বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশুদিবস


প্রকাশিত : মার্চ ১৭, ২০১৯ ||

পঞ্চানন মল্লিক
খুলনা বিভাগের সৌন্দর্যমন্ডিত জেলা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তারিখে মাতা সায়রা খাতুনের কোল আলো করে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলো যে অগ্নিদীপ্ত শিশু তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর পিতার নাম লুৎফর রহমান। মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্ন দ্রষ্টা, অসহায় প্রান্তজনের পরম হিতাকাক্সক্ষী, দেশ দরদি বন্ধু শেখ মুজিব জন্মে গ্রহণ করেছিলেন বাংলার দুখী মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে। চার বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ছোটবেলা থেকেই গরীব, অসহায়, দুস্থজনের দু:খ বেদনা তাঁকে ব্যথিত করে তুলতো। তাই প্রাণপণে এগিয়ে আসতেন তাঁদের কষ্ট ঘোচাতে। একবার বর্ষাকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য তাঁর বাবার কিনে দেওয়া ছাতাটি তিনি এক বন্ধুকে দিয়েছিলেন। শীতে এক বৃদ্ধা মাতাকে জড়িয়ে দিয়েছিলেন গায়ের একমাত্র চাদর। এভাবে তাঁর শৈশবের প্রাত্যহিক কাজ কর্মে প্রকাশ পেয়েছিলো সাধারণ মানুষের প্রতি অসীম মমত্ববোধ। ৭ বছর বয়সে তিনি নিজ গ্রামের পাশ্ববর্তী গিমাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানকার পাঠ শেষে পড়েন গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল ও গোপালগঞ্জ মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায় তৎকালিন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার অপরাধে তিনি জীবনে প্রথম গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। ১৯৪২ সালে তিনি মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর উচ্চ শিক্ষার জন্য কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। বিখ্যাত এই কলেজে পড়াকালীন তিনি কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিএ পাশ করেন। তিনি ছাত্র জীবনে বিভিন্ন খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতার সংস্পর্শে আসেন। এসময় রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন বলিষ্ঠ ছাত্র-যুবনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে স্বাধীনতা লাভের পরে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর ১৯৪৮ সালে রাজনৈতিক নতুন চিন্তা ধারায় গঠন করেন ছাত্রলীগ। এ সময় বাংলার শোষিত, নির্যাতিত, বঞ্চিত গণমানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নেন তিনি। আস্তে আস্তে হয়ে ওঠেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে তাঁর নেতৃত্ব সংগ্রামে হয় ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৮ সালের আয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধি আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনসহ আরও অনেক আন্দোলন। পরবর্তিতে আওয়ামীলীগ প্রধান হিসেবে ১৯৬৬ সালে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে ঐতিহাসিক ৬ দফা প্রস্তাব পেশ করলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি কারারুদ্ধ হন। ১৯৬৯ সালে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্র জনতা তাকে ‘বঙ্গরন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭০ সালে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৬ দফার প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন দিলেও তৎকালিন শাসকগোষ্ঠি তা মেনে নেননি। এসময় থেমে থাকেননি বঙ্গবন্ধু। বাংলার একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সাধারণ মানুষের মাঝে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তির বারতা পৌঁছে দেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালিন রেসকোর্স ময়দানে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে স্বাধীনতা ও সার্ববৌমত্বের পক্ষে এক ঐতিহাসিক বজ্রদীপ্ত ভাষণ দেন তিনি। তাঁর সে ভাষণে উদ্দীপ্ত হয়ে দেশের স্বাধীনতা পাগল আপামর জনতা মুক্তি সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে অতর্কিতে বর্বরের মত বাঙালিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। নির্বিচারে হত্যা যজ্ঞ চালিয়ে হত্যা করে নিরীহ বাঙালিদেরকে। বাঙালিদের আশা আকাঙ্খার কান্ডারি শেখ মুজিবুর রহমানকে ঐদিন রাতেই ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে তারা। পরবর্তিতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় তৎকালিন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে। সেখানে ২৯০ দিন আটকে রাখা হয় বঙ্গবন্ধুকে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি চূড়ান্ত বিজয় লাভ করলে পাকিস্তান স্বৈরশাসক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭২ সালের এই দিনে তিনি স্বাধীন বাংলার মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় লাভের পর বাঙালি তাদের প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রাণবন্ত সংবর্ধনা জানানোর জন্য একাগ্র চিত্তে অপেক্ষায় ছিলো। তাঁর অপেক্ষায় সেদিন ঢাকার তেজগাঁও বিমান বন্দর থেকে শাহাবাগ পর্যন্ত লাখো মানুষের ঢল নেমে আসে। বঙ্গবন্ধুর গাড়ি বহর তেজগাঁও বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান অর্থাৎ বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৪ ঘন্টা। আনন্দে আত্মহারা বাঙালি বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে স্বতস্ফুর্ত অভিনন্দন জানান। পরে রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভায় তিনি আগত মানুষের উদ্দেশ্যে ভাষন দেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীন স্বদেশে ফিরে আসা ছিলো বাঙালি জাতির জন্য এক মহান প্রাপ্তি ও আশীর্বাদের।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালি জাতির আশা আকাঙ্খার প্রতীক। তিনি বাঙালি জাতির স্বাধীনতার মহান স্থপতি। স্বাধীন বাঙালির হৃদয়ে তিনি চির ভাস্বর। সুদৃঢ় মনোবল, গভীর জ্ঞান ও রাজনৈতিক দুরদর্শিতা দিয়ে তিনি রাজনৈতিক নেতা থেকে জননেতা এবং পরবর্তিতে দেশনায়ক হয়েছিলেন। পরাধিন বাঙালির দু:খ, বেদনা, অসহায়ত্ব, নির্যাতন ছোটবেলা থেকে তাঁর মর্মস্পর্শ করেছিলো। তাই তাদের অধিকার আদায় করতে গিয়ে ব্যয় করেন জীবনের মূল্যবান সময়। গরীব,দু:খী,অসহায় মানুষের পাশাপাশি তিনি শিশুদেরকেও খুব ভালোবাসতেন। সংগ্রামি জীবন ও দেশসেবার কাজে শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি তাদের কথা ভাবতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন আজকের শিশুরাই আগামি দিনের ভবিষ্যত এবং আগামিতে তারাই দেশের নেতৃত্ব দেবে। তাই শিশুরা যাতে হাসি আনন্দের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে তার প্রতি তিনি গুরুত্ব দিতেন সব সময়। গরীব, দুস্থ শিশুদের দেখলে তিনি কাছে টানতেন। তাদের খোঁজ খবর নিতেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা করতেন।
বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সর্বপ্রথম ১৯৯৬ সালে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে ঘোষনা করেন। ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ দিবসটি পালন শুরু হয়। বর্তমানে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হচ্ছে। যতদিন বাঙালি জাতি থাকবে ততদিন কৃতজ্ঞচিত্তে জাতি বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন পালন করবে এমনটি আমাদের প্রত্যাশা। লেখক: কবি ও কলামিস্ট