বাল্য বিবাহ


প্রকাশিত : মে ১১, ২০১৯ ||

সাহানা মন্ডল

সদ্য কিশোরী মেয়ে, বয়স তখন মাত্র সাত।
ভবিষ্যত জীবন সম্পর্কে কোনো ধ্যান ধারণা হয় নি সদ্য কিশোরী মেয়ে টার।
বন্ধু দের সঙ্গে খেলাধূলো, আপন মনে প্রকৃতির রসাস্বাদন। রঙবেরঙিন পাখি দেখে মনের মধ্যে প্রাণোচ্ছলতা, বর্ষার বৃষ্টিতে কচু পাতা মাথায় নিয়ে পাঠশালায় ছোটা। পন্ডিত মশাই এর কাছে শিক্ষা নেওয়া। ফিরতি পথে আবার খেলাধূলা, আম বাগানে চুপিসারে আম কুড়ান। এই ছিলো প্রাত্যহিক জীবন।

প্রাণোচ্ছল খামখেয়ালি জীবনে হঠাৎ ঘটল পরিবর্তন। একদিন পাঠশালা থেকে ফিরে দেখে তার বাড়ি ভর্তি লোকজন।সঙ্গে সঙ্গে কৌতুহলী মেয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করে এরা কারা ? কেনো এসেছে আমাদের বাড়ি ?
মা বলে তোর শ্বশুর বাড়ির লোক এরা।তোর বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেছে ।
কিছুই মাথায় ঢোকে না সাত বছরের মেয়ে টার।
সে হেসে বলে বসে…
পুতুল খেলতে খেলতে যেমন পুতুল এর বিয়ে হয় সে রকম মা!
মা বলে হ্যাঁ।
খামখেয়ালি মনে খুব আনন্দ তার। পুতুলের মতো বিয়ে হবে তার।
সেদিন সবাই ফিরে গেছে।

বেশ কিছু দিন পরে একদিন হঠাৎ লালটুকটুকে শাড়ি পরিয়ে কপালে চন্দন লেপে, গলায় ফুলের মালা পরিয়ে বসিয়ে রাখলো তার মা।
মেয়ে বলল… এমন করে কেনো সাজালে মা?
মা বলল… পাগলী মেয়ে আজ তো তোর বিয়ে।
সত্যি কারের ছেলে পুতুল এসে আজ তোকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। এবার থেকে তুই ওদের বাড়ি থাকবি।
মেয়ে শুনে কাঁদছে। বলছে মা তোমায় ছেড়ে থাকব না মা। খেলা হয়ে গেলে আমি এখানেই থাকব।
মা বোঝাচ্ছে না না বিয়ে হয়ে গেলে সেখানে থাকতে হবে। শুনে ছোট মেয়ে টা কাঁদছে বলছে পুতুল খেলবো না আর।
তোমার কাছে থাকব।

সন্ধ্যা নেমেছে। বাড়ি ভর্তি লোকজন। কতো সব নিয়ম কানুন করে সদ্য অবলা কিশোরী মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল মাঝ বয়সী ছেলের সাথে। এবার যাওয়ার পালা।
যাওয়ার আগে বাচ্চা মেয়ে টা তীব্র কান্নায় ভেঙে পরেছে। কেউ কর্ণপাত করলো না। সদ্য কিশোরী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে চলে গেল শ্বশুর বাড়ি। সংসার জীবনের কিছুই বোঝেনা তবুও করে দেওয়া হলো সংসারি।
স্বামী, সম্পর্ক, আলাপন কিছুই বোঝেনা সে। হাউমাউ করে কাঁদে প্রতি রাতে। কেউ শোনে না তার কান্না ।
এভাবেই তিনটে মাস কাটলো। সে মায়ের কাছে এসেছে।
তার রূঢ় অভিজ্ঞতার কথা সব অকপটে মা কে বললো।
কেমন নর পিশাচের হিং¯্র থাবার স্বীকার হয় সে প্রতি রাতে। যন্ত্রণায় ছটফট করে সে।
সব শুনে তার মা তাকে বলল…
প্রতিটা মেয়ের জীবন এমন। মানিয়ে নিতে হবে মা। দেখবি আসতে আসতে সব সহ্য হয়ে গেছে।
কাঁদিস না। যা শ্বশুর বাড়ি চলে যা।
আবার শ্বশুর বাড়ি ফিরে এলো। বেশ অনেক দিন কেটে গেছে। এবার এই ছোট্ট কিশোর বয়সী মেয়েটা গর্ভবতী হয়ে গেছে। মায়ের কাছে খবর যে পৌঁছাল।
মা তো শুনেই অবাক!
একি কথা? মেয়ে কবে ঋতুমতী হলো?
একেবারে গর্ভবতী?
এই টুকু মেয়ে টা পারবে আর একটা নতুন প্রাণের জন্মদিতে?
মেয়ে নিজে কিছুই বোঝেনা। কষ্ট হলে খালি কাঁদে।
এভাবেই কেটে গেল দশ টা মাস।
আর্ত যন্ত্রণায় চিৎকার করছে সে।
সবাই বললো দাই মাকে খবর দাও, শুভক্ষণ এসে গেছে। বংশধর আসছে।
দাই মা খবর পেয়ে এলেন।
মায়ের বুকে বিশাল ভয়। কি জানি কি হবে?
মেয়েটা পারবে এতো যন্ত্রণা সহ্য করে নতুন প্রাণের জন্ম দিতে? কতোটুকু বয়স ওর?
তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে।
এবার মা কাঁদছে। দাই মা বলছে চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে।
কেটে গেছে কয়েক ঘন্টা। মেয়ে নিস্তেজ হয়ে আসছে। চিৎকার করার ক্ষমতা প্রায় আর নেই। এভাবে কয়েক মিনিট। ব্যাস সব শেষ।

ঐ অল্প বয়সে নিজের শরীরে পরিপক্বতা আসে নি। সে কিভাবে জন্ম দেবে আর একটা নতুন প্রাণের?
অকালে চলে গেল ফুলের মতো দুটো প্রাণ, অবিবেচক সিদ্ধান্তের কারণে ।
আজও ভাবলে ভীষণ ভয় লাগে, কেনো প্রচলন হয়েছিল এই বাল্য বিবাহ প্রথার?

কোনো উত্তর জানা নেই…