যে সব কারণে স ম আলাউদ্দিনকে হত্যা করা হয়


প্রকাশিত : জুন ১৯, ২০১৯ ||

পত্রদূত রিপোর্ট: বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম আলাউদ্দিন হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত ১০ জন আসামির মধ্যে সাইফুল্লাহ কিসলুর অপমৃত্যু হয়েছে। আজো খুঁেজ পাওয়া যায়নি কিসলুর ম্যানেজার আসামি আতিয়ারকে। মামলায় সে পলাতক রয়েছে। মামলার অপর ৮ জন আসামির মধ্যে কিসলুর ভাই সুলতানপুরের খলিলুল্লাহ ঝড়– এবং আলিপুরের আব্দুস সবুর সাতক্ষীরার সন্ত্রাসী, চোরাকারবারী গড়ফাদার হিসেবে পরিচিত। ঝড়–-কিসলুর আর এক ভাই সন্ত্রাসী মোমিন উল্লাহ মোহন, নগরঘাটার সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ, তার শ্যালক শহরের কামালনগরের সন্ত্রাসী আবুল কালাম, কিসলুর সহযোগী এসকেন্দার মির্জা, প্রাণসায়রের সফিউর রহমান এবং সুলতানপুরের কাজী সাইফুল ইসলাম (পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে আহত) এই মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি।
চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় আসামি কাজী সাইফুলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ভোমরা স্থল বন্দর, সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্সের বিরোধ, কলেজ ছাত্র ভবরঞ্জন হত্যা মামলায় স ম আলাউদ্দিনের বাদী পক্ষে অবস্থান নেওয়া ইত্যাদি বিষয়কে হত্যাকা-ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। সাক্ষীদের জবানবন্দিতেও এগুলো স্থান পেয়েছে।
ভোমরা স্থল বন্দর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। ঐ সময় এ বন্দর প্রতিষ্ঠার জন্য ঢাকা এবং দিল্লিতে দৌড়ঝাপ করেন স ম আলাউদ্দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হওয়ায় তার দেশের ভিতর এবং ভারতে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগোযোগ ছিল। এর ফলে দ্রুত বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। চালু হয় ঐ বছর এপ্রিলে। স ম আলাউদ্দিন সদ্য প্রতিষ্ঠিত এই বন্দর ব্যবহারকারী সমিতির সভাপতি হন। সাতক্ষীরা বড় বাজারের রাস্তায় বসে আটা বিক্রেতা থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হয়ে যাওয়া সবুর সদ্য প্রতিষ্ঠিত এই বন্দর ব্যবহার করে চোরাচালানে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিল না। তা ছাড়া বন্দরের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য স ম আলাউদ্দিনের চিহ্নিত জমি ব্যক্তিগতভাবে দখলের চেষ্টা করতে থাকে ভূমিদস্যু সবুর। এ নিয়ে শুরু হয় বিরোধ।
১৯৮৪ সালে সাতক্ষীরা প্রশাসনিক জেলা হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর চেম্বার অব কমার্সের কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন স ম আলাউদ্দিন। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন বর্তমান পৌর মেয়র এমএ জলিল এবং সহ-সভাপতি স ম আলাউদ্দিন। পরবর্তীতে স ম আলাউদ্দিন সভাপতি নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি ঐ পদে ছিলেন। তার জীবদ্দশায় চেম্বারের সর্বশেষ নির্বাচনের সময় দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন খলিলুল্লাহ ঝড়–। তার পক্ষে মনোনয়ন পত্র কিনে জমা দিতে চান সবুর। স ম আলাউদ্দিন এতে আপত্তি করেন। এ নিয়ে আস্ফালন করে সবুর।
খলিলুল্লাহ ঝড়–র কয়েক ভাই মিলে ঘের করতে যায় তালা উপজেলার নগরঘাটার আসাননগরে। কৃষি জমিতে লোনা পানি তুলে ঘের করার বিরোধী ছিলেন স ম আলাউদ্দিন। তাছাড়া ঐ ঘেরের কর্মচারি জনৈক বাহার আলির অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল এলাকার মানুষ। একপর্যায়ে এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে বাহার আলী ঐ ঘের ছেড়ে চলে যায়। পরে তাকে গুম করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ এনে ঝড়– তার ছোট ভাই একরামুল্লাহ বাবুকে (২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত) বাদী বানিয়ে তালা থানায় স ম আলাউদ্দিনকে আসামি করে মামলা করে। কিন্তু বাহার আলীকে আত্মগোপন অবস্থা থেকে স ম আলাউদ্দিনের লোকজন উদ্ধার করার পর সে মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
একই এলাকায় কলেজ ছাত্র ভবরঞ্জনকে মিথ্যা চুরির অভিযোগ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যা মামলার আসামি ছিলেন নগরঘাটার চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ। সাতক্ষীরায় ব্যাপক আন্দোলন হয় এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে। সাতক্ষীরার অনেক প্রভাবশালী তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও স ম আলাউদ্দিন অবস্থান নেন মামলার বাদী পক্ষে। মামলায় চেয়ারম্যান আব্দুর রউফের সাজা হয়।
এসব ঘটনার কারণে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে স ম আলাউদ্দিনকে হত্যা করে মর্মে মামলার তদন্ত এবং সাক্ষীদের জবানবনিন্দতে উল্লেখ করা হয়েছে।