একজন স. ম আলাউদ্দীনের খোঁজে


প্রকাশিত : জুন ১৯, ২০১৯ ||

বদরু মোহাম্মাদ খালেকুজ্জামান
১. স. ম আলাউদ্দীন আমার চাচা। চাচা এই অর্থে যে তিনি আমার বাবাকে তাঁর বড় ভাইয়ের জায়গায় বসিয়েছিলেন। সে অর্থে তাঁকে আমি আমার কিশোর বেলায় দেখেছি বাবার রাজনীতির সুবাদে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাবাকে না বলে আমুদিয়া বর্ডার পার হয়ে সোনাই নদী হয়ে বসিরহাটে যাই মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখানোর জন্য। যতদূর মনে পড়ছে বসিরহাটের আকাশবাণী বা বর্ডার ভবন নামের একটি ভবনে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটিং অফিস। দায়িত্বে ছিলেন কামরুজ্জামান টুকুর ছোট ভাই অকাল প্রয়াত আমিরুজ্জামান বাচ্চু। তিনি আমাকে রিক্রুট করে পাঠিয়েছেন ২৪ পরগণার তকিপুর ক্যাম্পে।
২. আমার তখন কতই বা বয়স- পনের কিংবা ষোলো। আমি তকিপুর ক্যাম্পে। এই খবর পৌঁছে যায় আলাউদ্দিন চাচার কাছে। তখন তিনি থাকতেন বসিরহাট হরিমোহন দালান গার্লস স্কুলের সামনের একটি দোতলা বাড়িতে। সেখানে আরও থাকতেন এমপি ইন্তাজ আলী, বাগেরহাটের এমপি আবদুর রহমান, কামরুজ্জামান টুকু, আবদুস সালাম মোড়ল, মোস্তাফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর, জাহিদুর রহমান কুটু প্রমুখ।
আলাউদ্দীন চাচা সংবাদ পেলেন যে আমি তকিপুর ক্যাম্পে আছি। তৎকালীন খুলনার ছাত্রনেতা নূরুল ইসলাম খোকনকে দিয়ে তিনি আমাকে ফিরিয়ে এনে আশ্রয় দিলেন তাদের আস্তানায়। বললেন, সাফ কথা, এখানেই থাকো। আমি তার কথা না শুনে আবার তকিপুর ক্যাম্পে চলে যাই। আবার ফিরতে হলো তার হাম্বিতম্বিতে। আবার পলায়ন। তকিপুর থেকে ট্রানজিট ক্যাম্প তকিপুরের পাশে পিপাতে দু এক দিনের মধ্যে যেতে হবে বিহারে উচ্চতর ট্রেনিংএ। তিনি সরাসরি পিপা ক্যাম্পে গেলেন আমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য। তার কথায় আমি ছিলাম পুঁচকে এক ছোড়া। সুতরাং এড় নধপশ ঃড় ঃযব ারষষধমব. আগস্টের ১০ কিংবা ১২ তারিখের দিকে তৎকালীন ইপিআর সদস্য মতিয়ার রহমান ও আমাকে পাঠানো হল মাগুরার শামসুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করে কিছু খবর সংগ্রহ করার জন্য। তারপর আলাউদ্দীন চাচারা বর্ডার ক্রস করে বাংলাদেশের তালা-সাতক্ষীরায় এলেন। চাচার ছাড়া এ অঞ্চলের কোনো এমএনএ কিংবা এমপির ঘাড়ে রাইফেল দিলো বলে আমার জানা নেই। অধিকাংশ জাদরেল নেতা এবং জনপ্রতিনিধিরা কলকাতা থেকে স্বভূমিতে ফেরেন ৭ ডিসেম্বরের পর। চাচা আলাউদ্দীন সব সময় ছিলেন যুদ্ধের ময়দানে। আমিও তাঁদের সাথেই ছিলাম ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে, যুদ্ধে।
৩. দেশ স্বাধীনের পর স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে বহুবার দেখা হয়েছে। কথা হওয়ার কথাও নয়। কারণ আমি তখন অন্য ধারার রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে ছাত্র হিসেবে জেলার বাইরে।
ছেলেবেলা থেকে লেখালেখির প্রতি ঝোঁক ছিল। এক সময় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার সুযোগ এলো। ওই পথে পা দিয়ে মনে হলো তালা থেকে একটি কাগজ বের করবো। আমি তার রিপোর্টার, আমিই তার সম্পাদক, প্রকাশকও বটে। পাক্ষিক ‘পথে প্রান্তরে’। আলাউদ্দীন চাচাকে পত্রিকাটা দেখানো দরকার।
পাটকেলঘাটা আওয়ামী লীগ অফিসের একটি টেবিলের ড্রয়ারে পত্রিকাটি রেখে এলাম। জাহাঙ্গীর বিশ্বাসকে বললাম সেটি চাচার কাছে পৌছে দিতে।
পরদিন সকাল ১০টা কি ১১টা হবে। অফিসে বসে আছেন চাচাজী। ঢুকতেই জাহাঙ্গীর বললো- শুনেছেন, খালেক ভাই পত্রিকা বের করছেন। তিনি বললেন-‘বাদ দাও তো ওর কথা। ঠিক আছে-ভুল বানান করতো। ঝটপট উত্তর দিলাম- ‘ভূল’।
সেদিন আমার উত্তর শুনে তিনি আমায় এই ভুল বানানে খুশি হয়ে বলেছিলেন- তুমি পারবে।
তারপর আমার পত্রিকার জন্য যাই খুলনা শহরে পরবর্তী সংখ্যা ছাপার জন্য।
২০জুন, ১৯৯৬ দৈনিক জন্মভূমিতে দেখলাম স. ম আলাউদ্দীনের মৃত্যুর খবর। অনেকটা বাজ খাওয়া পাখির মতো আমি, মৃত্যুটা কিভাবে হয়েছে। সে খবর সবাই জানেন। আমি সে কথায় যাব না। আমি শুধু চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করবো- আরেকজন স. ম আলাউদ্দীন কোথায়?
উত্তরটা চাইবো তার রাজনীতিকে পূজি অথবা পাথেয় করে আজও যারা পথ চলেছেন তাদের কাছে। একজন স. ম আলাউদ্দীন চাই আমাদের। শুধু মাত্র একজন স. ম আলাউদ্দীন। আমরা তাঁর পাশে আরেকবার শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে চাই। লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক।