চার সদস্যের তদন্ত টিম আসছেন আজ সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজে বিপুল পরিমান ওষুধ ক্রয় নিয়ে তোলপাড়


প্রকাশিত : জুন ১২, ২০১৯ ||

এম জিললুর রহমান: সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য বিপুল পরিমান ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে। গেল বছরের ৩জুন এসব ওষুধ ক্রয় করা হয়। এরসাথে এমএসআর সামগ্রী, সার্জারী যন্ত্রাংশ, ভারী যন্ত্রাংশ ও ফার্ণিচারও রয়েছে। মেডিকেল কজেল কর্তৃপক্ষের দাবী ১২ কোটি ৯০ লাখ টাকার এসব ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ে কোন অনিয়ম হয়নি। তবে অন্যান্য সূত্র বলছে ক্রয়ের পরিমান প্রায় ১৭ কোটি টাকা। যেখানে ছাত্ররা পড়ালেখা করবে সেখানে বিপুল পরিমান ওষুধ ক্রয় নিয়ে বিতর্কের জেরে ইতোমধ্যে তদন্তকার্য শুরু হয়েছে। অধিদপ্তরের নির্দেশে আজ বৃহস্পতিবার খুলনা বিভাগীয় পরিচালক ডা: রাশিদা সুলতানাসহ ৪ সদস্যের তদন্ত টিম আসছেন। টিমের অন্যান্যরা হলেন খুলনা বিভাগের ডিডি, এডি ও এও রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানাগেছে, বিগত ১৭-১৮ অর্থ বছরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমএসআর, সার্জারী, ফার্ণিচার, ওষুধসহ বিভিন্ন দ্রবাদি ক্রয় করা হয়। ক্রয়ে কি পরিমান মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা এখনও নির্ণয় করা যাইনি। তবে ক্রয় তালিকা চাওয়া হলে মেডিক্যালের অধ্যক্ষ ডা: কাজী হাবিবুর রহমান দিতে অস্বীকার করেন। এমনকি দেখতে চাইলেও তিনি দেখাননি। তিনি বার বার বলেন, ক্রয়ে কোন সমস্যা নাই। এটি ডক ইয়ার্ড নৌবাহিনীর মাধ্যমে ক্রয় করা হয়েছে।
এদিকে এসব পন্য সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান উত্তরা ঢাকার বেনি ভোলেন্ট এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারি শাহিনুর রহমান বুধবার দুপুরে তার ব্যক্তিগত সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রকার কেমিক্যাল, সার্জিক্যাল, সিরিঞ্জ, ক্যাডগার্ড, সুতাসহ এমএসআর এর বিভিন্ন সামগ্রী তিনি সরবরাহ করেছেন। যার পরিমান দুই কোটি টাকা। অপরদিকে পল্লবী ঢাকার অনিক ট্রেডার্স এর স্বত্তাধিকারি মহশীন উদ্দীন সোহান টেলিফোনে জানান, তিনি বিভিন্ন প্রকার বইপত্র, ফার্ণিচারসহ অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করেছেন। বিল নিয়েছেন ৯কোটি ৬৯ লক্ষ ৮২ হাজার টাকা।
পাশাপাশি সাতক্ষীরা মেডিকেলের একাধিক সূত্র জানান, এখানে গেল অর্থ বছরে ওষুধ ও লিলেন সামগ্রী ক্রয় করা হয়েছে ২কোটি টাকা, এমএসআর ও ভারী যন্ত্রপাতি ১২ কোটি টাকা ও ফার্ণিচার ক্রয় করা হয়েছে ৩ কোটি টাকার।
এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় সাতক্ষীরা মেডিক্যালের স্টোরকিপার রাকিব হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, ফার্ণিচার ক্রয় করা হয়েছে এক কোটি টাকার। আর ওষুধ কত টাকার ক্রয় করা হয়েছে তা বলতে পারবো না। তবে সব কিছুই স্টোরে আছে। এবিষয়ে মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা: কাজী হাবিবুর রহমান এক প্রশ্নের জবাবে জানান ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে ৫৯ লক্ষ টাকার। মেডিক্যালে ছাত্র/ছাত্রীরা পড়বে এখানে কেন ওষুধ লাগবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার ওষুধ ক্রয়ের সুযোগ আছে তাই ক্রয় করেছি। যা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ব্যবহার করা যাবে।
এদিকে গত বছরের ২৯ আগস্ট সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বধায়ক বরাবর এক পত্রে মেডিক্যাল কলেজ অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান ১৫৮৪ নং স্মারকে জানান, “বিগত ১৭-১৮ অর্থ বছরে পত্র নং-০৬.০২.৬৭৫৮.১৬৫.৫৩.৪০১.১৮.৯৭৭ তারিখ ৩ জুন ২০১৮ সূত্র মোতাবেক ক্রয় কার্য সম্পন্ন করা হয়। উক্ত ক্রয়কৃত এমএসআর সামগ্রীর মালামালের মধ্যে সার্জারি ও অন্যান্য বিভাগের প্রয়োজনীয় সার্জিক্যাল ও অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতি অন্যান্য দ্রব্যসহ। পরবর্তীতে এই দ্রব্যগুলি সরকারি বিধি মোতাবেক স্থানীয়ভাবে গঠিত বোর্ড সার্ভে সম্পন্ন করেন। যেগুলি ইতোমধ্যে আমাদের নিকট সংরক্ষিত আছে। এমতাবস্তায় উক্ত এমএসআর সামগ্রীর তালিকা আপনার নিকট অবহিতকরণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য একান্ত অনুরোধ জানাচ্ছি”। অর্থাৎ মেডিক্যাল কলেজের ক্রয়কৃত এমএসআর সামগ্রী ব্যবহার করার জন্য মেডিক্যাল হাসপাতালের তত্ত্বধায়ককে অনুরোধ জানালে তিনি এসব এসএমআর ও ওষুধ সামুগ্রী গ্রহণ করেননি।
তবে ক্রয়কৃত এমএসআর সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে, ক্যাডগার্ড-০১, ক্যাডগার্ড-১/০, আইভি ক্যানোলা ১৮/২০/২২/২৪ গেজের, টাইটিনিয়াম ক্লিপ ফর ল্যাপরেসকপি, পুরুষের ইউরেটরি ডাইরেটরি সেট, মহিলার ইউরেটরি ডাইরেটরি সেটসহ ৫৩ প্রকারের সার্জিক্যাল আইটেম ক্রয় করা হয়। এছাড়াও ওষুধের মধ্যে রয়েছে ইনজেকশন কার্ডিনেক্স ৮০,৬০ এবং ৪০ গ্রাম। ইনকেশান ম্যাকজোলিন আর, ইন-সিপিম ১গ্রাম, মেরোপেনাম, মক্সসিলিভ ১গ্রাম, মক্সসিলিভ ৬০০ গ্রাম, ট্যাবলেট ইসোমো প্রাজল ২০ এমজি, ট্যাব ওসাটিল ৫০ এমজি, ট্যাব এ্যাটোভা ১০এমজি, মন্টিলাক-১০ এমজি, মেটফ্রোমিন ৫০০এমজি, মেটফ্রোমিন ৮৫০এমজি, ট্যাব গ্লুকোট্যাব-৮০এমজিসহ ১৭ প্রকারের ওষুধ ক্রয় করা হয়। এছাড়াও লিলেন সামুগ্রীর মধ্যে রয়েছে, বেডসিট, ব্লাঙ্কেট, ব্লাঙ্কেট কভার, ট্রাউজার সিট নারী ও পুরুষসহ মোট ৭আইটেমের পন্য ক্রয় করা হয়েছে। একই সাথে ওটি এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশ ক্রয় করা হয়েছে ১১ আইটেমের।
এসব বিষয় নিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে বসেই কথা হয় অধ্যক্ষ ডা: কাজী হাবিবুর রহমানের সাথে। যেখানে রুগী নাই, যেখানে ওটি বা অপরেশনের কাজ নাই সেখানে এসব ওষুধসহ অন্যান্য জিনিস ক্রয়ের কি প্রয়োজন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন সব কিছুই মেডিক্যাল কলেজের আওতায়। তাই আমি সব কিছুই ক্রয় করতে পারি। তাহলে আপনার দেয়া ওষুধ ও সার্জিক্যাল যন্ত্রাংশ কেন হাসপাতালের তত্ত্বধায়ক নিলেন না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি তার ব্যাপার।
তবে এসব বিষয়ে রাতে কথা হয় মেডিকেল হাসপাতালের বর্তমানে (ওএসডি) তত্ত্বধায়ক ডা: শেখ শাহজান আলীর সাথে। তিনি বলেন, আমাকে ওষুধসহ অন্যান্য সার্জিক্যাল যন্ত্রাংশ নেয়ার জন্য যে পত্র মেডিক্যালের অধ্যক্ষ দিয়েছিলেন এটি নেয়ার কোন বৈধতা আমার ছিল না। কারণ মেডিক্যাল হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ সরকারের পৃথক দুটি প্রতিষ্টান। এটি আমাকে নিতে হলে উর্দ্ধতন কর্মকর্তার নির্দেশ মোতাবেক চাহিদাপত্র পাঠানোর পর তখন দিলে নেয়া যাবে। অবশ্য এবিষয়ে আমি সুনিদিষ্ট পরামর্শ দিয়ে একটি পত্র দিয়েছিলাম। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি যদি ওই পন্য গ্রহণ করতাম তাহলে দুদক আবার বুড়ো বয়সে আমাকেই খুজে বেড়াতো।
সর্বশেষ সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজে ওষুধ ক্রয়ের বিষয়ে কতটুকু বৈধতা আছে জানতে কথা হয় স্বাস্থ্য বিভাগের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক ডা: রাশিদা সুলাতানার সাথে। তিনি বলেন, মেডিক্যাল কলেজে ওষুধ কেনা হয় এই ধরনের ঘটনা আমার জানা নেই।