বাংলাদেশ: দুর্যোগে দুর্ভোগে পদক্ষেপ


প্রকাশিত : মে ৫, ২০১৯ ||

পঞ্চানন মল্লিক
প্রিয় বাংলাদেশ দুর্যোগে দুর্ভোগে পতিত হয় প্রায় প্রতি বছর। বলা যায় দুর্যোগ এ দেশবাসির নিত্য চলার সাথী। প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগের সাথে সংগ্রাম করে প্রায়ই টিকে থাকতে হয় দেশের অনেক মানুষকে। এসব দুর্যোগের মধ্যে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস অন্যতম। এতে আক্রান্ত হয় এদেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন এখন এক নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। হঠাৎ করে আক্রান্ত হয়ে জানমাল খোয়াতে হয় উপকূলবাসির। বিগত দিনে কয়েকটি বড় বড় ঘূর্ণিঝড় এদেশের দক্ষিণভাগকে ক্ষত বিক্ষত, বিপর্যস্ত করেছে। কেড়ে নিয়েছে হাজার হাজার প্রাণ। ক্ষতি হয়েছে ফসল, গবাদি পশু ও সম্পদের। একটার ক্ষত শুকাতে না শুকাতে এসে হাজির হয় আরেকটা। এমনিভাবে এসেছে সিডর, আইলা, নার্গিস, রোয়ানু, মহাসেন মোরাসহ আরও অনেক বড় বড় ঝড়। এসব ঝড়ের ভয়ঙ্কর চেহারা ও ক্ষয় ক্ষতির কথা মনে পড়লে এখনো আতঙ্কিত হতে হয়। চলতি সময়ের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ‘ফনী’ জনমনে বেশ আতঙ্ক ও উৎকন্ঠার সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত অনেকটা দুর্বল হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় এতে অতিতের তুলনায় ক্ষয় ক্ষতির পরিমান অনেক কম হয়েছে। তাছাড়া এবারের ঝড়ে মানুষের মধ্যে পূর্ব প্রস্তুতি মূলক সচেতনতা ব্যপক লক্ষ্য করা গেছে। প্রশাসনিক তৎপরতা, পর্যাপ্ত সংখ্যক সেচ্ছাসেবক, রেডক্রিসেন্ট প্রভৃতির সহায়তায় ঝড়ের সংকেত পাওয়ার পর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে সচেতন করা ও আশ্রয় কেন্দ্রে আনা সম্ভব হয়েছে। এতে লক্ষ্য করা গেছে মানুষের মধ্যে দূর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রস্তুতিমূলক সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। প্রলয়ংকারী এসব ঝড়ের কেন্দ্র বিন্দু হচ্ছে বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর। উত্তাপের কারনে সাগরে উত্তাল তরঙ্গ ও প্রচন্ড ঘূর্ণি বাতাসের সৃষ্টি হয়। ক্রমান্বয়ে ঘুরতে ঘুরতে এ ঝড় স্থল ভাগের দিকে অগ্রসর হয়। এক সময় উপকূলে আছড়ে পড়ে, আঘাত হানে মানুষের ঘর বাড়ি ও জানমালের উপর। উপকূলবর্তি এলাকার নদী নালা ও চর অঞ্চলে স্বাভাবিক জোয়ারের তুলনায় পানি অনেক বৃদ্ধি পায়। দমকা হাওয়া বইতে থাকে। কখনো কখনো বৃষ্টিও থাকে সাথে। প্রচন্ড ঘূর্ণি বাতাসে কাঁচা ঘর বাড়ি, গাছের ডাল ভেঙে চুরমার হয়। গাছপালা উপড়ে পড়ে। উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় এলাকা। তাই এসব ঘূর্ণিঝড় আসলে মানুষের বিপদ বা দুর্ভোগের আর সীমা থাকেনা। প্রথমত এসব বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার মত মজবুত ঘর বাড়ি অধিকাংশ উপকূলবাসির নেই। উপকূলে বসবাসকারী লোকজন সাধারণত নি¤œবিত্ত বা দরিদ্র শ্রেণির। তাদের ঘর বাড়ি অধিকাংশ কাঁচা এবং এ রকম ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষার জন্য সহনশীল নয়। তাই এসব দুর্যোগের সময় মানুষ নিরাপত্তার অভাবে অসহায়ত্ব বোধ করে। অসহায় হয়ে সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা করা ছাড়া আর তেমন কোন উপায়ান্ত থাকেনা। অবশ্য উপকূলবাসিদেরকে এমন দুর্যোগকালিন সময়ে সহায়তা প্রদান বা রক্ষার জন্য সরকারি উদ্যোগে উপকূল অঞ্চলে ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্র বা সাইক্লোন শেল্টার। দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথে এসব আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণ করার জন্য বলা হয়ে থাকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব আশ্রয় কেন্দ্রে সময় মত আশ্রয় গ্রহণে মানুষের মধ্যে অনিহা লক্ষ্য করা যায়। মানুষ সাধারণত তাদের সংসারের জিনিসপত্র, গৃহপালিত পশুপাখি এসব রেখে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে চায় না। তাই যতটা সম্ভব বিপদের ঝুঁকি নিয়ে এসব আগলে রাখার জন্য নিজের বাড়িতেই থেকে যান। তাছাড়া আশ্রয় কেন্দ্রগুলো অনেক ক্ষেত্রে দুরবর্তি স্থানে অবস্থিত হওয়ায় মানুষ সময় মত সেগুলোতে পৌঁছাতে পারেন না। কেউ কেউ একেবারে শেষ মূহুর্তে বিপদ নাকের ডগায় আসলে ছোটেন আশ্রয় কেন্দ্রে। এ কারণে পথিমধ্যে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে যায়। উপকূলবর্তি অঞ্চলে এসব আশ্রয় কেন্দ্রের অপ্রতুলতা একটা বড় সমস্যা। আশ্রয় গ্রহণকারী মানুষের তুলনায় আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা কম। তাছাড়া স্কুল হিসেবে ব্যবহারের জন্য এর কোন কোনটি উপকূল হতে দুরবর্তী স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে প্রয়োজনের সময় এগুলো মানুষের উপকারে আসে কম। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে পর্যাপ্ত স্থান স্বল্পতা। পরিচ্ছ্বন্নতা ও নিরাপদ পরিবেশের অভাবও লক্ষ্য করা যায়। একসঙ্গে একই কক্ষে ভিন্নি ভিন্ন পরিবারের অনেক লোককে অবস্থান করতে হয়। এদের ভিতরে থাকে, শিশু, কিশোরি, প্রতিবন্ধি, বয়বৃদ্ধ ব্যক্তি,রোগাক্রান্ত ব্যক্তি প্রমুখ। রাতের বেলা সেখানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা যায় না। কারণ দূর্যোগের সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকে। মশার উৎপাত সহ্য করে সারারাত অতিবাহিত করা কষ্ঠের ব্যপার হয়ে ওঠে আশ্রয় গ্রহণকারীদের জন্য। তাছাড়া নির্মাণগত ত্রুটির কারণে অনেক আশ্রয়ন কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ফাঁটল বা ঝুঁকি দেখা দেওয়ায় সেগুলো অবস্থানের জন্য অনুপোযোগি হয়ে আছে। এসব সমস্যার কারণে মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রের সুবিধা ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পর্যাপ্ত সংখ্যক আশ্রয় গ্রহণকারীর জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক আশ্রয়ন কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি আশ্রয়ন কেন্দ্রে বর্তমানে বিদ্যমান সমস্যাবলি সমাধান কল্পে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতি জরুরি। দূর্যোগ যখন এদেশের মানুষের নিরন্তন সঙ্গী,দূর্যোগে যখন হানি হয় মানুষের জীবন ও সম্পদের, তখন দূর্যোগকালিন সময়ে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণির জীবনের সার্বিক নিরাপত্তা এবং সম্পদ ও ফসলাদি রক্ষায় প্রয়োজনীয় কার্যকরি ব্যবস্থা সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জনসংখ্যার অনুপাতে পর্যাপ্ত সংখ্যক আশ্রয় কেন্দ্র নির্মান করতে হবে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে বিকল্প আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। নারী, শিশু, গর্ভবতি মহিলা, প্রতিবন্ধি, অসুস্থ্য ব্যক্তি, বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য আলাদা আলাদা অবস্থান কক্ষের ব্যবস্থা আশ্রয় কেন্দ্রে থাকতে হবে। মশার উপদ্রোপ থেকে রক্ষার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলো স্কুল হিসেবে ব্যবহার না করে কেবলমাত্র মানুষের দূযোর্গকালিন আশ্রয়ের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে। তাহলে দূর্যোগে দূর্ভোগের হাত থেকে মানুষকে অনেকটা নিরাপদে রাখা সম্ভব হবে। তবে কেবল মাত্র মানুষের কথাই নয়। দুর্যোগকালিন গৃহপালিত পশু পাখি ও মানুষের সাংসারিক জিনিসপত্র রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টির প্রতিও আমাদের খেয়াল করতে হবে। গৃহপালিত পশু পাখি রক্ষায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক কেল্লা বা উঁচু স্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা যতটা কার্যকরি ও উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবো ততই দুর্যোগের ক্ষয় ক্ষতির হাত থেকে জানমালকে আমরা সহজে রক্ষা করতে পারবো। লেখক: কবি ও কলামিস্ট