সংস্কৃতির উন্মুক্ত আলিঙ্গনে


প্রকাশিত : মার্চ ১৭, ২০১৯ ||

সুদয় কুমার মন্ডল
বসন্তের ভরা যৌবন। পত্রমোচী বৃক্ষে সবুজের সমারোহ। কৃষ্ণচূড়া শাঁখে প্রস্ফুটিত পুষ্পের রক্তিম রংয়ের নান্দনিক ইশারায় শুভ সূচনা। প্রকৃতি সৃজনী উৎসবে মাতোয়ারা। সংকীর্নতার কোল ছেড়ে দক্ষিণা সমীরনের মৃদুলপরশে সতেজ মন। পাখীর কুজনে ঝোপঝাড় আনন্দ মুখরিত। সুকন্ঠী কোকিল গায়কের বিমোহিত সুরের আবেশ সেই নিধুবনে বিরহিনীর প্রেমের আলিঙ্গন জানায়। শিশির ¯œাত জ্যো¯œা রাতের মায়াবী আঁচল ঝুলিয়ে প্রকৃতির সাড়া জাগায় নতুন সৃজনী বরতায়। মহাউৎসবের মহা আয়োজন। সপ্ত রংয়ের দিব্যদ্যুতি আলোকিত সাতক্ষীরা।
সেই মহেন্দ্রক্ষণ। সংস্কৃতির পুজারী নানা আয়োজনে মহা ধুম ধামে মেতেছে। জনপদে জ্ঞান পিপাসুর উল্লাসিত সৌরভ। ৭ মার্চ ২০১৯ থেকে ১৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ, শিশু দিবস ও বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে সাতক্ষীরার রাজ্জাক পার্কে মনোরম সেই বই মেলা অনুষ্ঠিত। হাজার হাজার দর্শক ক্রেতার ভিড়ে প্রত্যহ মেলারস্থল জনসমুদ্রে পরিণত সাংষ্কৃতির মঞ্চে প্রত্যহ নানা ধরনের আয়োজন। নাচ, গান বক্তৃতায় দর্শক শ্রোতা বিমুগ্ধ। প্রত্যহকত কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, সাংস্কৃতিককর্মী বিজ্ঞজনের অবাধ বিচরণ এইজন প্রিয় মেলাকে স্বার্থক করে তুলেছে। জেলা প্রশাসকের মহতি উদ্যোগে এবং আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই আয়োজন। জেলাবাসির গৌরব মহিমান্বিত এক সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল। আয়োজকবৃন্দ অসংখ্য ধন্যবাদের দাবিদার।
এরই মধ্যে সাতক্ষীরার অনেক অঙ্গনে চলছে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক উৎসব। যার মধ্যে কবিতা উৎসব সাতক্ষীরাবাসীর এক নান্দনিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। দৈনিক পত্রদূতের মাসিক সাহিত্য সভায় কবিতা আবৃত্তি যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। এধারা অব্যহত রয়েছে।
ইতোমধ্যে কবিতা আবৃত্তির মহাধুম ধামের আসর ও নির্ধারিত হয়েছে ২৯ মার্চ ২০১৯ সাতক্ষীরা পাবলিক লাইব্রেরীতে কবিতা পরিষদের এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠান। সবই জ্ঞানার্জনের প্রেক্ষাগৃহ। সংস্কৃতির উন্মুক্ত আলিঙ্গনে। কবিতা শুধুমাত্র শব্দ ব্যঞ্জনা, রূপকল্পভাষা ও ভাবের বর্ণাঢ্য শুভ পরিচয় নয়। কবিতায় আছে নিজস্ব আত্মার নিরব কান্না, করুন বিদ্রোহ। যে কান্না ভাবুকের বা কবির অন্ত উপলদ্ধিতে ঝংকারিত। সে কান্না চলন্ত ট্রেনের হুইসেলেও শোনা যায়। অপেক্ষারত পতিতা ও বিরহী নারীর চোখে অদৃশ্য অশ্রু মোচনের শব্দে ও শোনাযায়। সুতরাং কবিতার জন্য দরকার পাঁচ দশ মিনিট নয় একটি সন্ধ্যা নয়, নাজিম হিকমতের ভাষায়, ‘ঋড়ৎ ঢ়ড়াবৎঃু হড়ঃ ভরাব ড়ৎ ঃবহ সরহঁঃবং নঁঃ বঃবৎহরঃু’ তিনি বলেন, আধুনিক কবিতার চালটার দিকে নজর আছে – চলনটার দিকে নজর নেই। কবিতা আবৃত্তি সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধি করে দক্ষ আবৃত্তিকার তৈরি করে। সংস্কৃতিকে বেগবহ করে। লিখতে গেলে যে চর্চার প্রয়োজন, ভাল কবিতা পাঠ করাও প্রয়োজন। ভালো কবিতা সঠিক ভাবাদর্শ নিরূপন করে। আবৃত্তি কবিতা কে আরও প্রাঞ্জল, অর্থবহ ও আবেগময় করে তোলে- অঙ্গভঙ্গি ও স্বরযন্ত্রের শৈল্পিক কুশলতা প্রবৃদ্ধি ও প্রজ্ঞাবহ করে তোলে। আবৃত্তি শিল্প সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ।
সংস্কৃতির অঙ্গনে নাটক, উপন্যাস, যাত্রাপালা যেমন বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাস্তব জ্ঞানের প্রত্যক্ষ প্রতিফলন ঘটায় ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে স্বচিত্র দর্পনে প্রতিবিম্বত হয়। কবিতা আবৃত্তি কবিতার বাস্তব প্রতিফলন। সংস্কৃতিক ফলপ্রসুজ্ঞান দান করে মানস চেতনা উর্বর করে-আবৃত্তির কলাকৌশল ও দিক নির্দেশনা কবিতার অর্ন্তনিহিত ভাবকে ব্যঞ্জনাময় করে তোলে সংস্কৃতি আরও প্রসন্ন ও প্রগতিশীল হয়। কবিতা লিখে শুধু পাঠ করলে কবিতার প্রাণ সঞ্চার হয় না। কবিতাকে প্রাণবন্ত করে তুলতে হলে কবিতার সঠিক আবৃত্তি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কবিতা সঠিক আবৃত্তির জন্য উপর্যুপরি চর্চার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করা অত্যন্ত অপরিহার্য স্বরভক্তি, উচ্চারণরীতি, বিরাম চিহ্নের যথাযথ ব্যবহার কবিতা আবৃত্তির উৎষর্ক সাধন করে। কিন্তু সেদিকে বেশীর ভাগেরই মন:স্কতা নেই। সকলে নিজের লেখায় মশগুল। ভালমন্দ বিচার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে।
বর্তমানের অনেক কবিতা পাঠকের দুবোধ্য হয়ে ওঠায় কবিরা কিছু ভাববার দরকার মনে করেন না। আধুনিক কালে অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে গদ্য কবিতার চল আছে; কিন্তু গদ্য কবিতা যে এক অন্তলীন শব্দে বাধা অধিকাংশই তা খেয়াল বা চিন্তা করেন না। কবিতা সম্পর্কে একথা অসমীচিন নয় যে, অনেকেই কিছু কিছু অপরিচিত কবিতা থেকে শব্দ বা লাইন নিয়ে সাজিয়ে নিজস্ব কবিতা তৈরী করেন-এই প্রবণতা আদৌ সমর্থন নহে। এতে নিজস্ব বলে কিছু থাকে না।
একজন আবৃত্তিশিল্পীর সে সুযোগ নেই। আবৃত্তি শিল্পী নিজের দক্ষতা যোগ্যতা ও চর্চা ও নিয়মিত সাধনার দ্বারা নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য করে তোলে। বাস্তবের বাস্তবতায় রূপদানে তিনি সচেষ্ট। তার মননতুলি হৃদয় পটভূমিতে সে দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে। আবৃত্তি মঞ্চে সে স্বার্থক রূপকার। কবিতা আবৃত্তি শ্রোতার হৃদয় আলোকিত ও আবেগময় করে আনন্দ দান করে। একজন যোগ্য আবৃত্তিশিল্পী বাস্তবতার মঞ্চে সফল অভিনেতা। এর পোষকে সমাজ ও সংস্কৃতি আরও প্রগতিশীল, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনশীল হয়।
সংস্কৃতির মুক্তমঞ্চে কবিতা আবৃত্তি কাব্যিক জ্ঞান বিকশিকত করে। কবিতা সংস্কৃতির ধারক বাহক ও শুদ্ধতার পরিচায়ক। কবিতা সৃষ্টি স্বার্থক হয় আবৃত্তির রং তুলিতে। আবৃত্তিশিল্প ও কবিতা সৃষ্টির প্রেরণ যোগায়। কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকর, আবৃত্তিশিল্পী, সংস্কৃতিবান, পন্ডিত, গুনি বিজ্ঞজন যারা সংস্কৃতির কে লালন করে, তাদের প্রতি আমার যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা আছে। কিন্তু বড় ই পরিতাপের বিষয় সাহিত্য চর্চায় গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের সেই ভয়ংকর আবিলতায়।
জেলার শ্রেষ্ঠ আবৃত্তিশিল্পী অধ্যাপক মন্ময় মনির গভীর নিষ্ঠার সাথে নিরলসভাবে আবৃত্তিশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তার এ মহতি প্রয়াস এর প্রত্যক্ষরূপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। অধ্যাপক মনির যে কাজে হাত দিয়েছেন তা সাতক্ষীরার কবি, সাহিত্যিকদের বিচরণ ক্ষেত্রে প্রেরণা ও মনোবল যোগাবে। যার প্রত্যক্ষ ফল সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধিশালী করে তুলবে। এ বিষয়ে ভবভূতির সেই বিখ্যাত উক্তি প্রণিধানযোগ্য। ‘উৎসব্যসত্ত্বে কোহপি সমান ধর্মা কালোহয়েং নিরবধিবিপুল চ পৃথ্বি’ কৌটল্য’র অর্থশাস্ত্র অনেক কাল মানুষের অজানা ও অবহেলিত ছিল। তারপর বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছে। কবিতা আবৃত্তি উৎসব মন্ময় মনিরের সত্যিকারের এক প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। সাতক্ষীরাতে ২০০৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম আবৃত্তি উৎসবের সার্থক রূপকার মন্ময় মনির। আমি তার এ মহতি উদ্যোগের অসংখ্যা ধন্যবাদসহ সাফল্য কামনা করি।