সমুদ্র গুপ্ত: বাদশা থেকে ভিখারি


প্রকাশিত : জুন ২৯, ২০১৯ ||

সাইফুল¬াহ মাহমুদ দুলাল
আব্দুল মান্নান বাদশা, জীবনের সকল সা¤্রাজ্য ছেড়ে নিজেকে আড়াল করলেন; অর্থাৎ নিজের ভেতরই আত্মগোপন করলেন। ছদ্মবেশ থেকে ছদ্মনাম। ভিখারি হলেন-সমুদ্র গুপ্ত!
হাসিখুশি প্রাণবন্ত সন্যাসীর মতো বকশাদা শাদা মনের মানুষটি সারাক্ষণ হাসতেন এবং হাসাতেন। বুঝতে দিতেন না-ভেতরের বেদনা, কষ্ট, কান্না। আমার শাহবাগের আজিজ মার্কটের অফিসে আসতেন, আড্ডা মারতেন। আর আমার সম্পাদিত প্রবাসের কাগজগুলোতে (পড়শী, পরিক্রমা, মানচিত্র) কলাম লিখতেন। কাশবনের মত ধবধবে শাদা চুলে আঙুল চালিয়ে বলতেন, ‘বাম দল করতাম। বাম হাতে লিখি। কিন্তু খাই ডান হাতে, টাকা নিই ডান হাতে! হা হা হা…। আমি এ সব কলাম লিখি ভাতের জন্য। চাল কিনবো। টাকা দেন। বাসায় যাবো। চুলগুলো আবার কালো হয়ে যাচ্ছে। রং করতে হবে!’
আমি বললাম, মানে?
-মানে সবাই চুলে কালো রঙ মারে। আমি তো রঙ শাদা দেই। ধবধবে শাদা। হো হো হো…
এভাবেই হো হো করে হাসতেন। তাঁর কান্না শুনেছি; টেলিফোনে। তিনি তখন মরণাপন্ন! হাসপাতালে। চিকিৎসা চলছে।
আমি তখন টরন্টো থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা রিপোর্টারে। আমরা ক’জন পানাহারের বদলে সামান্য কিছু টাকা তাঁর জন্য পাঠিয়ে দিলাম। ফোন করলাম। ফোন পেয়ে সমুদ্র গুপ্ত শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন। আবেগ কন্ঠে ভালবাসায় বললেন, টাকাটা ভারত যাবার বিমান ভাড়াটা হয়ে যাবে। আমি শিহাবের (ড. শিহাব শাহরিয়ার) কাছ থেকে ডানহাত দিয়েই নিয়েছি! ভেজা কন্ঠেই তিনি আবার হো হো হেসে উঠলেন!
আমি কখনোই তাঁকে বিষণ্ণ মুখে দেখিনি। সব সময় সারাক্ষণ হাসিমাখা মুখ এবং রসিকতায় তাঁর উপস্থিতিতে ভরে রাখতেন। একদিন এক আড্ডায় তাঁকে প্রশ্ন করে দিলাম, আপনিই এক বিরল দৃষ্টান্ত যে মুসলামান থেকে হিন্দু হয়েছেন। আমার কথা শেষ না হতেই সাড়া দিয়ে বলেলন, হ্যা। আব্দুল মান্নান বাদশা থেকে সরাসরি সমুদ্র গুপ্ত!
-তা গুপ্ত থেকে?
-প্রকাশের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে গুপ্ত হলাম।
-কোন প্রকাশক।
-প্রকাশক না রে, প্রকাশ! জ্যোতি প্রকাশক দত্ত! হাহাহাহা
এরমক মজার মানুষ অনেক কমই আছে। সেদিন কি কারণে জানি, আমজাদ ভাই অর্থাৎ আমজাদ হোসেন এসেছেন। আড্ডা দিতে দিতে সমুদ্র গুপ্ত বললেন, বাদী থেকে বেগমের মতো ‘বাদশা থেকে ভিক্ষুক’ নামে একটি সিনেমা বানান। আমি তাতে অভিনয় করবো।
আমজাদ ভাই বলেছিলেন-আপনার যা মেপাক-গেটাপ, তাতে খুব মানাবে।
-আরে ভাই, সে জন্য তো আগে থেকেই এই চেহারা ধারণ করেছি।
কত কথা, কত স্মৃতি! কোনটা রেখে কোনটা কি লিখবো?
আমার সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধ: নির্বাচিত কবিতা’য় তাঁর ‘ইয়াহিয়া’ কবিতাটি স্থান পেয়েছে। পরে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ বের হবার সময় তিনি একটি মজার কবিতা দিয়ে চাইলেন এবং সাথে সাথে আমার ৭৮ আজিজ মার্কেটস্থ অফিসে লিখতে বসলেন। কবিতার নাম ‘ছেছা দিমু’। পাকি-সেনাদের উদ্দেশ্যে মজার কবিতা, হাসির কবিতা। কিন্তু তিনি সেই কবিতাটা গ্রন্থে নেয়া হয়নি।
সেদিন প্রথম সংস্করণ নাড়াচাড়া করে রসিকতা করে বলেছিলেন, যাঁরা সারাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এবং মুক্তিযোদ্ধা কবি, তাঁদের কবিতা লাল রং-এ ছাপবে। যেমন, সমুদ্র গুপ্ত, রফিক আজাদ, সাযযাদ কাদির, আবিদ আনোয়ার, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, আবিদ আনোয়ার, আবু কায়সার, মাহবুব সাদিক এঁদের।
আর যাঁরা কলকাতায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন, তাদের কবিতা সবুজ কালিতে ছাপবে। যেমন, আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসান, আসাদ চৌধুরী, কাজী রোজী, সিকানদার আবু জাফর, বেলাল চৌধুরী এঁরা।
আবার যাঁরা অবরুদ্ধ থেকে কবিতা লিখেছেন-যেমন, সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, হুমায়ূন আজাদ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তাঁদের কবিতা হলুদ কালারে ছাপবে। আর বাদবাকীদের কবিতা কালো কালিতে। তার এই অদ্ভুত রং’এর ব্যাখ্যা আজো ভুলতে পারিনি।
তিনি শাহবাগে এলেই আমার অফিসে ঢু মারতেন। আড্ডা দিতেন। কেনো জানি, অনেকের মতো সমুদ্র দা’ও আমার এই ছোট অফিসটা আপন মনে করতেন। একবার উঁকি দিলে চলে যাচ্ছিলেন। চা খেতে বসতে বললাম। তিনি বললেন, না যাইগ্যা। ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাবো।
আমি বললাম, এখানে একটু ঘুমিয়ে নিন। আমি নিচে পাঠশালা থেকে ঘুরে আসি।
কারণ, অনেক সময় দুপুরে খাবার পর আমি নিজেই লাইট নিভিয়ে চেয়ারে বসে ভাতঘুম দিতাম। তা তিনি অনেক বার দেখছেন।
আমি তাঁকে চেয়ার ছেড়ে দিয়ে ঘুমের পরিবেশ তৈরি করে তিন তলা থেকে নিচে পাঠশালায় গেলাম। আধা ঘন্টা পর ফিরে এসে দেখি তিনি কবিতা লিখছেন!
-কিরে ভাই, ঘুম কই?
-আর বলোনা। ঘুমের ভেতর কবিতা কুড়াইয়্যা পাইলাম।
-তাই।
-হুম।
পড়ে শোনালেন এবং আমাকে উৎসর্গ দিলেন। আমি কবিতাটা নিয়ে একটা সন্মানীর খাম দিলাম। তিনি বললেন, এই টেহা তো নেয়া যাবেনা?
-কেনো?
-এটা উৎসর্গ করা কবিতা। তাই।
-ঘুমালেন না কেনো?
-দূর মিয়া, এখানে কি ঘুমানো যায়। ফোনের রিং, লোকজনের ডাকাডাকি, বারান্দায় ফেরিওয়ালাদের হাকাহাকি।
আমি বললাম, এই হাতের লেখা রেখে দিলাম। যখন আপনার স্মৃতি বিক্রি করে খাবো।
-হা হা হা হা হা। আবারো সেই প্রাণখোলা হাসি। হাসতে হাসতে বললেন, যাইগ্যা। ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাবো।
বিভিন্ন পেশায় সমুদ্র গুপ্তের সংগ্রামী জীবন কেটেছে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি ছিলেন প্রেসের কমর্চারী, করাতকলের ম্যানেজার, জুটমিলের বদলি শ্রমিক, উন্নয়ন সংগঠনের নিবাহী, ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যবসা, প্রুফ রিডার, সাংবাদিকতা, পেশাদার লেখক এবং সর্বোপরি কবি! হৃদয় দিয়ে কবিতা লিখতেন আর যেনো মানুষের রোদ ঝলসানো মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
১৯৭৭-এ প্রকাশিত সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রোদ ঝলসানো মুখ’সহ ১২টি কবিতার বই আমাদের জন্য রেখে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন ২০০৮ সালের ২৩ জুন।