সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে সেই এসও কবিরের বিদায়


প্রকাশিত : মে ৩১, ২০১৯ ||

শ্যামনগর প্রতিনিধি: অবশেষে সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে এসও কবীর উদ্দীন বিদায় নিতে বাধ্য হলেন। সব চেষ্টা আর তদ্বীর ব্যর্থ হওয়ায় চলতি সপ্তাহে তিনি খুলনা ডিএফও অফিসে যোগদান করেছেন।
তবে বিদায় পূর্ব সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসও কবীর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ উগরে দেন। সাংবাদিকদের কারণে তার সাতক্ষীরা রেঞ্জে থাকার ইচ্ছার যবনিকা ঘটেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য কবীর উদ্দীন সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালীনি স্টেশন অফিসের এসও (স্টেশন অফিসার) হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। প্রায় আড়াই বছরের এ কর্মস্থলে (সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালীনি স্টেশনে) থাকার সময়ে তিনি বেশুমার লুটপাট আর দুর্নীতি করে বারবার শিরোনাম হয়েছেন।
স্থানীয় জেলে বাউয়ালীসহ সাংবাদিকরা সোচ্চার হলেও এতদিন পর্যন্ত এসও কবীর উদ্দীনের দুর্নীতির লাগাম টানতে পারছিলেন না। বরং সাতক্ষীরা রেঞ্জের এক প্রভাবশালী বন কর্মকর্তার আশ্রয়ে কবীর উদ্দীন সবকিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করে দিব্যি সুন্দরবনকে নিয়ে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
আগাগোড়া দুর্নীতিতে মোড়ানো কবীর উদ্দীনের লাগামহীন দুর্নীতির বিষয়ে একাধিকবার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রমানসহ সংবাদ প্রকাশ হয়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়ে স্থানীয় জেলে বাউয়ালীরা বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমুহে একাধিক লিখিত অভিযোগও করেন।
স্থানীয় সুত্রমতে সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালীনি ষ্টেশনে যোগদানের পর থেকে কবীর উদ্দীন সুন্দরবনকে নিয়ে বানিজ্যে মেতে ওঠেন। তার বেশুমার দুর্নীতির কারনে অপরাপর বনকর্মীসহ বন কর্মকর্তারা পর্যন্ত লজ্জা পেতেন। অভিযোগ রয়েছে সুন্দরবনের কাঠ পাচার থেকে হরিণ শিকারসহ যাবতীয় অপকর্মের সাথে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। সাংবাদিক পরিচয়দানকারী স্থানীয় এক অপরাধীর সাথে মিলে কবীর উদ্দীন সুন্দরবন থেকে পারশে মাছের রেনু শিকারসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন।
তার এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে বার বার উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর সম্প্রতি কবীর উদ্দীনকে সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তবে বদলীর ‘অর্ডার’ হওয়া সত্ত্বেও তিনি বন ও পরিবেশ উপমন্ত্রীসহ উপর মহলে ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ করেন পুনরায় সাতক্ষীরা রেঞ্জে থেকে যাওয়ার জন্য। কিন্তু বিভাগীয় বনকর্মকর্তাসহ উর্ধ্বতন কিছু নীতিবান কর্মকর্তার দৃঢ় ভূমিকার কারনে শেষ পর্যন্ত দুনীিিতবাজ কবীর উদ্দীনকে তল্পিতল্পাসহ সাতক্ষীরা রেঞ্জ ত্যাগ করতে হয়েছে।
এদিকে কবীর উদ্দীনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ ছেড়ে যাওয়ার খবরে স্থানীয় জেলে ব্য়াালীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বুড়িগোয়ালীনি গ্রামের আমির আলী ও দাতিনাখালীর শহিদুল ইসলামসহ অনেকে জানায়, কবীর জেলেদের উপর জুলুম করতো। নিজে বিভিন্ন জেলেকে অভয়ারন্যে পাঠিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিতেন। আবার চুক্তিমত কমিশন দিতে ব্যর্থ হলে একই জেলেকে আটক করে মামলায় দেয়ার ভয় দেখিয়ে দ্বিগুন টাকা আদায় করতেন। এমনকি নীলডুমুর খেয়াঘাট সংলগ্ন কয়েক জন চোরকারবারীর সাথে মিলে কবীর উদ্দীন গভীর সুন্দরবনে পারশে মাছের রেনু শিকারের জন্য ইঞ্জিন চালিত নৌকা পাঠাতেন বলেও জানায় তারা।
সুন্দরবন সংলগ্ন কয়েকটি গ্রামের মানুষ জানায় বুড়িগোয়ালীনির এসও থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি তিনি মুন্সিগঞ্জ টহল ক্যাম্প এবং গোলপাতা কূপের দায়িত্ব পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। কবীর উদ্দীন নির্ধারিত সময়ের আগেই চুক্তিতে মৌয়ালদের দিয়ে মধু কাটানোসহ সুন্দরবন থেকে শত শত মন কাঠ পাচার করেছেন। অনেক সময় তিনি অভয়ারন্য থেকে জেলেদের আটক করে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে দুই তিন দিন পর্যন্ত জিম্মি রেখে ঐসব জেলে পরিবারের নিকট থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপন আদায় করেছিলেনন।
প্রসংগত উল্লেখ্য তিনি তার অধিনস্থ বনকর্মীদের দিয়ে শ্যামনগরের বিভিন্ন ‘স’-মিল থেকে সুন্দরবনের কর্তন নিষিদ্ধ কাঠ চেরাই করে নিজের বাড়িতে পাচার করেছেন। যার অংশ হিসেবে গত ২৪ ফেব্রুয়ারী তিনি নিজের এক অধিনস্থ বনকর্মীকে দিয়ে নওয়াবেঁকী বাজারের ‘স’ মিল থেকে দশ টুকরা কাঠ চেরাই করিয়ে আনেন। পথে কোন সমস্যা যেন না হয় সে জন্য তিনি তার অফিসিয়াল সিল ব্যবহার করে একটি অগ্রায়নপত্র ঐ বনকর্মীর হাতে ধরিয়ে দেন।
সাংবাদিক পরিচয় দানকারী স্থানীয় এক চোরকারবারীর সাথে মিলে কবীর উদ্দীন সুন্দরবনকে ঘিরে তার অপরাধ জগৎ গড়ে তুলেছিলেন বলেও দাবি অসংখ্যা জেলে বাউয়ালীদের।
এদিকে এমন একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে সরিয়ে নেয়ায় উর্ধ্বতন বন কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তার নির্যাতনের শিকার জেলে বাউয়ালীরা।



error: Content is protected !!