বীর মুক্তিযোদ্ধা স. ম. আলাউদ্দীনের সংক্ষিপ্ত জীবনী


প্রকাশিত : June 18, 2019 ||

মীর জিল্লুর রহমান
মহান মুক্তিযোদ্ধের অন্যতম সংগঠক জীবদ্দশায় অসম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে সমাজ পরিবর্তনের ও দুর্নীতিমুক্ত আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বিপ্লবী আদর্শের বীর সৈনিক রূপে স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তার আদর্শ ও জীবন আচারণে সকলকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করবে। একাত্তরের অকুতোভয় বীর সেনানী স.ম আলাউদ্দীন জন্ম গ্রহণ ১৯৪৫ সালের ২৯ শে আগস্ট তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের মিঠাবাড়ী গ্রামে। পিতা মরহুম সৈয়দ আলী সরদার। স.ম আলাউদ্দীন ১৯৬২ সালে এস.এস.সি ১৯৬৪ সালে এইচ.এস.সি. ১৯৬৭ সালে খুলনা বি.এল কলেজ থেকে বি.এ এবং ১৯৭৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাশ করেন।
সে সময় দেশের রাজনীতি তুঙ্গে। তিনিও সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রথম ছাত্রলীগ পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তারপর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দক্ষতার সাথে সাংগঠনিক পরিচয় দিয়ে সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে গিয়ে একাধিকবার কারাবরণ করেন। এক পর্যায়ে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য স.ম আলাউদ্দীন ও ছাত্র নেতা মোস্তাফিজুর রহমানসহ অনেকেই ভারেতে গমন করেন। অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক তৎকালীন পশ্চিম বাংলার অর্থমন্ত্রীর পুত্র তুষার কান্তি ঘোষের সাথে বৈঠক করেন তারা। স.ম আলাউদ্দীন তৎকালীন বি.এস.এফ এর পশ্চিম বাংলার প্রধানের সাথে একটি বৈঠকে মিলিত হন। এরপর শুরু হয় অস্ত্র প্রশিক্ষণ, আর পি আব্দুল হাকিম সাহেবের নেতৃত্বে তৎকালীন সাতক্ষীরা থানার পিছনে সবজি বাগানে (বর্তমান থানা সম্মুখস্থ পুলিশ ক্লাব) মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। ৩০ শে মার্চ একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। এদিকে এপ্রিলের শুরুতেই পাকিস্তানী দোসররা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প স্থাপন শুরু করলে এর পরে দ্বিতীয় সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ভোমরা কাস্টম অফিসের সন্নিকটে স্থানান্তর করা হয় বলে জানা যায়। মুজিবনগর সরকারের তহবিলে অর্থ যোগান দেওয়ার জন্য পরিকল্পনা করে ২৯ শে এপ্রিল গভীর রাতে সাতক্ষীরা ন্যাশনাল ব্যাংক অপারেশন করা হয়। এদিকে ব্যাংকের পুরো অর্থ ও স্বর্ণ উদ্ধার করা না গেলেও ব্যাংকে গচ্ছিত দুই কোটি আট লক্ষ টাকার মধ্যে এক কোটি ছিয়াশি লক্ষ টাকা ও বেশ কিছু স্বর্ণ একটি পিকআপ ভ্যানে করে ভোমরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে অবস্থিত প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের কাছে পৌছিয়ে দিতে সক্ষম হন। আর এটাই ছিল বাংলাদেশী প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের তহবিলে বড় অংকের অর্থ যোগান। সেখানে স.ম আলাউদ্দীন, ক্যাপ্টেন শাহাজান মাষ্টার, মোস্তাফিজুর রহমান, মোড়ল আব্দুস সালাম, সুভাষ সরকার, কামরুল ইসলাম খান প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা ছিল অদম্য সাহস এবং নির্লোভী। সেখানেও স.ম আলাউদ্দীনের ভূমিকার কমতি ছিল না। এদিকে খুলনা অঞ্চলে নৌ-যুদ্ধে লেঃ কর্ণেল মোঃ রহমতউল্লাহ দাদুর নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে অংশগ্রহণ করেন তিনি।
স.ম আলাউদ্দীন তার কর্ম জীবনে তালা থানাধীন জালালপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও পাটকেলঘাটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে কিছুদিন শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি সমাজসেবক হিসেবে বঙ্গবন্ধু পেশাভিত্তিক স্কুল এ- কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন। সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্স, ভোমরা স্থল বন্দর সমিতি, জেলা ট্রাক মালিক সমিতি, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি, সাতক্ষীরা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটিসহ অসংখ্য সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি ছিলেন। এদিকে সাতক্ষীরার দৈনিক পত্রদূত এর সম্পাদক হিসেবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তার ভূমিকা ছিল চির স্মরণীয়। এই নিরপেক্ষতার কারনে তার জীবনে নেমে এলো সেই ভয়াল রাত। দিনটি ছিল ১৯৯৬ সালের ১৯ শে জুন। সাতক্ষীরা নিজ পত্রিকা অফিসে প্রতি দিনের ন্যায় কর্মরত অবস্থায় সন্ধ্যা শেষে বাজে রাত ১০টা ২৩ মিনিট। শব্দ শোনা যায় গুলির। মানুষ তখন দিশেহারা হয়ে দিকবিদিক ছুটতে থাকে। এক পর্যায় শোনা গেল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক, প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা সমাজ পরিবর্তনের বীর সেনানী লক্ষ জনতার জননেতা দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের তথা সাতক্ষীরা উন্নয়নের স্বপ্নদ্রষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা স.ম আলাউদ্দীন আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক পুত্র ও পাঁচ কন্যা- তাছাড়া ভাই বোন অসংখ্য গুণগ্রাহী অনুসারীদের রেখে যান। তার সন্তানদের মধ্যে কন্য লায়লা পারভীন সেজুঁতি পিতার হত্যার বিচারের জন্য আজও বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ও অপেক্ষায় আছেন। এই সেজুঁতি বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সদস্য সচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করে তার বাবার অসমাপ্ত কাজ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। প্রতিবারের ন্যায় এবারও ১৯ শে জুন পাটকেলঘাটা আলাউদ্দীন চত্ত্বরে খুনিদের বিচারের দাবীতে এক স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেই সভায় দাঁড়িয়ে প্রতিবারই স.ম আলাউদ্দীন খুনের ন্যায় বিচার চাওয়া হয়। কিন্তু আজও তার খুনের বিচার হয়নি-আর কখনও হবে কি? লেখক: মীর জিল্লুর রহমান, সভাপতি, মুক্তিযোদ্ধা মোড়ল আঃ সালাম ফাউন্ডেশন, উপজেলা কমিটি, তালা, সাতক্ষীরা।