ভাঙতে হবে কিশোরী অপুষ্টির দুর্বল চক্র


প্রকাশিত : জুন ৩, ২০১৯ ||

মো. আবদুর রহমান
ডলি (১৪) ও পলি (১২) দু’বোন। ওরা গ্রামের এক হাই স্কুলে পড়ে। ওদের বাবা একজন কৃষক। আর মা গৃহিনী। ওদের বাবা-মা’র দুঃখ যে, জন্মের পর থেকেই ওরা দু’বোন প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছে। একারণে ডলি ও পলির স্বাস্থ্য খুব খারাপ এবং প্রায়ই অসুস্থ থাকে। তাই ওরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না, পড়াশুনায় মন বসে না এবং পড়া সহজে শিখতে ও তা মনে রাখতে পারে না। এজন্য ডলি ও পলি পরীক্ষায়ও ভাল ফলাফল লাভ করতে পারে না।
এ সম্পর্কে খুলনা শিশু হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. প্রদীপ দেবনাথ এর সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, ডলি ও পলির মতো বাংলাদেশের অসংখ্য কিশোরী নানা কারণে জন্ম থেকেই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। তিনি আরও জানান, পুষ্টিহীনতার কারণে কিশোরী মেয়েদের স্বাস্থ্যের গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয় না, বয়স অনুযায়ী তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ঘটে না এবং মেধারও যথাযথ বিকাশ হয় না। এমনকি বয়স অনুযায়ী কিশোরীদের ওজন ও উচ্চতা যতটা হওয়া উচিত, অপুষ্টিতে আক্রান্ত কিশোরীদের ক্ষেত্রে তাও হয় না। কিশোরী মেয়েদের শরীরের এ অবস্থা তার নিজের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানব জীবনের ১০-১৯ বছর পর্যন্ত বয়সকে বলা হয় কৈশোরকাল। জীবনের এসময়টি মেয়েদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় দেড় কোটিই হলো কিশোরী। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অসচেতনতা এবং আরও নানা বৈষম্য ও অবহেলার কারণে আমাদের দেশে একজন কিশোরী কন্যা সন্তান তার সমবয়সী একজন কিশোর ছেলে-সন্তানের চেয়ে কম পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার এবং স্বাস্থ্য সেবা ও যতœ পেয়ে থাকে। অথচ এ সময়েই মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ পরিপূর্ণতা লাভ করে। তাই জীবনের এই বয়ঃসন্ধিক্ষণে কিশোরীদের বাড়ন্ত শরীরের জন্য প্রয়োজন সঠিক ও পরিমাণমতো পুষ্টিকর খাবার। তাছাড়া আজকের স্বাস্থ্যবান কিশোরী মেয়েটি হবে আগামী দিনের সুস্থ ও পুষ্ট সন্তান জন্মদাত্রী। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুষ্টি নির্ভর করছে আজকের কিশোরী মেয়ের পুষ্টির ওপর। কিন্তু আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য থেকে বঞ্চিত কন্যা শিশুরাই বড় হয়ে অপুষ্ট কিশোরীতে পরিণত হয়। যারা আবার পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠে বঞ্চিত নারী ও মা। প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে গর্ভকালীন সময়ে আরও একবার বৃদ্ধি পায় তাদের অপুষ্টির মাত্রা। এই অপুষ্ট ও দুর্বল মায়েরাই আবার জন্ম দেয় স্বল্প ওজনের অপুষ্ট শিশু। এই শিশুরা নানা রোগে ভুগে এবং অপুষ্টির শিকার হয়। বাংলাদেশের এই দুর্বল পুষ্টি চক্র বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে। অপুষ্টির এই দুর্বল চক্রটি ভেঙ্গে দেয়ার লক্ষ্যে জন্মের পর থেকেই প্রতিটি কন্যা সন্তানকে মায়ের বুকের দুধসহ পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার খেতে দিতে হবে। আর তাই বলা যায়-‘কন্যা শিশুর পুষ্টি, আসবে জাতির মুক্তি।’
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, কিশোরীর স্বাস্থ্য ভাল রাখতে হলে সঠিক ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি প্রয়োজন। বিশেষ করে কৈশোরকালীন অবস্থায় শরীর দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দেহের কাঠামোগত বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন প্রোটিন জাতীয় পুষ্টি উপাদান। প্রোটিন ছাড়া দেহের বৃদ্ধি হয় না। আর উদ্ভিদ থেকে যে সমস্ত প্রোটিন পাওয়া যায় তাকে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন বলা হয়। দুধ, দই, ছানা, মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি হলো প্রাণিজ প্রোটিন। বিভিন্ন প্রকার ডাল, মটরশুঁটি, বরবটি, সিম, সিমের বীচি, চীনাবাদাম ইত্যাদি হলো উদ্ভিজ্জ প্রোটিন। দেহের বৃদ্ধির জন্য এ দু’প্রকার প্রোটিনই প্রয়োজন হয়। কম খরচের প্রোটিন হিসেবে আমরা ডালকে গ্রহণ করতে পারি। মাছ অথবা মাংসের দাম বেশি বলে সব সময় তা খাওয়া যায় না। তবুও যদি সপ্তাহে দু’দিন অল্প পরিমাণে ছোট মাছ খাওয়া যায়, তবে প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা অনেকাংশে পূরণ হয়। চালের প্রোটিন ও ডালের প্রোটিন একত্রিত হয়ে উন্নতমানের প্রোটিন তৈরি হয়। তাই ভাত ও ডাল একত্রে খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভাল। প্রতিদিন ভাতের সাথে প্রচুল ডাল খাওয়ার অভ্যাস করলে স্বাস্থ্য ভাল থাকবে এবং দেহের বৃদ্ধি পাবে।
প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের সাথে প্রয়োজনীয় ভিটামিন না পেলে কিশোরীরা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যায়। কিশোরীদের শরীরে ভিটামিন ‘এ’র অভাব যাতে না হয় সেজন্য প্রচুর পরিমানে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, কলিজা, মাখন এবং গাঢ় সবুজ ও হলুদ রঙের শাক-সবজি ও ফলমূল বিশেষ করে পাকা আম, পেঁপে, কাঁঠাল, কলা, পেয়ারা, আনারস, কচুশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, লালশাক, বাঁধাকপি, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি খেতে দিতে হবে। কৈশোর বয়সে বিভিন্ন রকম খনিজ লবণের প্রয়োজন হয়। এর ভেতরে ক্যালসিয়াম ও লৌহ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। গুড়, ডিম, দুধ, দই, শুঁটকি মাছ, ডাল, কাঁটাসহ ছোট মাছ ইত্যাদিতে বেশি ক্যালসিয়াম আছে। ক্যালসিয়ামের অভাব হলে মেয়েদের কোমরের হাড় ঠিকমত বড় হয় না। হাত পায়ের হাড়ও ঠিকমতো বড় হয় না। এর ফলে কিশোরী মেয়েরা বেশি লম্বা হয় না। যে সব মেয়েরা পাঁচ ফুটের বেশি লম্বা হয় না তাদের সন্তান প্রসবে কষ্ট হয়। অনেক সময় মা ও শিশু উভয়ই মারা যেতে পারে। এজন্য মেয়েদের কমপক্ষে ৫ ফুটের বেশি লম্বা হওয়া প্রয়োজন। কৈশোর বয়সে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খেলে মেয়েরা লম্বা হয়। গুড় একটি খুব ভাল ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার। প্রত্যেকদিন গুড় দিয়ে রুটি, মুড়ি, চিড়া অথবা অন্য যে কোন খাবার খাওয়া খুব ভাল। এক গ¬াস দুধে যে পরিমাণ ক্যালসিয়াম আছে, এক চামচ ঝোলা গুড়ে সেই পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে। প্রতিদিন এক চা চামচ করে ঝোলা গুড় তিনবার করে খেলে শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব হয় না।
সাধারণতঃ ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের রক্তের হিমোগে¬াবিন পরিমাণ কম থাকে। আমাদের দেশের অধিকাংশ কিশোরীই ঋতুচক্র শুরু হলে রক্ত স্বল্পতায় ভোগে। এই ঘাটতি পূরণের জন্য কচুশাক, লাউশাক, লাল শাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক, পুঁইশাক ইত্যাদি সকল প্রকার সবুজ শাক-সবজিতে প্রচুর লৌহ আছে। গুড়, কলিজা, ডিম, শুঁটকি মাছ ইত্যাদিতেও প্রচুর লৌহ জাতীয় পুষ্টি উপাদান থাকে। লৌহ সমৃদ্ধ খাবার খেলে শরীরে রক্ত তৈরি হয়। রক্ত কম থাকলে দেহের বৃদ্ধি হয় না। দেহের সুষ্ঠু বৃদ্ধির জন্যনিয়মিত প্রতিদিন সবুজ শাক-সবজি খাওয়া প্রয়োজন। ভিটামিন ‘সি’ জাতীয় খাবার লৌহকে দেহের ভেতরে যেতে সাহায্য করে। তাই কিশোরীরা যদি প্রতিদিন নিয়মিত একটু ভিটামিন ‘সি’ বা টক জাতীয় খাবার যথা- আমলকি, পেয়ারা, লেবু, আমড়া, কামরাঙ্গা, কুল ইত্যাদি খায় তবে রক্তস্বল্পতা খুব সহজেই দূর করতে পারবে। পানি পরিপাক ক্রিয়ার একটি উলে¬খযোগ্য উপকরণ। স্বাভাবিক হজমের জন্য প্রচুর পানি পান করা উচিত। এছাড়া পূর্ণ বয়স্কদের তুলনায় কিশোরীরা ছুটাছুটি বেশি করে বলে তাদের শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম নির্গত হয়। দেহে পানির সমতা ঠিক রাখার জন্য কিশোরীদের প্রতিদিন অন্ততঃ ৭-৮ গ¬াস আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করা উচিত।
এদেশে অনেক মেয়েদের কিশোরী অবস্থায় বিয়ে হয়, যা মোটেও কাম্য নয়। ফলে একজন কিশোরী যৌবন প্রাপ্ত হবার আগেই হন ‘কিশোরী মা’। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিশোরী মা একজন অপুষ্ট মা। এই অপুষ্ট মায়ের কোল জুড়ে যে সন্তান আসে সেই সন্তানও হয় অপুষ্ট। ফলশ্রুতিতে মা এবং শিশু উভয়ের জীবন হয় বিপন্ন। এভাবে কিশোরী মা ও শিশুর মৃত্যু হার বেড়ে যায়। তাই কিশোরী অবস্থায় কোন মেয়ের বিয়ে দেয়াও ঠিক নয়। আঠারো বছরের পর বিয়ে দিলে মা এবং সন্তানের অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
সর্বোপরি, পুষ্ট এবং সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে সকল প্রকার বৈষম্য ও বঞ্চনা দূর করে কিশেরী কন্যা সন্তানকে তার সমবয়সী একজন কিশোর ছেলে সন্তানের ন্যায় একই পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার ও আদর-যতœ দিয়ে তাদের লালন-পালনের প্রতি সকল মা-বাবারই আরও সচেষ্ট ও সচেতন হতে হবে। নইলে, ডলি ও পলির মতো দেশের কন্যা সন্তানেরা জন্ম থেকে অপুষ্টিতে ভুগতেই থাকবে। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস রূপসা, খুলনা