জেলার শ্রেষ্ঠ ৫ জন জয়িতার জীবন সংগ্রামের গল্প


প্রকাশিত : এপ্রিল ১৭, ২০১৯ ||

পত্রদূত ডেস্ক: সমাজের নানা বঞ্চনা, অবহেলা, নির্যাতন প্রতিহত করে আজ যারা নতুন করে বাঁচতে শুরু করেছে তাদেরকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মসূচীর আওতায় এসব নারীদের খুঁজে বের করে সম্মাননা প্রদান করছে। তারই ধারাবাহিকতায় জেলার সাত উপজেলার মধ্যে ৫টি ক্যাটাগরীতে বাছাই করা হয়েছে। তৃণমূল থেকে উঠে আসা নারীদের জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বীকৃতি তার নিজের এবং অন্যান্য নারীদের জন্য আত্মতৃপ্তির ও অনুস্মরণীয়। সকল উপজেলায় এ কর্মসূচীর আওতায় জীবনযুদ্ধে নারীদের খুঁজে বের করে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করা হয়। ২০১৮ সালের ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া দিবসের সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। যার মধ্যে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হয়েছে ৫জন। তাদের সংগ্রামী জীবনের কাহিনী একেক জনের আলাদা আলাদা।
যার মধ্যে সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন গুলশান আরা খাতুন নামের একজন জয়ীতা। তিনি তালা উপজেলার শিরাশুনি গ্রামের শেখ জালাল উদ্দীনের স্ত্রী। গুলশান আরা প্রতিদিন সংসার সামলিয়ে বের হন সমাজ উন্নয়নের কাজে। দরিদ্র, হতদরিদ্র, মানুষের সেবাই তার পেশা এবং নেশা। নারীর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ গড়ে তুলে এলাকায় সাড়া ফেলে দিয়েছেন তিনি। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতন করেন মানুষকে। বাল্য বিবাহের কুফল এবং বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে তার আন্দোলন ঘরে ঘরে, বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে গেছে। মানুষকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানান কর্মসূচির মাধ্যমে নির্যাতিতা, দুস্থ, স্বামী পরিত্যক্তা ও বিধবা নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য দিন রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। নারী উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে বিনামূল্যে দর্জি প্রশিক্ষণ, ছাগল ও গরু বিতরণ, বিনা মূল্যে স্যানিটেশন বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও ল্যাট্রিন বিতরণ, সবজি চাষ প্রশিক্ষণ ও বিনামূল্যে সবজি বীজ বিতরণ করেন তিনি। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় ফলের সংরক্ষণ করে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন তিনি। উন্নত চুলা ও বিনামূল্যে গাছের চারা বিতরণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হ্রাসে ভুমিকা রাখছেন তিনি। এছাড়াও তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে জলাবদ্ধতার কারণে কোমলমতি শিশুদের মধ্যে যারা উপযুুক্ত বয়সে স্কুলে যেতে না পারে তাদের ক্ষেত্রে প্রাক প্রাথমিক শিশু শিক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা করেছেন। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে তার সংগঠন বিভিন্ন ধরনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালন করে থাকে। এভাবে সমাজের অবদান রেখে চলেছেন তিনি।
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জন করেছেন মমতাজ বেগম। তিনি তালা উপজেলার ভায়রা গ্রামের বাসিন্দা। পরিপূর্ণ বয়স হওয়ার আগেই বিবাহ বন্ধনে তাকে আবদ্ধ করা হয়। স্বামীর সংসারে প্রবেশ করেই চোখে সুখ তো দুরের কথা অভাব অনাটনের ছবি ছাড়া কিছুই দেখে না। আর তাই সে একসময় স্বামীর অভাবের সংসারে লোকের বাড়িতে ঝি’র কাজ করে জীবন নির্বাহ করতে শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে উন্নত জীবনের আশায় নকশীকাঁথা সেলাই, গরু পালন, শাড়ী কাপড়ের ব্যবসা ও চাল বিক্রয় করে সংসারে স্বচ্ছলতা আনার চেষ্টা করেন। বর্তমানে তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত নারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এখন তার সুদিন ফিরেছে।
বাঁধা পেরিয়ে নব উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন অষ্টমী মালো। তিনি শ্যামনগর উপজেলার নকিপুর গ্রামের দিলীপ কুমার বৈদ্যর স্ত্রী। তিনি একজন প্রতিবন্ধী নারী। জন্ম প্রতিবন্ধী হয়েও তিনি নকিপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ৫ম শ্রেণি পাশ করেন। পরবর্তীতে নকিপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। পড়ালেখার মাঝখানে তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। সে সাথে বই নিয়ে যায় পড়ালেখা করার জন্য। কলকাতা পোলিও হাসপাতালে অনেক দিন ভর্তি থাকার পর কিছুটা সুস্থতা ফিরে পেয়ে ২০০৪ সালে বাংলাদেশে আসেন। দেশে এসে জানতে পারে যে, নকশীকাঁথা মহিলা সংগঠনে ডি.আর.আর.এ সংস্থা প্রতিবন্ধীদের থেরাপি প্রদান কার হয়। তখন তিনি তাদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং নিয়মিত ব্যায়াম (থেরাপি) নিতে শুরু করেন। প্রতিবন্ধী হয়েও জীবন সংগ্রামে পিছিয়ে পড়েননি অষ্টোমী। বিএ পাশ করার পর দুই হাজার টাকা বেতনের একটি চাকরিতে যোগদান করেন। বর্তমানে অষ্টমী দুই সন্তানের জননী। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে তাদের সমস্যা অনুযায়ী বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে তাদের সুবিধার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিবন্ধী নারীদের সংগঠন ‘অপরাজিতা নারী উন্নয়ন সংস্থা’র সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
সফল জননী নারী জাহানারা খাতুন। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামার বায়সা গ্রামের চাঁদ আলীর স্ত্রী। তার স্বামী একজন দিনমজুর। অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে চেষ্টা করে দুইটি সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে বড় ছেলে রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেছেন এবং ছোট ছেলে বগুড়া জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস তৃৃতীয় বর্ষে পড়াশুনা করছেন। গরীব হয়েও ছেলেদের লেখাপড়া বন্ধ হতে দেননি তিনি। তাই স্বামীর কাজের পাশাপাশি নিজেও নেমে পড়েন বাড়তি আয় করার চেষ্টায়। তাই সংসারের পাশাপাশি হাঁস-মুরগী পালন করে ছেলেদের পড়ালেখার খরচ জোগাতেন।
শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী কামরুন নাহার। তিনি আশাশুনি উপজেলা সদরের মৃত সাজ্জাদুর রহমানের স্ত্রী। তার বাবা মৃত ছুরমান আলী খাদ্য বিভাগে চাকরি করতেন। তিনি নয় ভাই বোনের মধ্যে ৬ষ্ঠ। ১৯৭৬ সালে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় হতে বিজ্ঞান বিভাগে থেকে এসএসসি পাশ। ১৯৮০ সালে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে বিএসসি পাশ এবং ১৯৮৩ সালে খুলনা টিটি কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ এবং ২০০৯ সালে এমএড ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮১ সালের পিতার আকষ্মিক মৃত্যুর পরে আর্থিক সংকটের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং মনোবল হারিয়ে ফেলেন। দুই বছর পরে সাতক্ষীরা টাউন গার্লস হাইস্কুলে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর শিক্ষাকতার পাশাপাশি খুলনা সুন্দরবন ‘ল’ কলেজে অধ্যায়ন করেন। ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ শ্রীউলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে আশাশুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলী হয়ে কর্মজীবন চালাতে থাকেন এবং শিক্ষকতার পাশাপাশি নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য আশাশুনির প্রাণ কেন্দ্রে একটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। অবশেষে সর্বস্তরের জনগনের সহযোগিতায় ১৯৮৫ সালে বালিকা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকুরী ইস্তফা দিয়ে আশাশুনি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৮৫ সালের মে মাসের ২১ তারিখে সাজ্জাদুর রহমান মুকুল এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিন দুই কন্যা এবং একটি পুত্র সন্তানের জননী। সন্তানরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত। ২০১১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর স্বামীর আকষ্মিক মৃত্যু হয়। ২০০১ সাল হতে যশোর শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজী প্রথম পত্রের পরীক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন। বর্তমানে তিনি আশাশুনি উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা পদোন্নতি কমিটির সদস্য, উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য, নারী উন্নয়ন, বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ, নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধ কমিটির সদস্য। এছাড়াও তিনি থানা পর্যায়ে ১৯৯৮ সালে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে পুরষ্কার গ্রহণ করেন। ২০০১ সালে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে পুরষ্কার গ্রহণ করেন এবং জেলা পর্যায়েও শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুরস্কার গ্রহণ করেন। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে ২০০৪ সালে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে পুরষ্কার গ্রহণ করেন। এছাড়াও অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে সভাপতি ও সদস্য হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। আর এভাবে এগিয়ে চলেছেন শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী কামরুন নাহার।
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাজমুন নাহার জানান, এক সময়ের সমাজের অসহায় নারী যারা কঠোর পরিশ্রমে আজ নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমরা তাদের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মসূচীর আওতায় খুজে বের করে সম্মাননা প্রদান করেছি। এই সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে অনুপ্রেণিত হয়ে জীবন-জীবিকার মান উন্নত হয়ে তারা আরো এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।