স ম আলাউদ্দিন হত্যাকা-ে বিচারহীনতার বিড়ম্বনা


প্রকাশিত : June 18, 2019 ||

মো. আনিসুর রহিম
১৯ জুন ১৯৯৬। রাত ১০টা ২৩ মিনিট। থ্রি নট থ্রি কাটা রাইফেলের গুলিতে বীরমুক্তিযোদ্ধা স ম আলাউদ্দিনকে হত্যা করা হয়। সাতক্ষীরা সদর থানার দক্ষিণ-পূর্ব কোনার দোতলা বাড়ির নিচের তলায় তখন দৈনিক পত্রদূত অফিস। তার দক্ষিণ পাশের ভবনে দৈনিক সাতক্ষীরা চিত্র অফিস। সেদিন ১২ জুন জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স ম আলাউদ্দিন দৈনিক পত্রদূত পত্রিকার কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে উপ-নির্বাচনের ফলাফল দেখছিলেন। এ সময় আকষ্মিকভাবে গুলির শব্দ। স ম আলাউদ্দিনের মাথার পিছন দিকে গুলি ঢুকে মাথার সামনে দিয়ে বের হয়ে যায়।
গুলির শব্দে আমি সাতক্ষীরা চিত্র পত্রিকা অফিস হতে তাৎক্ষণিক বের হয়ে রাস্তায় আসি। দু’জনকে দ্রুত রুহুল আমিনের বাড়ির সামনে দিয়ে চলে যেতে দেখে ‘ধর, ধর’ বলে চিৎকার দিতে থাকি। সদর থানা থেকে এসআই শাহিন, এসআই হুমায়ুন, এসআই মেজবাহসহ একজন সশস্ত্র কনন্সটেবল বের হয়ে আসেন। সকলে আততায়ীদের তাড়া করে নিয়ে যান। পত্রদূত অফিসের পিয়ন রব আমাকে জোরে জোরে ডাকতে থাকলে আমি ভিতরে গিয়ে দেখলাম, আলাউদ্দিন ভাইয়ের ঘাড় কাত হয়ে হেলে পড়েছে। মেঝেতে রক্ত গড়িয়ে মেঝে রক্তে ভাসিয়ে ফেলছে। তাৎক্ষণিক আমার পত্রিকা অফিসে গিয়ে এসপি ডিসি এনএসআইসহ সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের এম্বুলেন্সের জন্য খবর পাঠাই। ওসি সিএ হালিম নিজেই তার পিকআপ ভ্যানে আলাউদ্দিন ভাইকে তুলে নিয়ে দ্রুততার সাথে সদর হাসপাতালে চলে যান। ঐ রাতেই আমার সন্দেহের কথা ওসি সিএ হালিম, এএসপি সার্কেল মাওলা বকস, ডিএসবি ওসি মনিরুজ্জামানসহ আমার সহকর্মী কয়েকজনকে বলেছিলাম। ঐ রাতেই মনিরুজ্জামান আমাকে বলেছিলেন আপনার দেয়া তথ্য পুলিশের দ্বারাই আসামীদের কাছে পৌছে গিয়েছে। আপনি খুব সাবধানে থাকবেন। দুইদিন পর এসপি আব্দুস সাত্তার আমাকে বললেন, খুব সাবধান। রাতে ঘুমানোর আগে নিজের খাটের তলা চেক করে ঘুমাবেন। জেলা প্রশাসক আব্দুস সালামও আমাকে সতর্ক করলেন এবং পিস্তল কেনার পরামর্শ দিয়ে আবেদন করতে বললেন। আমার আয়কর টিআইএন নাম্বার না থাকায় আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া হয়নি।
২৩ জুন ১৯৯৬। এসপি আব্দুস সাত্তার আমাকে প্রথম খবরটা দেন। মূল রাইফেল সুটারের একজন গ্রেপ্তার হয়েছে। আপনি যা বলেছিলেন আমরা সেরকমই তথ্য পেয়েছি। ওসি সিএ হালিমও আমাকে একই তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করেছিলেন। তবে মূল আসামী বা লাটভাই গডফাদার গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত পত্রিকায় সন্দেহজনকভাবে কোন নাম লিখবেন না।
শুটার আসামী যুবলীগ কর্মী সাইফুল ইসলাম তার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট সুশেন চন্দ্র রায়ের আদালতে স ম আলাউদ্দিন হত্যাকা-ের পরিকল্পনাসহ সামগ্রিক তথ্য ফাঁস করে দেয়। ১৬৪ ধারার জবানবন্দির কপি সাংবাদিক পাওয়ার আগে হত্যাকারী গডফাদার আগে পেয়ে যায়। তারা সকলে সেদিন থেকে নিরাপদে পালিয়ে যায়।
স ম আলাউদ্দিনকে কারা কেন কীভাবে হত্যা করেছিল তার সঠিক বিবরণ সাইফুল ইসলামের জবানবন্দিতে উল্লেখ ছিল। ১৯৯৬ থেকে ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ। দীর্ঘ ২৩ বছর পার হয়ে গেছে। কত শত মানুষ বিজ্ঞ জনেরা লক্ষ কোটি টাকায় বেচা কেনা হয়েছে। আদালতের বিচারকদের ৬ ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখাসহ সাংবাদিকদের দ্বিধা-বিভক্তির মাঝে ফেলা হয়েছে। আজও হত্যাকারীদের পক্ষে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ আদাজল খেয়ে পক্ষপাতে অনড় থাকেন লজ্জাহীনভাবে।
হত্যাকারীদের অপরাধের কোন শেষ নেই। শুরু থেকে অদ্যাবধি তাদের অপরাধকর্ম সাতক্ষীরার সামাজিক রাজনৈতিক প্রশাসনিক অপরাপর সকল মহলে বিরাজমান। আর সে কারণেই চাঞ্চল্যকর স ম আলাউদ্দিন হত্যা মামলার বিচার কার্য বার বার বিড়ম্বনার মাঝে নিপাতিত হচ্ছে। বিলম্বিত বিচার বিচারহীনতার নামান্তর মাত্র। সৎ সাংবাদিকতায় যারা বিশ্বাস করেন তারা আজও আলাউদ্দিন হত্যা মামলার বিচার দেখে যেতে চায়। সাতক্ষীরা জেলার সর্বস্তরের মানুষ চায় স ম আলাউদ্দিন হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক- দৃষ্টান্ত স্থাপন হোক। লেখক: সম্পাদকম-লির সভাপতি, দৈনিক পত্রদূত।