বসতবাড়ি ও পরিবেশ


প্রকাশিত : June 29, 2019 ||

মো. আবদুর রহমান
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন ভারসাম্যময় নির্মল পরিবেশ। পরিবেশ দূষণ নিয়ে আজ সারা বিশ্ব চিন্তিত। ধরিত্রীকে বাঁচাও, একটিই পৃথিবী সকলের যত্মে সকলে জন্য’-এসব শোগান আজ বিশ্ববাসীকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। অপরদিকে অপুষ্টি বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের জন্য একটি মারাত্মক সমস্যা।
বাংলাদেশের নারী, পুরুষ, শিশু ও কিশোর-কিশোর অধিকাংশ মানুষই অপুষ্টির শিকার। তবে শিশু, কিশোর-কিশোরী ও মহিলারাই বেশি অপুষ্টিতে ভুগছে। অপুষ্টিজতি সমস্যা শুধু মানুষের বুদ্ধিমত্তা, কর্মদক্ষতা, আয়ু এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রভাবিত করে না, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ সার্বিক উন্নয়নে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তাই অপুষ্টি রোধ এবং পরিবেশ সংরক্ষন ও উন্নয়নের উপর আমাদেরকে আরো বেশি সচেষ্ট ও সচেতন হতে হবে।
প্রাকৃতিক পরিবেশ সুস্থ ও নির্মল রাখতে বৃক্ষের ভূমিকা গুরত্বপুর্ণ। বৃক্ষ আমাদের জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং ক্ষতিকারক কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশকে নির্মল রাখে। এক হেক্টর সবুজ বনভূমির অর্থ ৬০০-৬৫০ কেজি অক্সিজেন উৎপাদন এবং তৎসহ ৯০০ কেজি পরিমান মানুষের ক্ষতিকারক কার্বন-ডাই-অক্সাইড বিলোপ। তাই বৃক্ষকে বলা হয় অক্সিজেনের জীবন্ত আধার। তাছাড়া বৃক্ষ আমাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, আসবাবপত্র, যানবাহন, কৃষি যন্ত্রপাতি, ওষুধ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ছায়া, ফুল-ফল, কাঠ ও জ্বালানির যোগান দেয়। কাঠ ও ছায়াদান ছাড়াও সুস্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টিকর ফল পেতে ফল গাছের জুড়ি নেই।
বস্তুতঃ দেহের ক্ষয়পূরণ, পুষ্টি সাধন এবং দেহকে সুস্থ-সবল ও নিরোগ রাখার জন্য ফল ও শাক-সবজি অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য। ফলের মধ্যে সব ধরনের পুষ্টি উপাদান কম বেশি রয়েছে। কিন্তু ভিটামিন ও খনিজ লবণ এবং সহজে আত্তীকরণযোগ্য শর্করা অধিক পরিমানে বিদ্যমান থাকায় এগুলো মানুষের পুষ্টিতে উল্লেখ্যযোগ্য অবদান রাখতে পারে। ফল রান্না ছাড়া সরাসরি খাওয়া যায় বলে এর পুষ্টি উপাদান অবিকৃত অবস্থায় দেহ কর্তৃক গৃহীত হয়। নিয়মিত ফল খেলে পুষ্টি সমস্যা দেখা দেয় না। শাক-সবজিতে পর্যাপ্ত পরিমানে ভিটামিন এ, বি, সি এবং ক্যালসিয়াম, লৌহ, আয়োডিন প্রভৃতি অতি প্রয়োজনীয় খনিজ লবন রয়েছে। তাছাড়া এতে কিছু পরিমানে প্রোটিন ও স্নেহ পদার্থ এবং যথেষ্ট পরিমানে শর্করা জাতীয় পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। গাঢ় সবুজ ও হলুদ রঙের শাক-সবজিতে ক্যারোটিন থাকে। এ ক্যারোটিন হতে আমাদের দেহে ভিটামিন ‘এ’ উৎপন্ন হয়। কাজেই পুষ্টির দিক থেকে শাক-সবজি ও ফলমুলের ভূমিকা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্যকে পুষ্টির দিক থেকে সুষম করতে হলে দৈনিক একজন শিশুর জন্য কমপক্ষে ১০০ গ্রাম ও একজন পূর্ণ বয়স্ক লোকের জন্য ২০০ গ্রাম শাক-সবজি এবং ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে একজন পূর্ণ বয়স্ক লোক গড়ে প্রতিদিন ৩০ গ্রাম শাক-সবজি ও ৩৮ গ্রাম ফল খেতে পায়। কাজেই ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠির শাক-সবজি ও ফলের চাহিদা পুরনের জন্য বসতবাড়িতে পরিকল্পিতভাবে বেশি করে বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজি ও ফলের চাষ করা একান্ত প্রয়োজন। গ্রামের দেশ বাংলাদেশ। এদেশের গ্রামগঞ্জে প্রায় দেড় কোটি বসতবাড়ি রয়েছে। বসতবাড়ির জমি সাধারণত উঁচু ও স্থায়ী হওয়ায় তা কৃষি খামার রূপান্তরের জন্য একটি উপযোগি স্থান। নারী, পুরুষ, ছেলে-মেয়ে সবার প্রচেষ্টায় বসতবাড়িতে একটি সুন্দর ফল ও সবজি বাগান স্থাপন করে সব সময় টাটকা শাক-সবজি ও ফল খাওয়া যায়। বসতবাড়ির খামারে উৎপাদিত শাক-সবজি ও ফলমূল পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা মেটানোর মাধ্যমে অপুষ্টিজনিত রোগ হতে রক্ষা পাওয়া যায়। এছাড়া অতিরিক্ত উৎপাদিত সবজি ও ফলমুল বাজারে বিক্রি করে বাড়তি কিছু অর্থও উপার্জন করা সম্ভব।
বসতবাড়ি ও এর আশে-পাশের অংশের আলো-বাতাস নিশ্চিত করার জন্য বাড়ির উত্তর ও পশ্চিম দিকে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, কামরাঙা, জলপাই, বেল, নারিকেল, মেহগিনি, শিরিষ এ ধরনের বড় আকৃতির গাছ লাগানো উচিত। এতে বসতবাড়িতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়। কলা, পেঁপে, লেবু, পেয়ারা, কুল, এ ধরনের দ্রুত ফলদানকারী গাছ বাড়ির উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিন-পশ্চিম ধারে রোপন করতে হয়। তেজপাতা, দারুচিনি, সফেদা, গোলাপজাম, ডালিম, এসব সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারক গাছগুলো বাড়ির সম্মুখভাগে থাকা ভাল। শরীফা, সুপারী ও খাটো জাতের কলা কিছুটা ছায়াতেও উৎপাদন করা যায়। বসতবাড়ির পূর্ব ও দক্ষিণভাগ শাক-সবজি চাষের জন্য উত্তম। এ অংশে নানা রকম মৌসুমী সবজি পর্যায়ক্রমে চাষ করতে হয়। চালকুমড়া, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, চিচিংগা, করলা এসব লতাজাতীয় সবজি উৎপাদনে স্থায়ী মাচা রাখতে হবে। গাছের ডালের বাউনিতে এবং সাধারণ গাছ-পালায় শিম, ঝাড়শিম, ঝিঙা, মেটে আলু, ধুন্দল এসব সবজি উৎপাদন করা যায়। ছায়ায় এবং আধা-ছায়ায় আদা, হলুদ, মানকচু, ওলকচু এবং সরাসরি মাটিতে মিষ্টি কুমড়া, গিমা কুমড়া, বাঙী ও তরমুজ আবাদ করা যায়। বসতবাড়ির আঙিনায় ২/৪টি পেঁপে, ডালিম, বেগুন ও বারোমাসী মরিচ উৎপাদনের ব্যবস্থা রাখতে হয়। ফল ও শাক-সবজির চাষ ও জ্বালানির নিশ্চয়তার জন্য বসতবাড়ির বেড়ায় খেজুর, বকফুল, সজিনা, মান্দার, ঝিকা, বাবলা ও ইপিল-ইপিল গাছ লাগানো যায়।
প্রত্যেক বসতবাড়িতেই দৈনিক খাবারের উচ্ছিষ্ট অংশ, ফলমুল ও শাক-সবজির খোসা, ছাল-বাকল, মাছের আঁশ, কাটা এসব আবর্জনার সৃষ্টি হয়। গৃহস্থালীর এসব আবর্জনা যেখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলে নোংরা, ময়লা ও দুর্গন্ধের কারণ হয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অথচ গৃহস্থালীর প্রতিদিনের এসব আবর্জনা বসতবাড়ির সামান্য দুরে গো-শালার কাছে বা বাড়ির পিছন দিকে ছায়াযুক্ত স্থানে গর্ত করে সেখানে ফেলে আদর্শ পদ্ধতিতে পচাতে পারলে এসব আবর্জনা মূল্যবান জৈব সারে পরিনত হবে এবং বসতবাড়ির পরিবেশও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে থাকবে। এছাড়া গোবর, গোচনা, আবর্জনা, ছাই, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা বাড়ির একটি নির্দিষ্ট স্থানে গর্ত করে সংরক্ষণ করতে হবে এবং ঠিকমত পচলে এগুলো সার হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। এর ফলে বসতবাড়ির পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সহায়ক হবে। এভাবে আমরা দেশব্যাপী মনোরম ও অনাবিল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি। যা দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় কার্যকর অবদান রাখতে পারে।
পরিশেষে একথা বলা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশেসহ পৃথিবী তথা মানব জাতির সুস্থ জীবন ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই অপুষ্টি ও পরিবেশ দূষন রোধ করা একান্ত অপরিহার্য। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব সকল মানুষকে তাই পুষ্টিগত অবস্থার উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আসুন সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে মা ও শিশুসহ সবার দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে জাতির অপুষ্টি সমস্যা প্রতিকারে ব্রতী হই এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ নির্মল পরিবেশ এবং অপুষ্টিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি। লেখক: উপ-সহকারী কৃষি অফিসার, উপজেলা কৃষি অফিস, রূপসা, খুলনা