শহিদ স.ম আলাউদ্দিন মিশে আছে সাতক্ষীরার মাটি ও মানুষের হৃদয়ে


প্রকাশিত : জুন ১৮, ২০১৯ ||

মো. জাবের হোসেন
সাতক্ষীরার সকল মানুষ স.ম আলাউদ্দিনের এক নামে চেনে। শুধু সাতক্ষীরা নয়, সমগ্র দেশবাসী কম-বেশি স.ম আলাউদ্দিনের নাম শুনেছে। এক নামেই অনেকের কাছে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে শহিদ স.ম আলাউদ্দিন আধুনিক সাতক্ষরীরার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। আজ সেই মানুষটির ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুবার্ষিকীতে তার রুহের মাগফেরাম কামনা করি।
তিনি চেয়েছিলেন সাতক্ষীরাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস তার সেই আশা আর আকাঙ্খা তিনি পুরণ করে যেতে পারেন নি। ঠিক ১৯৯৬ সালের আজকের এই দিনে নিজ পত্রিকা অফিসে ঘাতকের বুলেটের আঘাতে জর্জরিত হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। নিজ পত্রিকা অফিসেই কর্মরত অবস্থায় ঘাতকের গুলিতে তিনি প্রাণ হারান। দেশে কোন পত্রিকার সম্পাদক হত্যাকা-ের এটিই প্রথম ঘটনা। পুলিশের তদন্তে সাতক্ষীরার সবচেয়ে প্রভাবশালীদের নাম উঠে আসে এই হত্যা মামলার আসামী হিসেবে। এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চেলের বিভিন্নস্থানে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে উঠে তখন।
সাতক্ষীরা মহকুমার নগরঘাটার মিঠাবাড়ি গ্রামে তিনি এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শহিদ স. ম আলাউদ্দিন শৈশব থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সমাজের অসহায়-নির্যাতিত, লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে থাকেন সেই অল্প বয়স থেকেই। মানুষের অসহনীয় দুর্দশা আর হতাশা অনুভব করে সত্যের জয়গান গাইতে কলমের বারুদ নিয়ে গর্জে ওঠেন স.ম আলাউদ্দিন। অল্প বয়স থেকেই একের পর এক জনসেবামূলক কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি নিরক্ষরের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে শিক্ষকতা পেশাও বেছে নিয়ে ছিলেন। এজন্য নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছিলন বঙ্গবন্ধু পেশাভিত্তিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
তিনি ছিলেন একজন সৎ ও ধর্মভীরু ব্যক্তি। তিনি বাঙালী সংস্কৃতির ধারক বাহক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি লেখক কবি সাহিত্যিক ও শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও দৈনিক পত্রদূত নামে পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছিলেন।
সাতক্ষীরার এক দুঃসাহসিক বৈপ্লবিক জননেতা ছিলেন শহিদ স.ম আলাউদ্দিন। যার স্মৃতি হৃদয় পটে ভেসে ওঠায় চোখের দুটি কোণ ভরা ভরা নোনা জলরাশিতে ফেঁপে ফেঁপে ওঠে। তিনি যখন শাহাদাত বরণ করেছেন তখন আমি ছিলাম একটি শিশু। তবুও জন্মের পর থেকে বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশি সবার কাছ থেকে শুনে শুনে বড় হয়েছি আর ভেবেছি আহ্ কখনো কি আর আমরা এমন একজন মানুষকে আর সাতক্ষীরাবাসী পাবো? শুধু মনে প্রশ্নই থেকে যায়। কেন জানি হৃদয়ের অতল থেকে অজান্তে ‘আহ্’ শব্দটি মুখ ফসকে বাতাসের গন্ধে কম্পিত হয়ে মিলিয়ে যেতে থাকে।
যিনি আজো হাজারো পাঠকের হৃদয়গ্রাহী হয়ে অমর হয়ে আছেন, যার জন্য ধন্য ধন্য স্লোগানে আজো মুখরিত হয় আকাশ বাতাস তিনি সাতক্ষীরা জেলাবাসির বড় গৌরব ও অহংকার ভরা সৈনিক ছিলেন । তার লেখনির ধ্বনি আর ঝংকিত হয়না, আর তার দিল দরদি কন্ঠে মাটি ও মানুষের কথা, দেশ ও জাতির কথা গর্জে ওঠে না। তাই তাঁর চির নিদ্রাতে আজো কাঁদো কাঁদো সাতক্ষীরার অলি গলি ও হাজারো মানুষের স্মৃতিপট।
তিনি ছিলেন সাতক্ষীরা জেলার উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টিকারী। তিনি আরো ছিলেন এই জনপদের অবহেলিত, অধিকারহারা মানুষের স্বজন ও বিপদের বন্ধু। তাঁর অনেক অবদানের মাঝে আরো রয়েছে প্রতিষ্ঠান নির্মাণ। সমগ্র জীবন অন্যায়, অত্যাচার জুলুম নির্যাতনে, সন্ত্রাসী ও সুদ ঘুষ চোরাচালানের ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন এক প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ও সাহসী সৈনিক।
শহিদ স.ম. আলাউদ্দিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের খাতায় নাম লিখে অস্ত্রহাতে স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। ভারতের বিহার প্রদেশের চাকুলিয়ায় ট্রেনিং নিয়ে ৯ মাস যুদ্ধ শেষে বিজয়ী বেশে তিনি সাতক্ষীরার মাটিতে পৌঁছান।
অথচ পাকিস্তানিদের দোসর স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আলবদর, যুদ্ধাপরাধী, অর্থ লোভী প্রভাবশালী স্বার্থান্বেসী মহলের চক্রান্তে ও পর্দার আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকা সন্ত্রাসীরা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স.ম. আলাউদ্দিনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
তাঁর এই মৃত্যুতে আজো আকাশ-বাতাসে কষ্টের মলিনতা বিরাজিত। এই সংগ্রামী মহানায়ক শহীদ স. ম. আলাউদ্দিনের হত্যা বিচারের দাবিতে সারা বাংলার মানুষ মিছিল মিটিং করার পরেও আজও হত্যা মামলার ফল পাওয়া যায়নি। একের পর এক সভাবেশ করে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর স্মারকলিপি জমা দিয়েও বছরের পর বছর অতিবাহিত করে আজও শেষ হয়নি শহিদ স.ম. আলাউদ্দিন হত্যার বিচার।
শহিদ স.ম আলাউদ্দিন ছিলেন, ১৯৭০ সালের পার্লামেন্টের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। রণাঙ্গনে সরাসরি অস্ত্র হাতে যে কয়েকজন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন তিনি তারমধ্যে অন্যতম। সাতক্ষীরার তালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের জেলা শীর্ষ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও এফবিসিসিআই এর পরিচালক ছিলেন। এছাড়া আরো অনেক পরিচয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সাতক্ষীরার দৈনিক পত্রদূত পত্রিকার সম্পাদক।
তার খুনিরা অবৈধভাবে সাতক্ষীরার মাটিতে গলা উঁচু করে অন্যায় ও দুর্নীতির রাজ্য কায়েম করে চলেছে।সাতক্ষীরাবাসী অধীর আগ্রহে তার হত্যার বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। জানিনা কবে আমরা আমাদের এই মহা নায়কের হত্যার বিচার দেখতে পাবো। লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, লাল সবুজের কথা