নুড়ির গল্প


প্রকাশিত : মে ১১, ২০১৯ ||

গৌরী সর্ববিদ্যা

নুড়ি মেয়েটি খুব চঞ্চল। সারাদিন এঘর ওঘর ঘোরাঘুরি করেই তার দিন কাটে। মা, বাসাবাড়িতে কাজ করে বলে রান্নাটা তাকেই করতে হয়। তাদের টিনের চালের একটা ঘর আছে।ঘরের পাশে ডাল ছড়ানো একটা উঁচু গাছ, গাছটা অনেক পুরোনো।
সামনে রহমান সাহেবের একটা ছয়তলা বাড়ি।
রহমান সাহেব ছিলেন, যুদ্ধে বিপদে পড়া অনেক মানুষের আশ্রয়দাতা। তিনি নিজের চিন্তা না করে যুদ্ধের সময় অনেক লোককে আশ্রয় দিয়েছেন। সেই পরিবারবর্গের জন্যে নিজের জায়গাতে তাদেরকে থাকার বাসস্থান করে দিয়েছেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বড় ছেলেকে বলে গেছেন যেন তাদেরকে কখনো ঐ জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়া না হয়।

ছয়তলা বাড়ির ২য় তলায় রহমান সাহেবের বড় ছেলে থাকেন। তাঁদের ড্রয়িং রুমের দেওয়ালে একটা বড় টিভি আছে, সেটা গাছ থেকে পরিস্কার দেখা যায়। তাই নুড়ির ফাঁকে ফাঁকে গাছের ডালের উপর উঠে টিভি দেখার জন্যে।
টিভিতে একটা হিন্দি ছবি দেখাচ্ছে। নুড়ি দেখে নিশি ও নিশাদ টিভি দেখছে আর খাবার খাচ্ছে। একজনের হাতে আইপেড ও আরেকজনের হাতে লেপটপ। নুড়ি এইসবের নাম জানেনা, নিশির থেকে শুনেছে সে কিন্তু তারা গরীব বলে ওখানে যাওয়া নিষেধ আছে। একদিন নিশির মা’য় কথাটা বলেছিলেন নিশিদের সাথে কম মিশতে, তাই ওখানে তেমন যাওয়া হয়না নুড়ির।
নিশি ও নিশাদ হচ্ছে খালেদ সাহেবের ছেলে মেয়ে। রহমান সাহেবের বড় ছেলের নাম খালেদ রহমান।

নুড়ি ভাবছে, ওরা ওখানে বসে কি খাবার খাচ্ছে! নিশ্চয় খুব মজার খাবার! কিছুক্ষণ পর দেখে কিছু খাবার খেয়ে বাকি খাবারটা ময়লার বাক্সে ফেলে দিলো! নুড়ির খুব লোভ হচ্ছিল তখন ফেলে দেয়া খাবারগুলো খাবার জন্যে।
নুড়ি ভাবলো ইস্ ওরা কত সুখে আছে! দামী দামী খাবার খাচ্ছে, দামী কাপড় পড়ছে, কত কত খেলনা তাদের ! কত সুন্দর গুছানো ঘর, আমাদের তো কিছুই নেই!
হিন্দি ছবি কিছুই বুঝেনা নুড়ি। মনে মনে ভাবে এটা আবার কোন ভাষা!
নুড়ির বাবা রিক্সা চালক।রোজ রাত নয়টায় বাসায় আসে। সেদিনও একই সময়ে এসে নুড়িকে বলে, এই নুড়ি আমি তাড়াতাড়ি হাত পা ধুয়ে আসি, আমাকে ভাত দে, খুব ক্ষীদে পেয়েছে।
নুড়ি ঝোল ঝোল করে রান্না করা শাক দিয়ে তার বাবাকে ভাত দিয়ে বলে, বাবা তুমি খেয়ে নাও, আমি খাবো না!
তার শুধু ফেলে দেয়া খাবারগুলির কথা মনে পড়ছে! নুড়ির বাবা ভাত মেখে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে বলে মাগো, রাতে না খেয়ে থাকতে নেই! মেয়েকে খুশি করার জন্যে বলে, কাল টাকা পেলে তোর জন্যে একটা সুন্দর থেকে জামা আনবো রে নুড়ি!

নুড়ি বলে উঠে না বাবা, জামা নয়, আমার জন্যে একটা টিভি নিয়ে এসো। ওরা হিন্দি ছবি দেখে, আমি কিছু বুঝতে পারিনা তাই আমি বাংলা ছবি দেখবো।
সেকি রে, একটা টিভির তো অনেক দাম। এতো টাকা পাবো কোথায়?
নুড়ি তখন জিজ্ঞেস করে আচ্ছা বাবা, ওরা বাংলা ছবি দেখেনা কেন? হিন্দি ভাষা তো আমি কিছুই বুঝিনা! তোমরা আমাকে হিন্দি শেখাওনি কেন?
নুড়ির বাবা নুড়িকে বুঝিয়ে দেয়, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা তাই আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি!
মাতৃভাষা কি বাবা?
মায়ের কাছ থেকে শেখা ভাষাকে মাতৃভাষা বলে।
রফিক, শফিক, সালাম, বরকত ও জব্বার ও আরও অনেক শহিদের রক্তের বিনিময়ে আমরা মাতৃভাষাকে পেয়েছি! যেটা একুশে ফেব্রুয়ারি নামে পরিচিত।

তুমি এতো কিছু জানো কিভাবে বাবা! নুড়ির বাবা তখন চুপ করে থাকে। নুড়ি দেখছে তার বাবার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
আবার বলে নুড়ি, বলোনা বাবা! তখন বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নুড়িকে বলে, আমার বাবা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক, তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তখন আমার বয়স ছিল দশ বছর। যুদ্ধের ছয বছর পর দাদু মারা যান, তার কিছুদিন পর মা’কে হারালাম।

দাদু যতদিন বেঁচে ছিলেন, দাদুর কাছ থেকে একটু আধটু শেখা। আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলনা বলে পড়ালেখা করতে পারিনি। ছোটবেলা থেকেই নিরুপায় হয়ে রিক্সা চালানো শিখেছি পেটের ভাত জোগাড় করার জন্যে। আত্মীয়স্বজনরা কেউ এসে আমার পাশে দাঁড়াননি। মাথা গোজার ঠাঁই ছিলো বলে কোনরকমে ডালভাত খেয়ে দিন যাপন করছি।
আর কি কি হয়েছিলো বাবা যুদ্ধে! আমি সবকিছু শুনতে চাই। বাবা বললো, আজ থাক, অনেক রাত হয়েছে, শুয়ে পড়ো।
কাল একুশে ফেব্রুয়ারি। আমাদের মাতৃভাষা দিবস। কালকে তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবো। বাকিটা তোমাকে ওখান থেকে আসার পরে বলবো।

এইদিকে নিশির টিভি দেখা, গেইম খেলা কিছুই ভালো লাগছে না। কখন যে বাবা, মা ফিরবে বাসায়! নিশির বাবা বড় শিল্পপতি, সকালে যান আর রাতে আসেন আর মা সারাদিন মার্কেট, পার্টি এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ান। কাজের মেয়ে আছে সেই ঘরের সবকিছু সামলায়।
নিশিদের বারান্দায় একটা দোলনা আছে। নিশি দোলনায় দুলতে দুলতে বাবা মেয়ের আদর ভালোবাসাগুলো উপভোগ করে।
সে ভাবে, ইস্ ওরা কত আনন্দে আছে! নুড়ির বাবা কি সুন্দর করে খাইয়ে দিচ্ছে নুড়িকে আর তার ছোট বোনটিকে।
আমার বাবা তো এইভাবে কোনদিনও আমাদেরকে আদর করে খাওয়াননি! নুড়ির বাবার মতো কোলে মাথা রেখে ঘুম পাড়াননি। নানান রকম খেলনা কিনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমরা যে বাবা মা কে পাশে চাই সবসময়। আমারও তো নুড়ির মতো আমার বাবার কাছ থেকে গল্প শোনার শখ ছিলো। বাবা তো কোনদিনও একটা গল্প শোনাল না। তাহলে কি কালকে যাবো নুড়িদের বাড়ি, ওর বাবার কাছে গল্প শুনতে?

সকালে নুড়িকে নিয়ে গেলো তার বাবা শহিদ মিনারে। সবার সাথে নুড়িও ফুল দিলো। নুড়ি খুব খুশি শহিদ মিনারে ফুল দিতে পেরে।
নিশি ও নিশাদ গেছে তাদের স্কুলে। তারাও শহিদদের উদ্দেশ্যে ফুল নিবেদন করলো। স্কুল থেকে তারা বাসায় না গিয়ে সোজা নুড়িদের ঘরে চলে গেলো। মা যাতে জানতে না পারে, নিশি আগেও কয়েকবার লুকিয়ে লুকিয়ে গেছে নুড়িদের ঘরে।
নুড়ির বাবা আজকে রিক্সা চালাতে বের হননি, পুরোদিন ঘরে থাকবেন। তাই নুড়ি, তার ছোট বোন, নিশি ও নিশাদকে নিয়ে বসলো গল্প শোনাতে।

একদিন আমরা পাড়ার ছেলেরা মিলে খেলছিলাম, মা উঠোনে কাঁথা সেলাই করছেন, হঠাৎ বাবা এসে মাকে বললেল, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। শহর এখন বেশ গরম, কখন কি হয় ঠিক নেই। তুমি বাবা মা আর ছেলেকে নিয়ে কোথাও চলে যাও। পরিস্থিতি শান্ত হলে আমি গিয়ে নিয়ে আসবো। আমি এখানে থাকবো। আমার মা বাবাকে একা রেখে যেতে রাজি হলেন না।

বাবাকে দেখতাম উঠোনে বসে কয়েকজনের সাথে কথা বলতে। বলতেন, যাদের ঘরে যত অস্ত্র আছে, সবগুলো একসাথে এনে এক জায়গায় রাখতে। আমি সব লুকিয়ে লুকিয়ে শুনতাম। বাবার সাথে যারা যুদ্ধ করেছেন, সবাই আমাদের বাড়িতে একটা রুমে থাকতেন। একজন আরেকজনের পরামর্শ নিতেন। বাবা ঘর থেকে বের হলে অনেকেই বাবাকে ধমকি দিতেন তিনি যেন এইসব কাজ না করেন। বাবা কিছুই শুনতেন না। বেশ কয়েকদিন যাবার পর কয়েকজন লোক এসে বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। লোকগুলোর চেহারা ঢাকা ছিলো তাই দেখতে পায়নি। এরপর বাবা আর কোনদিনও ফিরে আসেননি। পরে শুনেছি যুদ্ধ করার অপরাধে বাবাকে ওরা অনেক কষ্ট দিয়ে মেরেছে। কিছুদিন পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

আজকে তোমরা গেছো শহিদ মিনারে ফুল দিতে। সেটা হলো ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির দিন যে বর্বর হত্যাকা- সাধিত হয়েছিল তা স্মরণ করার জন্যে প্রতি বছর ভাবগম্ভীর পরিবেশে শহিদ দিবস উদযাপন করা হয়।
শুধু ততটুকুই সীমাবদ্ধ নয়, একুশে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবেও।