কামরুল কোম্পানী ও রজব কলুই এর মদদে চলছে জোনাব বাহিনী নয় লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবিতে সুন্দরবনে তিন জেলে অপহৃত


প্রকাশিত : জুন ১৯, ২০১৯ ||

সামিউল মনির, শ্যামনগর: পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের ভিন্ন ভিন্ন এলাকা থেকে একদল বনদস্যু তিন জেলেকে অপহরণ করেছে। নিজেদেরকে জোনাব বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে বনদস্যু দলটি গত ১০ ও ১৬ জুন তারিখে পশ্চিম সুন্দরবনের ইলশেমারী এবং বড়হোগলডাঙা এলাকা থেকে তাদেরকে জিম্মি করে। অপহৃতরা জেলেরা হলো শ্যামনগর উপজেলার পাতাখালীর চন্ডিপুর গ্রামের হাবিবুর গাজীর ছেলে আব্দুল মান্নান (৩২) ও কালিঞ্চি গ্রামের দৈব মন্ডলের ছেলে সুজন মুন্ডাসহ তারালী গ্রামের আপর এক জেলে। মুক্তিপণের দাবিতে জিম্মি জেলেরা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (মঙ্গলবার রাত আটটা) ফিরে আসতে পারেনি। এদিকে মোটা অংক মুক্তিপণ দাবি করায় জিম্মি জেলেদের স্বজনরা অপহৃতদের নিয়ে চরম আতংকে তাকার কথা জানিয়েছে।
অপহৃত জেলেদের স্বজন, প্রতিবেশী এবং স্থানীয়রা জানিয়েছে যে মান্নান, আক্তারুল ও সোহরাব গত ৯ জুন তারিখে বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবনে মাছ শিকারে যায়। এক পর্যায়ে ১০ জুন ভোর পাঁচটার দিকে পাঁচ সদস্যের একটি বনদস্যু গ্রুপ তাদের জেলে নৌকার কাছে এসে তিনজনের পক্ষে আব্দুল মান্নানকে উঠিয়ে নেয়। নিজেদেরকে বনদস্যু জোনাব বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেয়া এসব বনদস্যু তাদের পুর্বানুমতি না নিয়ে বনে প্রবেশ করার অভিযোগে তিনজনের জন্য মাথাপিছু দুই লাখ করে মোট ছয় লাখ টাকা দাবি করে। এক পর্যায়ে ঐ নৌকায় থাকা তিন জেলের পক্ষে বনদস্যুরা মান্নানকে জিম্মি করে নিয়ে যায় এবং তিন দিনের মধ্যে ছয় লাখ টাকা দাবি করে।
সুত্রমতে অপহৃত জেলে মান্নানের পরিবারের সদস্যসহ স্থানীয়রা তার মুক্তিপন বাবদ গত কয়েক দিন ধরে ব্যাপক দেন দরবার চালালেও শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার দুপুরে এসে মুক্তিপণ বাবদ আড়াই লাখ টাকার সীমা রেখা টেনে দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জিম্মি মান্নানের কয়েক নিকটাত্মীয় জানায় দিন এনে দিন খাওয়া এবং অন্যের নৌকার শ্রমিক জেলে হিসেবে কাজ করা আব্দুল মান্নানের পরিবারের পক্ষে এত টাকা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। তারা বিভিন্ন সমিতি এবং এনজিওর কাছে দৌড়াদৌড়ি করেও এত বড় অংকের টাকা সংগ্রহ করতে পারেনি। এমতাবস্থায় জিম্মি মান্নানের ভবিষ্যত নিয়ে নিজেরা রীতিমত শংকার মধ্যে পড়েছে বলে জানান তার স্বজনরা। তাদের অভিযোগ মুক্তিপনের টাকা দাবি করে ফোন দেয়া ০১৮২৭৮৩৮৩৬৫ নম্বরটিতে যোগাযোগ করে মান্নানের সাথে কথা বলার জন্য বার বার চেষ্টা করলেও তাদেরকে মান্নানের সাথে কথা বলতে দেয়া হয়নি।
এদিকে গত ১৬ জুন দুপুরের দিকে পশ্চিম সুন্দরবনের বড়হোগলডাঙা এলাকা থেকে সুজন মুন্ডাসহ অপর এক নৌকা থেকে তারালী গ্রামের এক জেলেকে অপহরণ করেছে জোনাব বাহিনী পরিচয়ে একদল বনদস্যু। বনদস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা এসব জেলেদের নিকটাত্মীয়রা জানিয়েছে তাদের দু’জনের মুক্তিপনের জন্য পৃথকভাবে দেড় লাখ করে মোট তিন লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে।
পশ্চিম সুন্দরবনে কর্মরত জেলে শামিম, সোহরাব, মঈন ও আসলামসহ অনেকে জানিয়েছে জোনাব বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড কয়রার এদাবত এর নেতৃত্বে এসব জেলেদের অপহরণ করা হয়েছে। তারা আরও জানান মুলত কয়রা উপজেলার দোশালী গ্রামের কামরুল কোম্পানীর প্রধান কামরুল এবং তার একান্ত সহযোগী রজব কলই সুন্দরবন সংলগ্ন সাগরে মাছ শিকার করে। তাদের মালিকানাধীন প্রায় ১২০টিরও বেশী কাঁকড়া শিকারের নৌকা এবং ৩৫ টিরও বেশী মাছ ধরার বিশালাকৃতির বোট (ইঞ্জিন চালিত নৌযান) রয়েছে।
সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া শিকারের সাথে জড়িত এসব জেলেরা আরও জানিয়েছে কয়লা, ব্যায়লা, মান্দারবাড়িয়া এলাকাসমুহের উপর এখন কামরুল কোম্পানী ও রজব কলই এর আধিপত্য রয়েছে। এমতাবস্থায় অপরাপর জেলেরা যাতে নোটাবেঁকী, ইলশেমারী, পান্তামারী, আগুনজ¦ালা ও কাজুরদানা এলাকায় ছেড়ে সেসব জায়গার নিয়ন্ত্রণও কামরুল কোম্পানীর হাতে ছেড়ে দেয়- সেজন্য জোনাব বাহিনীকে দিয়ে ঐসব এলাকার জেলেদের উপর অত্যাচার চালানো হচ্ছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত কামরুল কোম্পানীর প্রধান বা জোনাব বাহিনীর কারও সাথে যোগাযোগ করা যায়নি।
তবে সুন্দরবনে কর্মরত অসংখ্যা জেলের অভিযোগ সরকারের দেয়া আত্মসমর্পনের সুযোগ না নিয়ে জোনাব এখনও তার সদস্যদের দিয়ে সুন্দরবনে দস্যুতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের আরও অভিযোগ জোনাব বাহিনী প্রধান সুন্দরবনের বারত সীমান্তবর্তী অংশে অবস্থান নিয়ে গোটা সুন্দরবনে এখন প্রায় একক নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করেছে। তার পক্ষে এবাদত সার্বিক অপতৎপরতা চালালেও মুলত কামরুল কোম্পানীর স্পষ্ট মদদে জোনাব বাহিনী সাম্্রপতিক সময়ে আরও বেপরোয়া হয়েছে উঠেছে।
তবে জিম্মি এসব জেলেদের স্বজনরা জানিয়েছে পুলিশ কিংবা কারও কাছে অভিযোগ করলে অপহৃত জেলেকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি থাকায় তারা বনদস্যুদের সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে জিম্মিদের মুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। যদিও বনবিভাগ এবং পুলিশ সুত্রের দাবি যে কোন জেলে অপহরণের বিষয়ে তাওে কাছে কোন অভিযোগ আসেনি। তবে তারা সুন্দরবনে এখনও তৎপর সর্বশেষ বনদস্যু গ্রুপগুলোকে আইনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও জানান।
এদিকে মঙ্গলবার বিকালে কালিঞ্চি গ্রামের জনৈক আব্দুর রশিদের নৌকা থেকে মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত হওয়া এক জেলে বনদস্যুদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়িতে ফিরেছে বলে স্থানীয় আনছার আলী ও তার ছেলে দাবি করেন। তবে লুকিয়ে ফিরে আসা জেলের নাম এবং কোন বাহিনীর কব্জায় সে ছিল তা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।