সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় মেটাফোর থেকে মেটাফিজিকস্


প্রকাশিত : June 22, 2019 ||

তৈমুর খান
সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার একটা ধারা যে উপমাত্মক বা রূপকাত্মক পর্যায়ে বেশি চর্চিত হচ্ছে তা সবঃধঢ়যড়ৎ হিসেবে ইতিমধ্যেই পাঠকের মনোযোগ দাবি করতে শুরু করেছে। সবঃধঢ়যড়ৎ আসলে একপ্রকার রূপক অলংকার যা পরোক্ষ উপমা হিসেবেই কাব্যে কবিতায় মূল বিষয়ের প্রতি যথার্থ ইংগিত দেয়।
আমরা যা দেখতে অক্ষম বা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারি না, উপমার দ্বারা তা এমনভাবে কবি উপস্থাপন করেন যে সেই গোপন মর্ম বা রূপ বা আলোড়ন প্রকৃত সত্যের মুখোমুখি করে। পাঠককে প্রকৃত সৌন্দর্যের চাবি খুঁজে পেতে হয়। ঋধসরষু ঋৎরবহফ চড়বসং ঋড়ৎঁসং কৃত গবঃধঢ়যড়ৎ সম্পর্কে উল্লেখ করেছে কয়েকটি কথা :
“চবড়ঢ়ষব যধাব ঁংবফ সবঃধঢ়যড়ৎং ংরহপব ঃযব নরৎঃয ড়ভ সধহশরহফ. গবঃধঢ়যড়ৎং ধৎব ধ ধিু ঃড় মবঃ ধৎড়ঁহফ পবহংড়ৎংযরঢ় ধং বিষষ ধং ঃড় যবষঢ় ঁং ংবব ঃৎঁঃযং ঃযধঃ বি সধু হড়ঃ নব ধনষব ঃড় ভধপব রভ ঃযবু বিৎব ংঃধঃবফ ঢ়ষধরহষু. ওঃ রং ধ ধিু ঃড় ধপপবহঃঁধঃব নবধঁঃু ধং বিষষ ধং ঢ়ধরহ ঃযৎড়ঁময ঃযরং সবফরঁস ড়ভ ঃযব ঁহংঃধঃবফ পড়সঢ়ধৎরংড়হ. ডযবহ ুড়ঁ ধৎব ৎবধফরহম ধহ ধঢ়ঢ়ৎড়ঢ়ৎরধঃব সবঃধঢ়যড়ৎ ুড়ঁ ধৎব রসসবফরধঃবষু ফৎধহি নবঃবিবহ ঃযব ঃৎঁঃয ড়ভ ঃযব পড়সঢ়ধৎরংড়হ ঃযধঃ রং নবরহম ধষষঁফবফ ঃড়. ঞযব ধনরষরঃু ঃড় ঁহফবৎংঃধহফ সবঃধঢ়যড়ৎরপ ষধহমঁধমব ড়ঢ়বহং ঃযব শবু ঃড় ঢ়ড়বঃৎু ড়ভ ঃৎবসবহফড়ঁং নবধঁঃু.”
যার অর্থ করলে দাঁড়ায়, জন্মের মুহূর্ত থেকেই মানবজাতি পরোক্ষ উপমা ব্যবহার করে আসছে। মানবজাতিকে বিবাচনের পথ বাতলে দেয় প্রকৃত সত্যের কাছে পৌঁছাবার যা নাবালভূমির মতো আড়াল থাকে, যাকে দেখা যায় না, উপমা তাকেই প্রতীয়মান করে। অদৃশ্য বা অব্যক্ত ব্যথার মতো লুকানো অনুভূতিও এই রূপকর্মে ধারণা দিতে পারে। প্রকৃত পরোক্ষ উপমার পাঠ প্রকৃত সত্যের দিক নির্ণয়। এর ভাষা বোধগম্য মানেই অদ্ভুত সৌন্দর্যের সম্মুখীন হওয়া।
মেটাফোর কবিতার অদ্ভুত সৌন্দর্য তলিযয় দেখার সময় আমাদের এসেছে। এত কবিতা লেখা হচ্ছে, কোনটা কী ধারার কবিতা, সেসব দেখা পন্ডিতের কাজ। আমরা দেখতে চাই সাম্প্রতিকের কবিতাগুলিতে কতখানি মেটাফোর প্রভাব ফেলেছে। বেশ কয়েকজন কবি বাংলা কবিতায় এই রূপক অলংকারের চর্চা করে চলেছেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন গোলাম রসুল। তাঁর “অচেনা মানুষ আমি”, “বেলা দ্বিপ্রহর”, “বৃষ্টির একপাশে উড়ছে পাখিরা” এবং “দুই মাস্তুলের আকাশ” কাব্য কয়খানি মেটাফোরিক কাব্যভাষায় ঠাঁসা ।
উপমাগুলিও একই সত্যের দিক নির্দেশ করেও বহুস্বরিক এবং বহুরৈখিক হয়ে উঠেছে। সত্যটি আত্মস্ফুরণ । এক সত্তার ব্যাপ্তিতে বহুসত্তায় অনুগমন । যাকে গড়হরংস বা অদ্বৈতবাদ বলা চলে। কবি বিশ্বাস করেন, বস্তু এবং মনের কোনও ভেদ নেই। যার মূল কথা হল : ঞযঁং সবঃবৎরধষরং ধহফ রফবধষরংস ড়ৎ ংঢ়রৎরঃঁধষরংস ধৎব নড়ঃয ংঢ়বপরড়ঁং ড়ভ গড়হরংস. কবির কবিতার সমূহ চিত্রকল্পই এই বোধের দ্বারা চালিত হয়েছে :
১.সোনালি চুড়ির মতো সরু হয়ে আসছে দিন
দূর রাস্তা ঢুকে যাচ্ছে অন্ধকারের অন্দরমহলে
২.সারি সারি গাড়ি
যেন সমুদ্র দাঁড়িয়ে আছে আর টলছে
বিপদের দিকে তাকিয়ে
৩.অবাস্তবের ধারে
ডাঙায়
মাছ জমছিল
একমুঠো ছড়ানো রুপোর জীবন্ত পয়সা
৪.স্বপ্নের জন্য রাত্রি তরল হয়ে সামান্য বিশ্রাম নেয়
৫. বৃষ্টি মিনার
সদা একাকিত্ব
দেখা যায় না
একটি অনুভব যা শুধু পাঠিয়ে দিচ্ছে মানবতা
পরিষ্কার জলে এত হাসি ছিল হয়তো কেউ জানত না
মানবতার অনুভূতিতেই বস্তুত প্রাণের চরিত্র পেয়েছে। ধারণা বা কল্পনা, অবাস্তবতা বা দিন ও রাত্রি এক একটি ব্রহ্মসত্তার রূপ, যার মধ্যে মানবীয় স্ফুরণ দেখা গেছে। তাই “দিন” পেয়েছে সোনালি চুড়ির উপমা। “দূর” পেয়েছে অন্দরমহলে প্রবেশের পথ। “সমুদ্র” মাতাল হয়ে টলেছে, তার বিপদের চেতনা জেগেছে।
“অবাস্তব” কখনও চোখে দেখা যায় না, তবু তার ডাঙায় মাছের জমে ওঠা এবং “রুপোর পয়সা”র জীবন্ত হওয়া সবই পরোক্ষ উপমায় মনুষ্যবোধেরই ধারক। “রাত্রির” তরল হয়ে বিশ্রাম নেওয়া, “বৃষ্টির” মিনার “সাদা একাকিত্ব” সবই রূপক অলংকারের এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের ভাষা এনে দিয়েছে। মেটাফোর কবিতায় যা প্রয়োজন অর্থাৎ এডিশন এর ভাষায় যাকে বলা হয় :“ঞযড়ংব নবধঁঃরভঁষ সবঃধঢ়যড়ৎং রহ ংপৎরঢ়ঃঁৎব যিবৎব ষরভব রং ঃবৎসবফ ধ ঢ়রষমৎরসধমব.” জীবনপথিকের এই যাত্রা তো চলতেই থাকে এভাবেই।
লক্ষ্মীকান্ত মন্ডলের “সজনে ফুল ও নিঃশর্ত সমর্পণ”, “আঁধারের পাঁজর”, “কালো নৌকার তৃষ্ণা” প্রভৃতি কাব্যের বহু কবিতায় মেটাফোর চর্চা করেছেন। জীবনের আত্মায় লেপ্টে থাকে ঈশ্বরের বাঁশি। তাই কবির কণ্ঠস্বর ফুটে ওঠে জীবনের এই প্রত্যয় ভূমির ঢ়রষমৎরসধমব :
১.হলুদ পাখির গান ছিঁড়ে সুখের উপনিষদ
মেঠো প্রজাপতির পিছনে আমি
পৌঁছে যাই একমুঠো নীল বিশ্রামে
২.গতরাতের জেগে থাকা ঝিঁঝির ঝিমধরা হৃদয়
বেজে ওঠে সমুদ্রের স্বীকারোক্তি, দানপত্র
৩.পিচ রাস্তায় ঘোড়াপোকা অপেক্ষায় ভাবে রাত রং
৪.ক্ষুধাও কেমন তাকিয়ে থাকে, চুমু খায় শ্বাসকষ্টে
দূর শুধু দূরেই সরে যায় স্বাতী নক্ষত্র
৫.এই বোধের স্পন্দনে মেঘের জোট ভাঙে বটপাতা
ছুঁয়ে দেয় চাঁদ
“হলুদ পাখির গান” কীভাবে “সুখের উপনিষদ” ছিঁড়ে দেয়, “মেঠো প্রজাপতির পিছনে” এসে কীভাবে “নীল বিশ্রামে” কবি পৌঁছান, ঝিঁঝির “ঝিমধরা হৃদয়”, “সমুদ্রের স্বীকারোক্তি”, “ঘোড়াপোকার” চেতনা এবং “ক্ষুধার” চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সবই রূপক অলংকারের মাধুর্যে বেজে ওঠা মনুষ্যলোকেরই অনুভূতি। প্রাণের আরোপ আছে বলেই “মেঘের” বোধ যেমন জেগেছে এবং “বটপাতা” চাঁদও ছুঁয়ে দিতে পেরেছে। কর্মপদ এবং ক্রিয়াপদে প্রায় সমাগত বোধের সাম্রাজ্য। কবির অহধষড়মু এত সূক্ষ্মতার সঙ্গে রহস্যের গভীরে প্রবেশ করেছে যে পাঠক সহজেই উদ্দেশ্য ও কর্মক্রিয়াকে অনুধাবন করতে পারবে।
কবি সিতাংশু গোস্বামী, তপন দাস, অলক জানা প্রমুখ কবিরাও মেটাফোর চর্চায় অগ্রসর হয়েছেন। সিতাংশু গোস্বামীর “কতদূর সমুদ্র মন্থন”, “প্রিয় পরাজয়”, “অসম্ভব ধুলোবালি”, “ভ্রান্তির খড়কুটো”, “সফেদ শাঁখের কণ্ঠ” এবং “মধুমাসে বেদে নাচ” কাব্যগুলিতে ছড়িয়ে আছে মেটাফোর বার্তা। বস্তু বিদ্ধ বাস্তবের রূপের মধ্যেও মরমিয়া সাধকের রহস্যময় ব্যাপ্তি দেখতে পাই। কবি যখন লেখেন :
১.হাটে-মাঠে, পথে-ঘাটে ঘোরে যত অরসজ্ঞ কাক।
জ্ঞানের নিমের ফল ধরা থাকে সব করতলে
মইটানা এ জীবনে বসবাস ছলিত আদলে
২.ভুলের পইঠা বেয়ে নিত্য বাড়ে জড়ের বিকার
হৃদয়ের গ্রন্থি বাঁধে বিষ গিঁটে অসুখী আঁধার
৩.পাঁকাল মাছের মতো উদাসীন চারণ কোথায়
সংযমী কাছিম কই-নিজেকে যে সহজে গোটায়
চোর সাজে মহাজন, সাধুদের সিঁধেল বানায়
ভারতবর্ষের সারস্বত পথ চর্যা, কীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলি, চৈতন্য চরিত এবং মঙ্গলকাব্যের পথ ধরেই কবি তাঁর মিথ্ রচনা করেছেন। রহস্য সেইখানেই রূপকের আড়ালে ভন্ডামি ও এক অন্তঃসারশূন্যতার প্রতিলিপিকে দেখাতে চেয়েছেন। তাই “অরসজ্ঞ কাকের” আড়ালে কাব্যবোধহীন মানুষ, “জ্ঞানের নিমের ফলে”-র আড়ালে প্রকৃত রসজ্ঞানহীন বিষয়ী বিদ্যানন্দীদের বুঝিয়েছেন। তেমনি ভুলের পইঠায় “জড়ের বিকার”, হৃদয়ের গ্রন্থির বিষগিঁটে “অসুখী আঁধার”, “সংযমী কাছিম”, “চোরের মহাজন” এবং “সাধুদের সিঁধেল” সবই মনুষ্যেতর পরিচয় যা মানুষই বহন করে চলেছে। এমনই রূপক অলংকারগুলি যা আমাদের প্রাচীন সাহিত্য থেকে সাম্প্রতিকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সেই সত্যটি গোপন অস্ত্রের মতো প্রয়োগ করে যে রসের পরিচয় দিয়েছেন তা গবঃধঢ়যড়ৎরপ ষধহমঁধমব হিসেবেই ঞৎবসবহফড়ঁং নবধঁঃু এরই চাবি বলতে হবে।
কবি তপন দাস ‘রাত বারোটার আজান’, ‘চিতা কাহিনি’, ‘শব্দর ভিতরে সহজ আলো’, ‘একটি রাস্তার প্রতিবেদন’, ‘নগ্ন হয়ে যাবার আগে’ প্রভৃতি কাব্যে তাঁর মেটাফোর সৃষ্টিকে তুলে ধরেছেন। বস্তুচেতনার জগৎ থেকে অন্তর্চেতনায় অথবা নিশ্চেতনায় কবি অগ্রসর হতে চেয়েছেন। তিনি লিখেছেন : ১.রাত তাকে ফেলে গেছে
সঙ্গে তার দীর্ঘকায় ছায়া! নীল ছোঁয় তাঁতঘর
২.কারা কাঁদে নুন-চোখে?
মুখ বুজে ছাই মাখে গায়ে। পাখি ওড়ে বাসা ছেড়ে
৩.এই মাটিতে পায়রা-কথা
আগুন মেঘে স্বপ্ন রাখি
‘রাত’ শুধু মাধ্যমই নয়, একটা চরিত্রও যা সময় নির্ণয় করে দেয়, আর ‘দীর্ঘকায় ছায়া’ আত্মসর্বস্বতার প্রতিফলন মাত্র। কবি বিস্ময় সূচক চিহ্ন ব্যবহার করে সংশয়টি গোপনে ধারণ করেছেন। ‘নীল ছোঁয়’কথাটি জীবনের সংরাগ প্রকাশের অভিযাপন পর্ব। ‘তাঁতঘরে’-র রূপকে এই সংসারে জীবনকে বোনার মর্মটিই প্রকাশ পেয়েছে। ‘নুন-চোখ’, ‘পায়রা-কথা’, “আগুন মেঘ” সবই রূপকের আড়ালে জীবনের পরিচয় বা কষ্টলালিত দীর্ঘজীবনসত্যের পর্যায়। এসবই একদিকে যেমন অপপবহঃঁৎব নবধঁঃু তেমনি অন্তর্বাহ বেদনার মাধ্যমও ।
কবি অলক জানা ‘বাঁশপাতার চিতা’ এবং ‘চোখতীর্থের শুভেচ্ছা’ কাব্যেও গ্রাম্যজীবনের মিথে এক অনাড়ম্বর চিত্রকল্পে মেটাফোর প্রয়োগ করেছেন। প্রতিটি চিত্রকল্প জীবন্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সমন্বিত। কবি লেখেন :
১.মেঘ ব্রা-তে ভেজা চাঁদ নিঃস্ব, আঙুলের আগায় মুখ জাগে, জাগে ঠোঁটও
২. উঠোনে শীতের ফুলমেলা, নুয়ে পড়া বাঁশবনের অভিবাদন
সরীসৃপ আলো যায় পশ্চিম যাপনে
৩.অক্ষর কংক্রিটের ছাদ সহজে ভাঙে না, সমস্ত নষ্টনদীর ওপর
সেতু বেঁধে দাও, তোমার চিন্তাবীজ আর একটা তাজমহল হোক
নিজের বোধের সাম্রাজ্যে প্রকৃতির একটা ভাষা নির্মাণ করে চলেছেন কবি। কোনও তত্ত্ব নেই, স্বপ্ন নেই, অথবা একাকিত্বের ঘোর হাহাকার নেই। বিষাদের দরবার নেই। নিজস্ব ভাঙন আর জীবনযাপনের এক সহজিয়া সাহচর্য আছে। যেখানে নিজের সঙ্গে প্রকৃতির আলাপচারিতা চলে। আবার ভালবাসায় ঘুমিয়ে পড়াও চলে। মানব চরিত্রের নানান ক্রিয়া প্রকৃতিতেও প্রতিফলিত হয়।
কবি অনুপ মন্ডল ‘চাঁদ মোহনের পাথর’এবং ‘অন্যান্য ও শৃগাল তান্ত্রিকতা’ কাব্যে মানুষের আদিম রূপকেই মেটাফোর বোঝাতে চেয়েছেন। একদিকে সভ্যতার আলোক দীপ্তি, অন্যদিকে অন্ধকার প্রবৃত্তির ঘোর বিদ্রোহ যা নঞর্থক অথবা অসামাজিক ক্রিয়াকল্পে ভরপুর। কবির কাছে মেটাফোর তখন অ ধিু ঃড় মবঃ ধৎড়ঁহফ পবহংড়ৎংযরঢ় হিসেবেই এসেছে।
১.জীবনী লেখা শেষ হয়ে এলে
সকাল পরীদের মতো
জানি, ঘুনপোকাদের ডানাও গজাবে একদিন
২. টলোমলো পায়ে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে
প্রতœতাত্ত্বিক নৌকোর ভাঙাচোরা গলুই
৩.অন্ধকারের স্তন ফেটে ঝরে পড়া মধু ও দুধের
অজৈব অজৈব গন্ধে জেগে ওঠে প্রতœবিভীষিকা,
ভাঙা তোরণের বছর বিয়েনে ফিরে ফিরে আসে
দুর্গন্ধময় মৃতনারী
মানবিকতার শরীরে মানুষের মৃত্যু বাহিত হয়। আত্মসুখের জন্য হিংগ্র বিলাস কবি অনুভব করেন। কিন্তু প্রতœবিভীষিকা আমাদের জহরব্রত জীবনের অগ্নিপরিধি হয়ে ঘুরে আসে। মেটাফোরের আশ্রয়ে সেই ভাষা মহিমা ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছেন কবি, বলেই ‘প্রতœতাত্ত্বিক’ এবং ‘প্রতœবিভীষিকা’ আদিম রূপতাত্ত্বিকের শেকড় সন্ধানে প্রবৃত্ত।
কবি রিমি দে ‘লীনতাপ, বরফকুচির দিন’, ‘অর্ধেক সাপ’, ‘মৌস্বাক্ষর’, ‘রাবণ’ প্রভৃতি কাব্যে মেটাফোরের চূড়ান্ত পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। তাঁর ব্যবহৃত শব্দগুলিই মেটাফোর হিসেবে কবিতায় আসে। চরিত্রের প্রতিরূপ হয়ে সেগুলি মহিমা পায়। আসলে উপমা পদটিই উপমেয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেন তিনি। তুলনা বাচক অব্যয়টি ব্যবহার করেন না। সেকারণে তাঁর শব্দ নির্মাণে ও চিত্র বিনির্মাণে খেলাটি ভিন্নতর রূপ পায়। মেটাফোর পাল্টে যায় এই বিনির্মাণতত্ত্বে, অথচ অন্তঃসলিলার মতো থেকে যায় মূল সত্যটি। তাকেই গোচরীভূত করেন কবি।
১.তিনটি স্পেস জুড়ে রাঙারোদ্দুর
রক্তজবা হয়ে উঠছিল রূপালি বুধবার
২.আগুনরূপী গন্ধরাজ
নাড়িয়ে দিচ্ছে
নাড়িয়ে দিচ্ছে ব্যক্তিগত বোধও গ্রোতের ভবিষ্যৎ
৩.মুখ বুক চোখ ফেটে চাপা শিশিরের
দ্বিধা ও বেদনার দানা
স্পেস জুড়ে ‘রাঙারোদ্দুর’ রক্তজবা হয়ে ওঠা ‘রূপালি বুধবার’, ‘আগুনরূপী গন্ধরাজ’, ‘চাপা শিশির’এবং ‘দ্বিধা ও বেদনার দানা’ সবই পরোক্ষ উপমায় নিবিড় সংযোগ এনে দিয়েছে, অথচ তাৎক্ষণিকতায় বিনির্মাণে পুরাণকথিত মিথকেই (রাবণের উপমায়) কাব্যের নামকরণে কবি ব্যবহার করেছেন। সব উপমার মধ্যেই একটা ঐড়সড়মবহরুবফ ঘটেছে ।তাই ‘রাবণ’ কাব্যে সরাসরি মেটাফোরের ব্যবহার না থাকলেও গবফরঁস ড়ভ ঃযব ঁহংঃধঃবফ পড়সঢ়ধৎরংড়হ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে কবিরা মেটাফোরের সঙ্গে যেমন মেটাফিজিকস্-কেও মিলিয়ে দিচ্ছেন, তেমনি স্বপ্নচারিতাকেও উপেক্ষা করেন না। কবির আত্মদর্শনে অস্তিত্বের অন্বেষণ, সত্য নির্ণয় এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের বিষয়টি অধিবিদ্যায় প্রতিফলিত। ই. জঁংংবষষ এই কারণেই বলেছেন : ‘গবঃধঢ়যুংরপং ড়ৎ ঃযব ধঃঃবসঢ়ঃ ঃড় পড়হপবরাব ঃযব ড়িৎফ ধং ধ যিড়ষব নু সবধহং ড়ভ ঃযড়ঁমযঃ.’-এর সঙ্গে অতিলৌকিক বা পরাদৃষ্টিময় অনুভূতিও মিশে থাকতে পারে। উপমায় সেগুলিও প্রতিফলিত হয়। সপ্তদশ শতকেই ইংরেজ কবিরা
এই ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। বর্তমানে অধিকাংশ কবিই কাব্য রচনায় এই ধারাটিতে আসক্ত হচ্ছেন। মেটাফোরের সঙ্গে মেটাফিজিকস্ এবং জীব ও জড়ের তফাত ঘুচিয়ে মানবীয় বৈশিষ্ট্যে সমন্বিত করে তুলছেন। স্বাভাবিকভাবেই কবিরা যেমন নৌকার নিঃশ্বাস শুনতে পাচ্ছেন, তেমনি গাছেদের পারস্পরিক কথাবার্তাও অনুভব করছেন। চাঁদ এসে যেমন প্রেমিক কবিকে ডেকে নিচ্ছে, তেমনি সূর্যও উটের গ্রীবার মতো তার জানালায় রোদ ছুঁড়ে দিচ্ছে । নক্ষত্রদের পাঠশালা, অন্ধকারের ভ্রুভঙ্গি, আকাশপরীর ডানা ঝাপ্টানো আর উড়ন্ত জাহাজের মাথায় খোলাচুলের ঝুঁটি সবই কবিরা দেখে চলেছেন।
গাছেদের, পাখিদের দুঃখের কথা শুনতে শুনতে কবিরা কবিতা লিখছেন। কাগজের টুকরোগুলি চিৎকার করছে, কলম প্রতিবাদ করছে, ক্যালেন্ডারের রবীন্দ্রনাথ মানবতার মৃত্যু দেখে কাঁদছেন। সবই মেটাফিজিকস্-এর ভেতর ঘটে চলেছে অবিরাম ক্রিয়াকল্প। মানুষ যা চিন্তা করতে পারে, উপলব্ধি করতে পারে, প্রকাশ করতে পারে —সবই তাঁর সৃষ্টির জগতে স্থান পায়। কয়েকজন মাত্র কবির নাম ও তাঁদের কবিতা উদাহরণ হিসেবে লেখা হলেও তাবৎ কবির মধ্যেই এই প্রক্রিয়া আবহমান কাল ধরেই চলে আসছে। এ কখনওই থামবে না। জন্মমুহূর্ত থেকেই সমস্ত জীবন ধরেই কবিরা তথা মানুষেরা মেটাফোরকে লালন করতে শেখে আর মেটাফিজিকস্-কে ধারণ করতে শেখের্।

মূল্য
জয়ন্ত অধিকারী
অবশেষে সব যন্ত্রণার অবসান হলো, ভোরে, সাড়ে চারটের সময়! শেষ চার চারটে মাস ধরে বার বার হসপিটাল- ঘর-অফিস-হসপিটাল-ওষুধ-ডক্টর-নিদ্রাহীন রাত-ক্লান্ত সকাল; ওহ, আর যেন পারছিলাম না টানতে। বার বার মনে হতো, কবে শেষ হবে এই যন্ত্রনা? কবে পাবো আবার ফিরে, নিশ্চিন্ত দিনগুলো ?
২.
আট মাস আগে, রুটিন চেকআপের সময়েও কোনোকিছুই ধরা পড়েনি। সব রিপোর্ট নিয়ে যখন ডক্টরের সাথে কথা হলো, ডক্টর বলেছিলেন, “সবকিছু নর্মাল, প্রেসারটা একটু বেশির দিকে, তবে এই বয়সে এরকম একটু হতে পারে। সেটা খুব একটা চিন্তার কিছু নয়। আর আপনার বাবার রাতে মনে হয় আজকাল একটু কম ঘুম হচ্ছে, তাই না ? যদি ঘুমের খুব সমস্যা হয়, ওনাকে এই ওষুধটা দেবেন। আসলে এই সত্তরের কাছাকাছি বয়সে, রেস্টের ও তো দরকার আছে। তবে… ‘বাবার দিকে তাকিয়ে ডক্টর বলেছিলেন, ‘সিগারেট কমাতেই হবে আপনাকে আঙ্কেল। দিনে দু প্যাকেট সিগারেট, খুব খুব খারাপ।’এর পর সব ঠিক ছিল।
হঠাৎ দু সপ্তাহ পরে, বাবার প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয় পেটের ভেতরে , বেশ কয়েকবার বমিও করে, সাথে বেরোয় রক্ত। তাড়াতাড়ি ভয় পেয়ে, ডক্টরের কাছে ছুটে এসেছিলাম বাবাকে নিয়ে। ধরা পড়ে বাবার ক্যান্সার-লিভার ক্যান্সার। আর তাও একদম শেষ স্টেজে !
ডক্টররা কোনো আশা দিতে পারেন নি! বলেই দিয়েছিলেন ওনারা,কষ্টেসৃষ্টে হয়তো আর কয়েকটা মাস।
বাবাও কেমন যেন মেনে নিয়েছিল ভবিতব্যকে।
শেষের দিকে কয়েকটা সপ্তাহ কিরকম চুপ হয়ে গিয়েছিল। আমার যে বাবা, সারাক্ষন ঘর দাপিয়ে বেড়াতো, পাড়ার প্রত্যেকের ভালোমন্দে পাশে গিয়ে দাঁড়াতো, সোনাইকে কাঁধে করে নিয়ে, সাইকেল এ বসিয়ে বাজারে চলে যেত ঘরের প্রয়োজনীয় – অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনতে, মাঝে মাঝে বাগানে ফুল বা গাছের পরিচর্যা করতে করতে ধোঁয়া ছাড়তো মুখ থেকে…সেই বাবা – মাত্র কয়েক মাসেই কি রকম শুকিয়ে গিয়েছিল।

প্রায় ছয় ফুটের লম্বা শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে ছোট্ট হয়ে গিয়েছিল। তিনবার কেমো দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাবাকে। কি বীভৎস সেই অভিজ্ঞতা। যে শিরাগুলো দিয়ে কেমোর ওষুধ যেত, গিয়ে লিভারের ছড়িয়ে পড়া টিউমরকে ধ্বংস করতে যেত, সেই শিরাগুলো শরীরের ভেতর থেকে পুড়ে যেত। বাবা, ভীষণ ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠতো। সহ্য করতে পারতাম না সেই কষ্ট , দেখতে পারতাম না বাবাকে- আমার ছোট বেলার হীরোকে চোখের সামনে এইভাবে শেষ হয়ে যেতে।
বাবার হাঁটতে কষ্ট হতো, কিছু খেতে পারতো না, মাঝে মাঝে বমি করতো, বেরিয়ে আসতো রক্ত তার সাথে। শেষের কিছু সপ্তাহ, প্রায় বাচ্চাদের মতো কোনোরকমে হামা দিয়ে এঘর ওঘর করতো আমার বাবা। বুঝতে পারছিলাম, প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে শরীরে, তবুও মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করতো বাবা, আমাদের দেখলেই হেসে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করতো। আমরা পাশে গিয়ে বসলে, ফিসফিস করে কত কথা বলতে চেষ্টা করতো আমার বাবা। বেশির ভাগ-ই পুরোনোদিনের সব কথা- চিন্তা করছিস কেন? আমি ঠিক ভালো হয়ে যাবো, আবার নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াবো, সোনাইকে কোলে নিয়ে খেলবো।
মনে মনে জানতাম, শেষের সে দিন এগিয়ে আসছে, তাই হয়তো পুরোনো দিনের কথাগুলো আরো বেশি বেশি করে…
খুব কষ্ট হতো, কষ্ট হতো আমার, রুহীর! রাতের পর রাত জেগে কেঁদেছি, রুহি কতবার আমার সাথে রাত জেগেছে, রুহীও হাউহাউ করে কেঁদেছে, দুজনে দুজনকে সামলেছি। কিন্তু আমি ভেতরে ভেতরে হারিয়ে যাচ্ছিলাম।
তার ওপর চিকিৎসার এতো খরচ, এই কেমো, তো কাল আবার কিছু টেস্ট, তো পরের দিন আই সি ইউ। কীভাবে যে কেটেছিল শেষ কিছুদিন !
৩.
শেষকৃত্য করে, আমরা ফিরে এলাম ঘরে। রুহি, সোনাইকে নিয়ে চলে গেছে পাশের ঘরে, জানি রুহী পারবে না ঘুমোতে। সোনাই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে, ওর পাশে শুয়ে থাকবে রুহী, বিছানা ভিজে যাবে ওর নিঃশব্দ কান্নায়।
বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম আমি, দেখছিলাম, ভাবছিলাম। বাবার স্মৃতি এখনো কি পরিষ্কার, যেন চোখের সামনে কোনো সিনেমা দেখছি।
-ওই তো, ওই তো ছোট্ট আমি, বাবাকে দেখে হাত বাড়িয়ে ছুটে যাচ্ছি; বাবা আমাকে কোলে তুলে নিলো, ছুঁড়ে দিলো আকাশের দিকে, মা আঁতকে উঠছে ভেতর থেকে, বাবা হাসতে হাসতে আমাকে ধরে ফেললো।
-ওই তো, ওই যে বাবা ফুটবল কিনে নিয়ে এসেছে, আমাকে বলে কীভাবে পা দিয়ে মারতে হয় শেখাচ্ছে, আমি একটা শটে ভেঙে ফেললাম ঘরের কাঁচ, মা রেগে তেড়ে আসছে, বাবা আমাকে বাঁচাতে, বলটা নিজের পায়ের কাছে নিয়ে চলে এসেছে।
-ওই তো, আমাকে ধরে ধরে বাবা সাইকেল চালানো শেখাচ্ছে, আমি পড়ে যাচ্ছি, বাবা ধরে নিয়েছে। আবার পড়ে গেছি, হাঁটুর কাছে কেটে গিয়েছে, বাবা রেগে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আবার চালাতে বলছে সাইকেল, বলছে বারে বারে এইভাবেই পড়ে উঠে দাঁড়াতে হয়।
-ওই তো, মাধ্যমিকে আশি শতাংশ নম্বর নিয়ে এসেছি আমি, ভীষণ খুশি বাবা আমার, সারা পাড়াতে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে।
-ওই তো, রুহী আর আমি বিয়ে করে এলাম বাড়িতে। বাবা আমার কানে হাত দিয়ে, কান মুলে বলছে, তুইও বড়ো হয়ে গেলি, তাই না? রুহীকে বুকে টেনে নিয়ে বলছে, আজ থেকে তুই আমার মেয়ে।
আর পারছি না, চোখের কোণে খুব জ্বালা জ্বালা করছে। আমি উঠে এলাম, আমাদের স্টাডি রুমে। এই বিশাল তিনহাজার স্কোয়ার ফিট এর চারটে বেডরুমের ফ্ল্যাট আজ কিরকম ফাঁকা হয়ে গেছে, সবাই শান্ত, নেই বাবার ঘড়ঘড়ে- জড়িয়ে যাওয়া নিশ্বাসের আওয়াজ, নেই কাশির শব্দ।

আমি বাবার সব ফাইলগুলো বের করলাম! শেষ আট মাসের হিসেবে করতে হবে, দেখতে হবে কত গেলো, আর কত আছে। হঠাৎ পায়ের আওয়াজে পেছনে তাকালাম। রুহি পাশে এসে বসলো। ক্লান্তির ছাপ সারা শরীরে, চোখের তলায়। রুহী পাশে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘কি করছো অনি? এসব ফাইল? কি ক্যালকুলেট করছো? চলো এখন ঘুমিয়ে পড়বে চলো, এগুলো পরেও হতে পারে!’
আমি রুহীর দিকে না তাকিয়েই বলে উঠি, ‘না, না রুহি, এগুলো আমাকে এক্ষুনি করতে হবে। আমি দেখছি কত খরচ হল। তুমি ভাবতে পারো? শেষ আট মাসে প্রায় তিরিশ লাখের কাছাকাছি খরচ হয়েছে আমাদের? কেমো, ডাক্তার, টেস্ট, বাবার খাওয়া দাওয়া, ওষুধ তারপর বাবার স্পেশাল ট্রিটমেন্ট, সব কিছু নিয়ে তিরিশ লাখ? আরে এই টাকায় তো একটা ভালো ফ্ল্যাট হয়ে যেত? বা আমরা কোথাও, কোথাও বিদেশে ঘুরতে যেতে পারতাম সবাই মিলে? বা যদি ইনভেস্ট করে রেখে দিতাম? আমাদের ভবিষ্যতের জন্য? ছি ছি এতো খরচ হয়ে গেলো আমাদের? এমন একটা যুদ্ধ আমরা করলাম, যেখানে হারবো জেনেও, আমরা এতো খরচ করলাম? কেন? কোনো মানে হয় এসবের? ‘
রুহি আর্তনাদ করে বলে উঠলো, আমাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ‘অনি, কি বলছো তুমি? তুমি বাবার চিকিৎসাকে বাজে খরচ বলছো? এটা তো আমাদের কর্তব্য, অনি ! এই বাবা না থাকলে, আজ তোমার কোনো অস্তিত্ব থাকতো এই পৃথিবীতে? তুমি কি পাগল হলে? তিরিশ লাখ কেন, দরকার হলে, আরো বেশি খরচ করতাম আমরা। আমার সব গয়নাগাঁটি বিক্রি করে দিতাম, এই ফ্ল্যাট, সম্পত্তি সব! একটা মানুষের জীবন এর মূল্য কি এতটাই ঠুনকো তোমার কাছে? আর সেই মানুষটা আর কেউ নয় অনি, তোমার নিজের বাবা। তুমি একদিন আরো অনেক টাকা রোজগার করবে, আমি জানি, কিন্তু বাবার এই শরীর খারাপের সময় কত খরচ হয়েছে, কি হয়েছে, এটা কি হিসেবে করার ব্যাপার? তোমার বাবার মধ্যে, আমি নিজের বাবাকে খুঁজে পেয়েছি, সোনাই কি ভালোবাসতো ওর দাদাইকে, কত্ত বায়না, আবদার, খেলা, বেঙ্গমা- বেঙ্গমীর গল্প! কতটুকু জানো তুমি তোমার বাবাকে? ছিঃ অনি ছিঃ; এভাবে ভাবতে হয়? তাহলে কি তুমি আমাদেরও খাওয়ার জন্য কত খরচ হচ্ছে, সোনাইয়ের ডাক্তার, ওর প্লে গ্রূপ এর খরচ, বাস – ভ্যান- অটো- ট্রেন, এসব কিছু এভাবেই বিচার করো? আমি জানতাম না অনি, তোমার কাছে টাকাটাই সব? আর সম্পর্ক? বাবা ছেলের সম্পর্ক?’
‘আমি সব বুঝতে পারছি রুহী, আমি জানি। কিন্তু রুহী ! তিরিশ লাখ টাকা ? সেটাতো জলেই গেলো, তাই না ? কোনো রিটার্ন তো পেলাম না। যেটা খরচ করলাম, তার কোনো মূল্য তো পেলাম না, সে মানুষটাও এলো না ফিরে ! ‘
রুহিকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় অনি, ‘বাবা, বাবা তো আর ফিরে আসবে না রুহী! বাবা, বাবা, বাবাআআআআআআআআআআ ………’