কবি নির্মলেন্দু গুণ: হৃদয়গ্রন্থি উন্মোচন


প্রকাশিত : June 29, 2019 ||

গোলাম কিবরিয়া পিনু

কবি নির্মলেন্দু গুণ, আমাদের একজন প্রিয় কবি, আমাদের নিকটজন, আমাদের প্রিয় মানুষ, তাঁর জন্মদিনের সৌন্দর্যে তিনি শুধু নন, আমরাও উজ্জ্বল হয়ে উঠি। তাঁর জন্মদিনে তাঁর প্রতি আমাদেরও ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জেগে থাকে। তা হয়তো তিনি টেরও পান ও উপলব্ধি করেন। তিনি জন্মেছেন, ৭ আষাঢ় ১৩৫২ বঙ্গাব্দে, ২১ শে জুন ১৯৪৫ সালে, আমাদের এই দেশের ভূখ-ে, কাশবন, বারহাট্টা, নেত্রকোণায়।
‘কবিতা কখন থেকে লিখতে শুরু করেন’-এমন এক প্রশ্নের উত্তরে কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেন, ‘মনে হয় কবিতা যেদিন থেকে পড়তে শুরু করেছি একই সময় থেকে লিখতেও শুরু করেছি, তবে তা হয়েছে অনেকটাই মনে মনে। কাগজে কবিতা লেখার কাজটি শুরু হয়েছে স্কুল জীবনের মধ্যবর্তী সময়ে-সম্ভবত সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় আমি আমার প্রথম কবিতাটি রচনা করি। কবিতাটি আমার স্মৃতিতে আজও বন্দী হয়ে আছে। সচেতনভাবে কবিতা রচনায় হাত দিই বেশ কিছু পরে-৬৬ সালের দিক থেকে।’
(নির্মলেন্দু গুণের মুখোমুখি, দৈনিক বার্তা, ৫ অক্টোবর, ১৯৮০)।
তিনি যখন কবিতা লেখা শুরু করেন, তখন বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সংগ্রাম জোরালো হয়ে উঠেছিল, বাঙালিরা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করে আত্মশক্তির উদ্বোধন ঘটিয়েছিল। ১৯৬৬ সালে স্বাধীকার আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যৃত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়। এর পর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ। এমন জোরালো রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মুথোমুখি হয়ে একজন কবি বেড়ে উঠেছিলেন, নির্মলেন্দু গুণ। সেই সময়ের সংবেদনা, তাঁর কবিতায় আমরা পেয়ে যাই। এযুগের কবি তো জনমানুষের ভূখ-ে বসবাস করেন,তাই-একজন কবি অরণ্যজীবী হয়ে থাকতে পারেন না, কিংবা দূরালোকের বাসিন্দা। ১৯৭০ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ প্রকাশিত হয় এবং কাব্যগ্রন্থটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা এ-গ্রন্থের ‘হুলিয়া’ কবিতাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সেই যে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করলেন, পাঠকপ্রিয়তা পেলেন, তা আজ পর্যন্ত অনেকাংশে অক্ষুণ্ন থেকেছে। যা কম কবির জীবনেই লক্ষ করা গেছে-এই সময়ে। তাঁর কবিতা মনে হয় সবচেয়ে বাংলাদেশে আবৃত্তি বেশি হয়ে থাকে। কেন তিনি এত জনপ্রিয় হলেন, পাঠকপ্রিয়তা পেলেন? তার অনেক ব্যাখ্যা হয়তো বিবেচনা করা যাবে, তবে মোটা দাগে বলা যেতে পারে, তিনি শুধু নিজের জন্য বা নিজের আত্মস্বপ্ন পূরণের জন্য কবিতা লিখেননি। নিজের ব্যক্তিগত আশা ও আশাভঙ্গ নিয়ে শুধু দোলায়িত না হয়ে অনেক সময়ে নিজেকে ছাড়িয়ে অন্যের সঙ্গে যোগ দিয়ে-অন্যের দুঃখ-কষ্ট, ভালো-মন্দও গ্রহণ করেছেন। সমাজের বর্তমান গতি ও স্পন্দন অনুভব করে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। সেই সাহসের পিদিমটি তিনি জ্বালিয়েছেন বরফের চাঁইয়ের মধ্যে থেকেও, কী এক কাব্যশক্তি নিয়ে! ভয়াবহ ১৫ আগস্টের পর। আওয়ামী লীগের অনেক নেতারা তখন বিভ্রান্ত, কেউ কেউ জেলে। গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নাম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তাঁর নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা দ-নীয় অপরাধ। মানুষ হতবিহ্বল! সারা দেশে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, ন্যাপ-কমিউনিষ্ট পার্টির লোকদেরও গ্রেপ্তার ও হুলিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে। দেশকে শৃঙ্খলিত করে বরফ-সময় তৈরি করে উল্টোপথে দেশকে নিয়ে যাওয়ার জন্য চোরাপথে অধিষ্ঠিত ক্ষমতাধরেরা তখন তৎপর। সেই কালজ্ঞ-সময়ে একজন কবি বিপ¬বের এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরি বুকে নিয়ে শুধুমাত্র কবিতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মুজিবের আত্মার আত্মীয় হয়ে কীভাবে যে দাঁড়ালেন, তা গৌররেব এক ইতিহাস এবং বিস্ময়কর। তাঁর সেই কবিতা ‘আজ আমি কারো রক্ত চাইতে আসিনি’, সেই কবিতায় লিখলেন-
‘সমবেত সকলের মত আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি,
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তার কথা বলতে এসেছি।’
কবিতার শেষের দু’লাইনে সহজ কিন্তু কী গভীর উপলব্ধির ব্যঞ্জনায় তিনি বললেন-
‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসি নি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।’
এই কবিতা মানুষের মধ্যে শুধু বোধ উসকে দেয়নি, মানুষকে সাহসী ও যুথবদ্ধ হওয়ার অনুপ্রেরণা গভীরভাবে যুগিয়েছিল, একটি কবিতা কার্যকর ও শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে একটি জাতির দুঃসময়ে স্তব্দতার ররফ কীভাবে দূর করতে পারে, তা আমরা আমাদের জীবনকালে প্রত্যক্ষ করেছি। একারণে অনেকের মত আমিও তাঁকে শ্রদ্ধা করি।
লির্মলেন্দু গুণ-এমন একজন কবি, যার কবিতা প্রায় চলি¬শ বছরের অধিককাল ধরে গভীরভাবে পড়ে আসছি পাঠক হিসেবে। তাঁর প্রকাশিত প্রায় সব কবিতার ওপরই চোখ পড়েছে, তাঁর কবিতা চোখের সামনে পড়েছে অথচ পড়িনি-এমনটি হয়নি। তবে, সব কবিতাই ভালো লেগেছে সমানভাবে তা নয়, কোনো কবিতা বেশ টেনেছে, কোনো কবিতা কম টেনেছে তুলনামূলকভাবে। স্বীকার করি-তাঁর কবিতায় এক ধরনের সহজাত আকষণ রয়েছে, যে আকষর্ণ থেকে দূরে থাকা সম্ভব হয়নি। একি শুধু মুগ্ধতা, একি শুধু আসক্তি, একি শুধু পাঠক হিসেবে পক্ষপাতমূলক হৃদয়গ্রন্থি উন্মোচনের প্রেষণা? না, আরও অনেক কারণ আছে, তা এই স্বল্প পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব হলো না!

কবিতা ছাড়া নির্মলেন্দু গুণ ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, শিশুসাহিত্য, আত্মজীবনী ইত্যাদি রচনা করেছেন। তিনি ১৯৮২ সালে বাংলা একাডেমি, ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার অর্জন করেন। বরেণ্য এই কবি বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন, তেমনি পাশাপাশি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন অশেষ; তিনি মানুষের আহ্বানে দেশে ও দেশের বাইরে, শহরে-গ্রামে ও নিভৃত স্থানে ছুটে গিয়েছেন, মানুষের প্রাণস্পর্শী ভালোবাসাও পেয়েছেন।
বাংলা কবিতা, বাংলা সাহিত্য ও বাংলা সংস্কৃতির এক অন্তঃসলিলা হয়ে তিনি আমাদের মাঝে প্রবহমান। এখানে মিশেছে তাঁর জীবনের শ্রম, সৃজনশীলতা, সাহস ও দেশলগ্ন স্বপ্ন। তাঁর চৈতন্যে থাকে সবসময়ে বাংলাদেশ ও মানুষের জীবন। এই সময়কালে তাঁর অস্তিত্ব, এক দীপ্র ও অনির্বাপিত বাতি হয়ে জ্বলছে। আমরাও সেই বাতির অন্তর্গত আলোর অভিব্যঞ্জনা নিয়ে অভিষিক্ত হয়ে থাকতে চাই। আমাদের অতলস্পর্শী শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা গ্রহণ করবেন, আমাদের প্রিয় মানুষ, প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ।