ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আট শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ


প্রকাশিত : মার্চ ১২, ২০১৯ ||

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বিভিন্ন ‘অনিয়ম’ তুলে ধরে এই নির্বাচন স্থগিত করে নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক, যারা নিজেদের উদ্যোগে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার কথা জানিয়েছেন।

২৯ বছর পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে সোমবার সকাল ৮টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরুর কথা থাকলেও ব্যালট পেপার নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে রোকেয়া হল ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ভোটগ্রহণ বিঘ্নিত হয়।

ভোটগ্রহণ শেষে ওই শিক্ষকরা এক বিবৃতিতে বলেন, “এই বহুল প্রতীক্ষিত ডাকসু নির্বাচনের অনিয়মের ঘটনাগুলো আমাদের খুবই লজ্জিত করেছে। এই ঘটনা জনগণের করে পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে বিনষ্ট করেছে। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, যা সার্বিকভাবে অ্যাকাডেমিক পরিবেশ বিঘ্নিত করবে।
“এত বছর পরে অনুষ্ঠিত এই ডাকসু নির্বাচন সফলভাবে না করতে পারার ব্যর্থতার দায়ভার প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষক সবার এবং এই ব্যর্থতা সমগ্র শিক্ষক সম্প্রদায়ের নৈতিকতার মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।”

এসব ঘটনার তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিবৃতিদাতা শিক্ষকরা হলেন- গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাহমিনা খানম ও অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অতনু রব্বানী।

অধ্যাপক ফাহমিদুল হক স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তারা কয়েকজন শিক্ষক স্বেচ্ছাসেবামূলক পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আবেদন করেন। প্রধান রিটানিং কর্মকর্তা মৌখিকভাবে তাদের অনুমতি দিয়েছিলেন।
সে অনুযায়ী তারা সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ছাত্রদের হল এসএম হল, সূর্যসেন হল, মহসিন হল, এফ রহমান হল, শহীদুল্লাহ্ হল এবং ছাত্রীদের রোকেয়া হল ও কুয়েত মৈত্রী হলে ভোটের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন বলে শিক্ষকরা জানিয়েছেন।

“আমরা কুয়েত মৈত্রী হল থেকে আমাদের পর্য়বেক্ষণ শুরু করি। কারণ আমরা শুরুতেই জানতে পারি এই হলে ভোটদানে অনিয়মের কথা। আমরা জানতে পারি, ভোটগ্রহণ শুরু হবার আগে ছাত্রীরা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা শিক্ষিকাদের কাছে ভোটদানের পূর্বে শূন্য ব্যালট বাক্স দেখতে চান কিন্তু তাদের এই ন্যায্য দাবি অগ্রাহ্য করা হয়। এতে ছাত্রীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং এক পর্যায়ে কেন্দ্রের পাশের কক্ষ থেকে একটি বিশেষ ছাত্র সংগঠনের পক্ষে পূরণ করা প্রচুর ব্যালটপেপার উদ্ধার করে। সেগুলোর বেশ কিছু আমরা শিক্ষকরাও দেখতে পেয়েছি।

“এরকম অবস্থায় স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে ভোট গ্রহণ স্থগিত হয়ে যায়। এই ঘটনায় প্রভোস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সমর্থ না হলেও আমরা রিটার্নিং অফিসারদের লজ্জিত ও মর্মাহত দেখতে পাই।”
রোকেয়া হলে গোলযোগের খবর পেয়ে সেখানে গিয়েও অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি বিবৃতিদাতা শিক্ষকদের।

“সেখানে গিয়ে জানতে পারি, সকালের কুয়েত মৈত্রী হলের অভিজ্ঞতার পর, সরকারি ছাত্র সংগঠনের বাইরের নানান প্যানেলের শিক্ষার্থীরা ভোটকেন্দ্রের পাশের ‍রুমে ব্যালট পেপারের সন্ধান পান এবং সেগুলোকে দেখানোর জন্য কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেন। কিন্তু সেগুলো ছিল সাদা ব্যালট পেপার। এরপর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং সরকারি ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিরোধীদের ওপর চড়াও হয়। বিরোধী পক্ষের কয়েকজন আহত হন। উভয় পক্ষের উত্তেজনায় এরকম অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে রোকেয়া হলে, যার নিন্দা জানাই আমরা।”

ছাত্রদের হলগুলোতে ‘মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে’ ভোটগ্রহণ হতে দেখলেও ভোটকেন্দ্রের বাইরে কতকগুলো অনিয়ম চোখে পড়ার কথা জানিয়েছেন এই শিক্ষকরা। তাদের ভাষ্যমতে,
# ভোটারের আইডি চেক করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সদস্যরাই বেশি মাত্রায় ভূমিকা রেখেছেন এবং অনাবাসিক ছাত্রদের ভোট দিতে বাধা প্রদান ও নিরুৎসাহিত করেন তারা।

# ছাত্রলীগের কর্মীরা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করলেও অন্য প্যানেলের প্রার্থী ও কর্মীরা ভোটকেন্দ্রের বাইরে বা ভোটারের সারির আশেপাশে অবস্থান নিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন।

# ভোটকেন্দ্রের বাইরে ‘কৃত্রিম জটলা’ করে রেখেছেন ছাত্রলীগের কর্মীরা, যাতে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া স্লথ হয় এবং বাকিরা ভোটদানে নিরুৎসাহিত হয়।

# অনেক ক্ষেত্রে বুথের ভেতরে কোনো কোনো ভোটার ৫ থেকে ২৩ মিনিট পর্যন্ত সময় ব্যয় করেছেন, যা ইচ্ছাকৃত মনে হওয়ার কারণ রয়েছে

# ভোট চলাকালেই রোকেয়া হলের সামনে একটি সংগঠনের ২০-২৫ জন কর্মীকে বাইকের হর্ন বাজিয়ে শোডাউন করতে দেখা গেছে, যা আচরণবিধির লংঘন।

এছাড়া ব্যালট পেপারে সিরিয়াল নম্বর না থাকাকে অসঙ্গতি হিসেবে দেখছেন এই শিক্ষকরা।

“কারণ এতে নির্বাচনের ফলাফলে গুরুতর অনিয়ম ঘটানো অনেক সহজ হয়ে যায়,” বলেছেন তারা।