পারিবারিক পুষ্টি ভাবনা


প্রকাশিত : মার্চ ২৩, ২০১৯ ||

মো. আবদুর রহমান
পরিবারের প্রতিটি সদস্যের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে খাদ্য নির্বাচন করতে হয়। তাই পরিবারের খাদ্য পরিকল্পনা, তৈরি ও গ্রহণের সময় সুষম খাদ্যের দিকে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা উচিত। এজন্য সুষম খাদ্য সম্পর্কে আমাদের বিশেষ করে গৃহিনীর জ্ঞান থাকা দরকার।
সুষম খাদ্যের বিভিন্ন উপাদানগুলো হলো-প্রোটিন, শর্করা, ¯েœহ পদার্থ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি। এদের মধ্যে প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। মানবদেহের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধি সাধনের জন্য প্রোটিন একান্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশু ও বাড়ন্ত ছেলে-মেয়েদের জন্য প্রোটিনের প্রয়োজন খুব বেশি। একই কারণে গর্ভবতী মহিলার গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি ও গঠন ঠিকমতো হওয়ার জন্য এবং প্রসূতি মায়ের বুকের দুধ তৈরির জন্য তাদের নিত্যদিনের খাবারে প্রোটিনের দরকার অত্যন্ত বেশি। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও ডাল মূলত: প্রোটিন জাতীয় খাদ্য। বাংলাদেশে এজাতীয় খাদ্যের ঘাটতি প্রকট। বর্তমানে দেশের শতকরা ৮০জন লোক প্রোটিনের অভাবে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। সাধারণ হারে একজন মানুষের বছরে ১০০টি ডিমের প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে মাথাপিছু ডিম খাওয়ার হার বছরে মাত্র ১৪টি অর্থাৎ মাথাপিছু ৮৬টি ডিমই ঘাটতি। শুধু ডিম নয়, মাছ, মাংস, দুধ ও ডালের ক্ষেত্রেও একই ধরণের ঘাটতি রয়েছে। সুস্থ-সবল, কর্মঠ ও নিরোগ জনশক্তি গড়ে তুলতে দেশে প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। বসতবাড়ির আঙ্গিনায় হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু পালন এবং মিনি পুুকুরে মাছের চাষ করে প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করে তা থেকে পারিবারিক প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা যায়। এর ফলে পরিবারের সদস্যদের উন্নত পুষ্টি তথা সু-স্বাস্থ্য নিশ্চিত হবে।
ভিটামিন ও খনিজ লবণ দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং দেহকে সুস্থ-সবল ও নিরোগ রাখে। শিশু, গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী মায়েদের জন্য ভিটামিন ও খনিজ লবণের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এর অভাব হলে রাতকানা, অন্ধত্ব, রক্তস্বল্পতা, স্কার্ভি, বেরিবেরি, রিকেটস, মুখ ও ঠোঁটের কোনায় ঘা, গলগন্ড ইত্যাদি নানা ধরনের মারাত্মক অপুষ্টিজনিত রোগ দেখা দেয়। শাক-সবজি এবং ফলমূল ভিটামিন ও খনিজ লবণের উৎকৃষ্ট উৎস। শাক-সবজি ও ফলমূলে সব ধরনের পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তবে ভিটামিন ও খনিজ লবণের পরিমান বেশি থাকে। আমাদের দেহের এ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান দু’টির চাহিদার প্রায় সবটুকুই শাক-সবজি ও ফলমূল থেকে পূরণ হয়ে থাকে। তাছাড়াও শাক-সবজি ও ফলমূল হৃদরোগ, স্থুলকায়ত্ব, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটের পীড়া ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। এজন্য শাক-সবজি ও ফলমূলকে রোগ প্রতিরোধকারী খাদ্য বলা হয়। সুতরাং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের শরীরকে সুস্থ ও রোগমুক্ত রাখার জন্য দৈনন্দিন প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি ও ফলমূল খাওয়া উচিত।
বর্তমানে আমরা যে পরিমান শাক-সবজি ও ফল খেয়ে থাকি, তা চাহিদার তুলনায় খুব কম। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্যকে পুষ্টির দিক থেকে সুষম করতে হলে প্রতিদিন একজন শিশুর জন্য কমপক্ষে ১০০ গ্রাম ও একজন পূর্ণবয়স্ক লোকের দৈনিক ২০০ গ্রাম শাক-সবজি এবং ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে একজন পূর্ণবয়স্ক লোক গড়ে প্রতিদিন ৩০ গ্রাম শাক-সবজি ও ৪০ গ্রাম ফল খেতে পায়। সুতরাং ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর শাক-সবজি ও ফলের চাহিদা পূরনের জন্য বসতবাড়ীর আঙিনায় বাগান আকারে বা যার সেখানে যতটুকু পতিত জায়গা আছে সেখানে বেশি করে শাক-সবজি ও ফলের চাষ করা একান্ত প্রয়োজন। শাক-সবজি ও ফলমূলের পারিবারিক চাহিদা মেটাতে খুব একটা বেশি জমির প্রয়োজন হয় না। আমাদের বাড়ীর আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা জমিগুলো পরিকল্পিত ভাবে পুষ্টি সমৃদ্ধ শাক-সবজি ও ফল চাষের আওতায় আনা হলে তা থেকে সারা বছর পরিবারের সকলের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে অপুষ্টিজনিত রোগ হতে রক্ষা পাওয়া যায়।
শিশুরা জাতির ভবিষ্যত। আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। শিশুর পুষ্টিহীনতা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এদেশে ছোট, বড় ও বাড়ন্ত শিশুরাই ব্যাপক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। শিশুর শৈশবকাল তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রতিটি শিশুকে সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান করে গড়ে তোলার জন্য জন্মের পর পরই শিশুকে মায়ের বুকের প্রথম দুধ বা শাল দুধ খেতে দিতে হবে। শিশুর জন্য এশাল দুধ খুবই পুষ্টিকর, নিরাপদ ও রোগ প্রতিরোধক। নবজাত শিশুর জন্য শালদুধ ছাড়া অন্য কোন খাবারের প্রয়োজন নেই। জন্মের পর থেকে পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুকে অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। কারণ মায়ের দুধে রয়েছে শিশুর জন্য উপযোগী পরিপূর্ণ পুষ্ঠি উপাদান। মায়ের দুধ সহজপাচ্য ও জীবানুনাশক। এসময় কৌটার গুঁড়োদুধ না দিয়ে মায়ের বুকের দুধ পান করালে শিশুরা স্বাস্থ্যবান হয়। মায়ের দুধ পান করার ফলে শিশুদের দেহে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। মা তার নিজের স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য নিয়মিত যে খাবার খেয়ে থাকেন তার চেয়ে কিছু বাড়তি খাবার খেলেই তিনি তার শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় দুধ উৎপাদন করতে পারেন।
বস্তুত ঃ জন্মের পর শিশুকে সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান করে গড়ে তোলার জন্য উপযুুক্ত খাদ্য হিসাবে মায়ের দুধের কোন বিকল্প নেই । শিশুর বয়স পাঁচ মাস পূর্ন হলে শুধু মাত্র মায়ের বুকের দুধ শিশুর শরীরের চাহিদা মেটে না। তাই পাঁচ মাস পূর্ণ হলে শরীরের প্রয়োজন মেটানোর জন্য মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে অন্যান্য খাবারও খাওয়ানো উচিত।
পুষ্টির অভাবজনিত সমস্যা বাংলাদেশের অন্যতম একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। অপুষ্টির নানা কারণের মধ্যে পুষ্টি সম্পর্কে অজ্ঞতা ও সচেতনতার অভাবও অন্যতম একটি কারণ। পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে এবং সাধারণ স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিষয়ক শিক্ষার প্রসার ও প্রয়োগের মাধ্যমে অপুষ্টিজনিত সমস্যা সামাধানে কাজ করা যায়। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জনসাধারণের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি উন্নয়নের কার্যক্রম চালু হয়েছে। সামাজিকভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবার তথা সমগ্র জাতির পুষ্টির অভাবজনিত সমস্যা একদিন সমাধান হবে। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, রূপসা, খুলনা