সবুজ শাক-সবজির মধ্যে প্রচুর ফলিক এসিড থাকে। তাই শিশু, গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী মায়েরা সহজেই এসব শাক-সবজি গ্রহণ করে ফলিড এসিডের অভাব পূরণ করতে পারে। ভিটামিন ‘সি’ শরীরের চামড়া, দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্য রক্ষার অপরিহার্য। ভিটামিন ‘সি’ শরীরকে ঠান্ডার হাত থেকে রক্ষা করে এবং ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে। তাছাড়া ভিটামিন ‘সি’ অন্ত্রে লৌহ শোষণে সাহায্য করে। আমলকি, পেয়ারা, আমড়া, কুল, আনারস, কামরাঙা, বাতাবিলেবু, কাগজীলেবু এসব ফলমূল এবং যে কোন তাজা সবুজ শাক-সবজি থেকে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়। আমাদের দেহের হাড় ও দাঁত ঠিকমতো শক্ত হওয়ার জন্য ভিটামিন ‘ডি’র প্রয়োজন। ভিটামিন ‘ডি’ এর অভাবে রিকেট রোগ হয়। এতে হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং হাড় নরম ও বিকৃত হয়। সূর্যের আলোর সাহায্যে মানুষের শরীরের চামড়াতে ভিটামিন ‘ডি’ তৈরি হয়। এ দেশের মানুষ ভিটামিন ‘ডি’ এর অভাবেজনিত রোগে কম ভোগে। তবে শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য এটি অপরিহার্য। দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য, মাছ, মাংস, ডিম, মাছের তেল, ভোজ্যতেল ও পালংশাকে প্রচুর ভিটামিন ‘ডি’ পাওয়া যায়।
খনিজ লবণ কয়েক প্রকার। এদের মধ্যে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ, আয়োডিন এ খনিজ লবণগুলো দেহের পুষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালসিয়াম দাঁত ও হাড়কে সুগঠিত করে। হৃৎপিন্ড, ¯œায়ু ও পেশীসমূহের স্বাভাবিক কাজে ক্যালসিয়াম সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। দুধই ক্যালসিয়ামের উৎকৃষ্ট উৎস। তাছাড়া ডিমের কুসুম, ডাল, কাঁটাসহ মাছ, মাংস এবং সব ধরণের শাক-সবজি ও ফলমূলে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। লৌহের অভাবে মানবদেহে অপুষ্টিজনিত রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। ছোট ছেলে-মেয়েরা এবং গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েরা অতি সহজেই এ রোগের শিকার হয়। কলিজা, ডিম, আটা. ডাল. গুড়, কচুশাক, লালশাক, ডাঁটাশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, কাঁচকলা এসব লৌহ সমৃদ্ধ খাদ্য দ্রব্য খেলে অপুষ্টিজনিত রক্তশুন্যতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। খাদ্যে আয়োডিনের অভাবে হলে গলগন্ড বা ঘ্যাগ রোগ হয়। এছাড়া আয়োডিনের অভাবে গর্ভবতী মায়ের বিকলাঙ্গ সন্তান প্রসব, প্রসবোত্তর মৃত্যু এবং মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার আশংকা থাকে। সামুদ্রিক মাছ ও মাছের তেল ছাড়াও প্রচুর শাক-সবজি ও তাজা ফলমূল খেয়েও আয়োডিনের অভাব পূরণ করা যায়। তাছাড়া আয়োডিন মিশ্রিত লবণ নিয়মিত গ্রহণ করেও আয়োডিনের ঘাটতি মেটানো সম্ভব। পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান। সকল প্রকার খাদ্যদ্রব্যের বিপাক ক্রিয়ার জন্য পানি দরকার। দেহের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে স্বাভাবিক পরিপাক কার্য সাধনের জন্য পানির প্রয়োজন। পানির সাহায্যে দেহের দূষিত পদার্থ মলমুত্র ও ঘামের আকারে দেহ হতে বেরিয়ে যায়। একজন সুস্থ মানুষের ২৪ ঘন্টা বা একদিনে প্রায় ৩ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে দেড় লিটার পানি পান করা উচিত যা মাঝারি গ্লাসের ৮ গ্লাস পানির সমান। খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত পানি আার্সেনিক মুক্ত বিশুদ্ধ বা নিরাপদ হওয়া বাঞ্চনীয়।
সুস্থ, সবল ও মেধাবী জাতির পূর্বশর্ত হলো গর্ভবতী মা তথা সমগ্র জাতির জন্য সঠিক ও সুষম পুষ্টিমানের খাদ্যের আয়োজন করা। এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও প্ররিশ্রম। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সবার দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে অপুষ্টির কবল থেকে জাতিকে মুক্ত করে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম এবং মেধা সম্পন্ন উন্নত মানব সম্পদ সৃষ্টি করতে হবে। এ উন্নত মানব সম্পদ দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে বিশেষ আবদান রাখাতে সক্ষম হবে। দেশ হয়ে উঠবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে অচিরেই পৃথিবীর বুকে স্বাবলম্বী জাতি হিসেবে বাংলাদেশ চিহ্নিত হবে। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস রূপসা, খুলনা