জীবন সাথী গাছ


প্রকাশিত : June 27, 2019 ||

মো. আবদুর রহমান
বৃক্ষ প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত বৃক্ষ মানুষের নিত্য সঙ্গী। এদের ছাড়া মানব জীবন অচল। যুগযুগ ধরে এরা নিরবে মানবতার সেবা করে আসছে। বৃক্ষরাজি আছে বলে মানুষ বেঁচে আছে।
দৈনন্দিন জীবনে বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। বৃক্ষ আমাদের খাদ্য, পরিধেয় বস্ত্র, বাস স্থান, আসবাপত্র, যানবহন, কৃষি যন্ত্রপাতি, ওষুধ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ছায়া, ফুল-ফল, কাঠ ও জ্বালানির যোগান দেয়। কাঠ ও ছায়াদান ছাড়াও সুস্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টিকর ফল পেতে ফল গাছের জুড়ি নেই। অন্যান্য জীবজন্তুু বিশেষ করে পশুপাখিও আশ্রয়স্থল হচ্ছে বন ও গাছপালা।
গাছ আমাদের জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন সরবরাহ এবং ক্ষতিকারক কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে পরিবেশকে নির্মল রাখতে সাহায্য করে থাকে। এক হেক্টর সবুজ বনভুমির অর্থ প্রত্যেহ ৬০০ থেকে ৬৫০ কেজি অক্সিজেন এবং তৎসহ ৯০০ কেজি পরিমাণ মানুষের ক্ষতিকারক কার্বন-ডাই-অক্সাইডের বিলোপ। তাই বৃক্ষকে বলা হয় অক্সিজেনের জীবন্ত আধার। সবচেয়ে বড় কথা, প্রচুর বৃক্ষরাজি না থাকলে মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তু অক্সিজেনের অভাবে বেঁচে থাকতে পারতো না। গাছপালা বায়ু মন্ডলকে পরিশোধিত রাখে বলেই মানুষ, জীবজন্তুু ও পশুপাখি বেঁচে আছে।
গাছপালার দ্বারা একটি দেশের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রিত হয়। রাস্তা,ঘর-বাড়ি ও ভুমি ক্ষয় রোধ হয়। নদী-নালার পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়। বৃষ্টিপাতের সহায়তা করতেও গাছ অপরিহার্য। স্পঞ্জ যে ভাবে পানি ধরে রাখে গাছও সে ভাবে মাটির ভিতরের পানিকে ধরে রাখতে সাহায্য করে। তাপমাত্র নিয়ন্ত্রণেও বৃক্ষের ভুমিকা গুরুত্ব পূর্ণ। বিজ্ঞানীদের মতে, তাপদগ্ধ গ্রীষ্মের দিনে একটি বড় গাছ প্রস্বেদন (ঞৎধহংঢ়রৎধঃরড়হ) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ১০০ গ্যালন পানি চারদিকের বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। ফলে তার আশপাশের তাপমাত্রা কমে গিয়ে পরিবেশ শীতল হয়। আর এই শীতলতার পরিমাণ ঘরের মধ্যে বেশ ‘কটি এয়ারকন্ডিশনের শীতলকরণের সমান।
গাছপালা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে ভূমি ও বায়ুমন্ডলের আর্দ্রতা বাড়ায়। ঝড়, তুফান, বন্যা-খরা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের তান্ডবতা হতে দেশের লোকজন, পশুপাখি ও ঘরবাড়ি রক্ষা করতে বৃক্ষরাজির অবদান সর্বজন স্বীকৃত। রাস্তা, বাড়ি, স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। এক কথায় খাদ্য, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, নির্মল পরিবেশ তথা দেশকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করে তুলতে গাছ-পালার অবদান অপরিসীম।
একটি দেশের সার্বিক প্রয়োজন, অর্থনৈতিক ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য সে দেশের আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমিতে বন ও গাছপালা থাকা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ জনবহুল দেশে সরকার নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ আয়তনের শতকরা ১৩ ভাগ মাত্র।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে ব্যাপক হারে গাছপালা কাটা হয়েছে। অথচ সে হারে বৃক্ষ রোপণ ও তার রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না। ফলে গাছপালার অভাবে একদিকে যেমন আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় গাছপালাজাত দ্রব্যের অভাব ঘটছে, অপর দিকে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। দেশের সর্বত্র বৃক্ষরাজি হ্রাস পাওয়ায় ‘গ্রীন হাউস এফেক্ট’ (এৎববহ ঐড়ঁংব বভভবপঃ) ও ‘প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা’ (বপড়ষড়মরপধষ রসনধষধহপব)দেখা দিয়েছে। ফলে দেশে বন্যা, খরা, ঝড়-ঝঞ্জা, আবহাওয়ার উষ্ণতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস, ভূমি ক্ষয়, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উত্তরাঞ্চলে মরু বিস্তারের আশঙ্কা ইত্যাদি বিরূপ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গ্রীন হাউস এফেক্ট: গ্রীন হাউস এফেক্ট নিয়ে আজ সারা বিশ্ব চিন্তিত। ধরিত্রীকে বাচাঁও, একটিই পৃিথবী, সকলের যতেœ, সকলের জন্য-এ সকল সেøাগান আজ বিশ্ববাসীকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের মধ্যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্যাস নিয়ে যে স্তর পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে, সেটিকে বলে গ্রীণ হাউস স্তর। এ স্তর সূর্যের তাপকে পৃথিবীতে পৌঁছাতে দেয় ঠিকই কিন্তু সেই তাপ পৃথিবীতে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে মহাশূন্যে চলে যেতে চাইলে তাকে বাঁধা দিয়ে আটকে রাখে। ফলে পৃথিবী উষ্ণতা থাকে এবং সকল প্রাণি জগতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। অন্যথায় পৃথিবী শীতল হয়ে যেত এবং সাথে সাথে প্রাণিজগতের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেত। গ্রীন হাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে গেলেও দেখা যায় বিপত্তি। এতে করে পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে যায় এবং দেখা দেয় বিভিন্ন রকমের প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা ও বিপর্যয়।
গ্রীন হাউজ গ্যাসের মধ্যে প্রায়ই অর্ধেকটাই কার্বন-ডাই-অক্সাইড। বর্তমান বিশ্বে শিল্প-কারখানা এবং যানবাহনে যে জীবাশ্ম জ্বালানি অর্থাৎ খনিজ তৈল, কয়লা এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে তা পোড়ানোর ফলে কার্বন-ডাই-অক্রাইড গ্যাস তৈরি হচ্ছে এবং তা জমা হচ্ছে বায়ুমন্ডলে। অপর দিকে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলেও বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ আশংকা জনক হারে বাড়ছে। ফলে গ্রীণ হাউস প্রতিক্রিয়া বেড়ে যাচ্ছে, বাড়ছে আবহাওয়ার উষ্ণতা। ফলশ্রুতিতে ঘন ঘন বন্যা, খরা, ঝড়-ঝঞ্জা, সাইক্লোন, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও তার তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বে আবহাওয়ার উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ার মতো উপকূলীয় নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিপর্যস্থ পরিবেশ, আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা এবং গ্রীন হাউস এফেক্ট এর হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য সবচেয়ে সফল এবং কার্যকর ভুমিকা পালন করতে পারে বৃক্ষ বা বন। তাই বিশ্ববাসী আজ অধিক বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণের জন্য সোচ্চার হয়ে উঠছে। সবুজের আন্দোলন গড়ে উঠেছে সারা বিশ্বময়।
আশার কথা দেশে বৃক্ষ সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি ও নির্মল পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষে বাংলাদেশেও জাতীয় ভাবে বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণের ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হযেছে। কা্েজই নিজের প্রয়োজন, জাতীয় স্বার্থে ও দেশের কল্যাণে এবং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষায় সকলকে বেশি করে বৃক্ষরোপণ ও তা সংরক্ষণের কাজে ব্রতী হতে হবে।
বসতবাড়ির আশে-পাশে পতিত জায়গায়, পুকুর পাড়ে, রাস্তার পাশে, খাল-নদীর ধারে, রেল লাইন ও বাঁধের পাশে, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, কল-কারখানা, মসজিদ, মন্দির এবং হাসপাতাল প্রাঙ্গনে যেখানেই খালি জায়গা রয়েছে সেখানেই গাছপালার চারা রোপণ করা এবং এসব চারার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা আমার ও আপনার জাতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য। কাজেই আসুন আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ গন্ডির মধ্যে গাছপালার চারা রোপণ করে জাতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করি।
আসবাবপত্র ও গৃহ নির্মাণের জন্য সেগুন, মেহগিনি, শিককড়ই, গজারী, জারুল এবং জ্বালানি কাঠের জন্য কড়ই, ইপিল-ইপিল, রেইন্ট্রি, তেঁতুল, বাবলা ইত্যাদি এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টি সমৃদ্ধ ফল যেমন- আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, কুল, সফেদা, জামরুল, আমড়া, বেল, লেবু, কামরাঙা, নারিকেল ইত্যাদির উন্নত চারা/কলম সংগ্রহ করে লাগাতে হবে। এছাড়া নানা রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য নিম, অর্জুন, হরিতকি, বাসক, আমলকি, তুলসি, বহেরা, মহুয়া এসব ওষুধিগুণ সম্পন্ন বৃক্ষের চারা রোপণ করা উচিত।
একটি চীনা প্রবাদ আছে যে, ‘তুমি যদি এক বছরের পরিকল্পনা করে থাক, তাহলে শস্য বপণ কর। আর তুমি যদি ১০ বছরের পরিকল্পনা করে থাক, তাহলে একটি বৃক্ষ রোপণ কর।’ আজ কয়েকটি গাছের চারা রোপণ করে সামান্য যতেœ অল্প দিনের মধ্যেই তা থেকে কাঠ, ফল, ফুল ও অর্থ পাওয়া যাবে। ৫০ বছর বেঁচে থাকা একটি একটন ওজনের আম গাছ মানব সমাজকে কী পরিমাণ আর্থিক সুবিধা দেয় কয়েক বছর আগে ভারতীয় পরিবেশ বিজ্ঞানীরা যে হিসাব দিয়েছিলেন তা হলো- বায়ু দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে ভারতীয় টাকায় ১০ লাখ টাকার, জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন দেয় ৫ লাখ টাকার, বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে বাঁচায় ৫ লাখ টাকা, মাটির ক্ষয়রোধ ও উর্বরাশক্তি বাড়িয়ে বাঁচায় ৫ লাখ টাকা, গাছে বসবাসকারী প্রাণির খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে বাঁচায় ৫ লাখ টাকা, আসবাবপত্র ও জ্বালানি কাঠসহ ফল সরবারহ করে ৫ লাখ টাকার এবং বিভিন্ন জীবজন্তুর খাদ্য যোগান দিয়ে বাঁচায় আরো ৪০ হাজার টাকা (তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান ফরেষ্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট)।
বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণ বিনা প্রিমিয়ামে জীবন বীমা পলিসির মতো আর্থিক নিরাপত্তা ও স্বচ্ছলতা আনে। ১০-১৫ টাকা দামের একটি মেহগিনি, শিশু, অথবা সেগুনের চারা ৩০ বছর পর আর্থিক অনটনে, ছেলে-মেয়ের লেখা-পড়ার খরচ, বিয়ে বা ছোট্ট একটি বাসস্থান নির্মাণে যথেষ্ট সহায়তা করবে। গাছ-পালা রোপণ একটি পূণ্যের কাজ। আপনার লাগানো গাছপালা থেকে যতদিন মানুষ এবং পশু-পাখি উপকৃত হবে- ততদিন আপনার খাতে পূণ্য জমা হতে থাকবে। আমাদের মহানবী (সা.) তাঁর পবিত্র হাতে গাছের চারা রোপণ করে আমাদের সামনে এক অনন্য আদর্শ রেখে গেছেন। মহানবীর (সা.) এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের প্রত্যেকের গাছ লাগানো উচিত।
সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় অধিক বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ সুস্থ ও নির্মল রাখতে এবং ফলমূল ও বনজদ্রব্যে স্বনির্ভর করে তুলতে সাহায্য করবে। এতে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আর্থিক উন্নয়নে সহায়ক হয়ে দেশের জনসাধারণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উৎকর্ষ সাধনে এক বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হবে। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, রূপসা, খুলনা