কিংবদন্তী মুক্তিযোদ্ধা ফুটবলার হাজী খালেক


প্রকাশিত : June 20, 2019 ||

শফিউল ইসলাম খান: আব্দুল খালেক একটি নাম, একটি ইতিহাস। সাতক্ষীরা শহরের সবাই তাকে হাজী খালেক নামেই চেনে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাহমুদপুরে জন্মগ্রহণ করলেও আলোকিত করেছেন দেশের ক্রীড়াঙ্গণকে। বিশেষ করে যারা ষাটদশকের মানুষ তারা জানেন আব্দুল খালেককে। তাই প্রজন্ম না চিনলেও বাংলাদেশের খ্যাতিমান প্রাক্তন ফুটবল তারকারা আজও তাকে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করেন। ফুটবল জগতের এই নক্ষত্র আব্দুল খালেক আমাদের মাঝ থেকে চির বিদায় হয়েছেন। গত ১৪ জুন সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি ৫ পুত্র, ৩ কন্যাসহ অসংখ্যা আত্মীয় স্বজন-গুণগ্রাহি রেখেগেছেন।
হাজী খালেক বাংলা ৪৪ সালে সাতক্ষীরা মাহমুদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হোসেন আলী। সেই ছাত্রজীবন থেকে খেলেছেন। ষাটের দশক ছিলো তখন ফুটবলের এক দারুণ সময়। তখনই তার ছিলো যৌবন। ফুটবলের প্রতি প্রগাড় ভালোবাসা। আর তাই লেখাপড়ায় বেশিদূর এগুতে পারেননি। সাতক্ষীরা আলীপুর মাঠে খেলা দেখতে এসে পছন্দ হয়ে যায়। আর তাই লেবার অফিসার মঞ্জুরুল হক তাকে চাকুরি দেন দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে। এভাবেই গ্রাম বাংলা থেকে তরুণ বয়সে ফুটবল জগতে উঠে আসা এক ফুটবলারের নাম আব্দুল খালেক। ১৯৬৪ সালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার সময় দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যায়। সাতক্ষীরায় এসে খ্যাতনামা ফুটবলার শওকত হোসেন খান চৌধুরির সাথে যোগাযোগ করে ওয়াপদার এসডিইও আব্দুল মান্নান তাকে ওয়াপদায় চাকুরি দেন। তখন থেকে ওই দলে নিয়মিত খেলেছেন। ওয়াপদা তখন সাতক্ষীরা ফুটবলের প্রথম সারির একটি দল ছিলো। ১৯৬৫ সালে তিনি পাক ভারত যুদ্ধের জন্য দৈনিক ভিত্তিক চাকরি থেকে ছাটাই হন। এ সময় কৃতি ফুটবলার লাবসার ইকবালের হাত ধরে খুলনার গোয়ালপাড়ায় চাকরিতে যোগদেন। তখন থেকে খুলনা গোয়ালপাড়া দলে নিয়মিত খেলতেন। সেখানে একটানা ৭৪ সাল পর্যন্ত খেলেছেন। ৬৬, ৬৭ ও ৬৮ সালে ঢাকা ওয়াপদার নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন। ৬৮ সালে আগাখান গোল্ডকার্প ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেন।
১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিল যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। তিনি খুলনা থেকে চাকরিরত অবস্থায় বেরিয়ে এসে যোগদেন মুক্তিযুদ্ধে। প্রয়াত শাহাজান মাস্টার তাকে পাঠান কোলকাতার ধর্মতলা মোড়ে খ্রীষ্টান গীর্জার পূর্ব পাশে বাংলাদেশ ফুটবল দলের কাছে। সেখানে অনিরুদ্ধ, ধীরু, নওশের, তসলিম, সুভাষ ও ঢাকার সালাউদ্দিনের সাথে দেখা হয়। এখানেই কয়েকদিন পর গঠন করা হয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। এই দলের হয়ে তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে খেলেছেন। জামসেদপুর, মালদহ, বিহার, বর্ধমানসহ বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ খেলে এই দল মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে অর্থ জমা দিতেন। জাকারিয়া পিন্টু এ দলের অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। আব্দুল খালেক ৭৭-৮৬ পর্যন্ত সৌদি আরবে ছিলেন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ইতোমধ্যেই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে সম্মাননা প্রদান করেছে। সাতক্ষীরা পিকে ইউনিয়ন ক্লাবের খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। দুস্থ খেলোয়াড় হিসেবে তিনি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে বেশ কয়েকবার ভাতা পেয়েছেন।
তার সমসাময়িক খেলোয়াড়রা হলেন, মনু, আলফাজ চৌধুরী, ক্যাপটেন শামছুর, মুনসুর আহমেদ, অনাথ বন্দ বসু, কানকাটা মতি, আফসার মাস্টার, হাজু ঘোষ ও ইসমাইল খান।
কৃতি ফুটবলার আফসার মাস্টার বলেন, তিনি আমার বয়সে বড়। তবে মত খেলোয়াড় আর তৈরি হবে না। মুক্তিযোদ্ধা হাসনে জাহিদ জজ বলেন, তিনি একজন খ্যাতিমান খেলোয়াড় এবং ভাগ্যবান মানুষ। যেহেতু তিনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় ছিলেন। সাজেক্রীস এর সাধারণ সম্পাদক একেএম আনিছুর রহমান বলেন, তিনি একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা ও খ্যাতিমান খেলোয়াড়। আমি তাকে স্যালুট জানাই। আব্দুল খালেক একজন কৃতি ফুটবলার। দেশ প্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা। একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। তিনি চলে গেলেও রেখেগেছেন একটি ইতিহাস। তিনি আমাদের স্মরণীয় বরণীয়।